৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বেনারসে যাবেন? এই ভুলগুলো করবেন না!

বেনারসের আরতি। ছবি - AI

বেনারসে যাবেন? এই ভুলগুলো করবেন না!

calender icon 2 ২রা অক্টোবর, ২০২৬

tfa logo icon

সংক্ষিপ্তসার

গলি, গঙ্গা আর মহাদেবের খাসতালুক: কাশীর অলিগলিতে নির্ভেজাল চার দিন! কী ভাবে ঘুরবেন বেনারস? যে ভুলগুলো সবাই করে থাকেন, আর নয়!

বেনারস মানে কি শুধুই মন্দির আর পুজো? ঘাট, রামনগর কেল্লা, কুস্তির আখড়া থেকে মদনপুরার তাঁতশিল্পী—মন্দিরের বাইরে আসল বেনারসের স্বাদ পেতে ৪ দিনের সম্পূর্ণ ট্রিপ প্ল্যান ও বাজেট গাইড।

মূল বিষয়

ছুটি পেলেই সমুদ্রের পাড়ে ঝিমিয়ে থাকা কিংবা পাহাড়ে গিয়ে সেলফি তোলার চেনা অভ্যাসটা এবার একটু ভাঙতে চান? তাহলে মন ভাল করা এই ট্রিপ প্ল্যান আপনার জন্য। তাছাড়া, সব সময়ে রাজ্যের মধ্যেই ঘুরতে হবে এমন কথা আছে! কম খরচে ভিনরাজ্যে ৫ দিন কাটিয়ে এলে মন্দ কী! সঙ্গে যদি হয়ে যায় ঈশ্বরদর্শন আর রসনারও তৃপ্তি! হ্যাঁ, ঠিক পড়েছেন। একসঙ্গে প্রানের-মনের আরাম পেতে চাইলে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে বারানসী! যার এখনকার জনপ্রিয় ডাক নাম বেনারস।

হয়তো, অনেকবার গেছেন তাও আবার যেতে চান! কিংবা যাবেন যাবেন ভাবছেন কিছুতেই হচ্ছে না। এবার সব হবে। আর না ভেবে টিকিটটা কেটেই ফেলুন। ট্রেন বা প্লেন যাতে চেপেই যান, ফিরবেন অন্য মানুষ হয়ে--- গ্যারান্টিড! কী ভাবছেন, বাজেট? কী কী দেখবেন? সব বলে দিচ্ছি, নো চিন্তা। মন দিয়ে পুরোটা পড়ুন।

বেনারসে আছেটা কী?

বেনারস কোনো পরিপাটি সাজানো পর্যটন কেন্দ্র নয়। বেনারস আস্ত একটা ঘোরের নাম। এখানে আপনি যতই আধুনিক হয়ে ঢুকুন না কেন, এই শহরের গোলকধাঁধাময় অলিগলি, ঘাটের পাথুরে সিঁড়ি আর ভোলেবাবার অনুচরেরা আপনাকে নিজেদের ছাঁচে টেনে নামাবেই। আবার মনে হতে পারে উঠেই গেলেন, প্রেমে পড়া বা ওঠা নিয়েই যেমন নিরন্তর তর্ক, ঠিক তেমন। এ অভিজ্ঞতা যার কাছে যেমন! একদিকে মোড়ের মাথায় রাবড়ির সুবাস কিংবা ডুবো তেলে ভাজা হিংয়ের কচুরি, অন্য দিকে দশ হাত দূরেই হয়তো সাজানো চিতা, পিণ্ডদানের তোরজোড়। এই দুই চরম সত্যের মাঝখানে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে চিনতে চান? বিশ্বনাথের খাসতালুকে সবকটা জাগ্রত দেবালয় ছুঁয়ে এক আশ্চর্য আত্মিক পরিক্রমায় ডুব দিতে চান? চলুন, চারদিনের একটা জমাটি খসড়া সাজিয়ে নেওয়া যাক। যদি আটঘাট না জেনে যান, নাহলে কিছু না কিছু ভুলবেনই!

গোলকধাঁধায় বিশ্বনাথ, অন্নপূর্ণা আর এক টুকরো শক্তিপীঠ

কাশীতে গিয়ে বিশ্বনাথ দর্শন করবেন না, তা তো হয় না। তবে বিশ্বনাথ করিডোর এখন মার্বেল পাথরে ঝাঁ-চকচকে হয়ে উঠলেও, কাশীর আসল মেজাজটা কিন্তু রয়ে গেছে সেই সংকীর্ণ গলিগুলোর ভেতরেই।

ভোর থাকতে লাইনে দাঁড়িয়ে বিশ্বনাথের স্পর্শ দর্শন করতে পারেন। সন্ধ্যায়ও পারেন। আপনার সুবিধামতো বুকিং করবেন। গর্ভগৃহে ঢুকে যখন সেই সহস্রাব্দের প্রাচীন কষ্টিপাথরের শিবলিঙ্গে হাত ছোঁয়াবেন, আশপাশের ভিড়ের গুঁতো আর মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যেও শরীরে একটা অদ্ভুত কাঁপুনি দিয়ে উঠবে। বিশ্বনাথের ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছেন মা অন্নপূর্ণা। সেই মন্দিরেও পুজো দিয়ে প্রসাদ নিয়ে নিতে পারেন।

কথিত আছে, স্বয়ং মহাদেব যাঁর কাছে ভিক্ষাপাত্র হাতে দাঁড়িয়েছিলেন। সেখানে পুজো দিয়ে প্রসাদী অন্নকূট পেতে চান? নাকি গলির একটু ভেতরের দিকে পা বাড়িয়ে খুঁজে নিতে চান একান্ন পীঠের অন্যতম বিশালাক্ষী শক্তিপীঠ? যেখানে সতীর চোখের মণি পড়েছিল বলে বিশ্বাস। এই গলিগুলোর বৈশিষ্ট্যই এমন—কখন যে আপনি কোন শতকে ঢুকে পড়ছেন, খেয়ালই থাকবে না। তাই প্রথমবার গেলে সঙ্গে গাইড নিয়ে যাবেন। হাতে সময় নিয়ে এক্সপ্লোর করতে চাইলে ভিড়ে মিশেও যেতে পারেন, মর্জি আপকা! ও হ্যাঁ, মোবাইল ফোন-সহ সব গ্যাজেটস কিন্তু হোটেলের রুমেই রেখে যেতে হবে। ছবি তোলার প্ল্যান থাকলে সেসব মুলতুবি।

তবে, পুজো শেষ করেই কি হোটেলে ফিরবেন? একেবারেই না। সোজা ঢুকে পড়ুন ঠাটেরি বাজার বা বিশ্বনাথ গলির রামভান্ডারে। হাতে আসবে শালপাতায় গরম গরম কচুরি, ঝাল ঝাল ছোলার ঘুগনি আর পাশে একখানা রসে টসটসে জিলিপি। এর পর মাটির ভাঁড়ে ঘন মালাই দেওয়া কড়া চায়ে চুমুক দিয়ে কাশীর আড্ডার মেজাজটা তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে নিন।

কাশীর কোতোয়াল, সঙ্কটমোচন আর হনুমানজির লাড্ডু

বিশ্বনাথ দর্শন তো হলো, কিন্তু কাশীর আসল মালিকের অনুমতি না নিলে সবই বৃথা! স্থানীয়রা বলেন, কাশীর আসল শাসক বা কোতোয়াল হলেন কালভৈরব। তাঁর অনুমতি ছাড়া কাশীতে বাস করা কিংবা তীর্থের ফল পাওয়া নাকি অসম্ভব। কালভৈরব মন্দিরে গিয়ে দেখেছেন কখনো? গর্ভগৃহে তাঁর রুদ্র রূপ, চোখে রূপোর চোখ, আর ভক্তদের পিঠে ময়ূরের পালকের ঝাড়ু ছুঁইয়ে আশীর্বাদ করছেন পুরোহিত। হাতে একটা শক্ত কালো সুতো বেঁধে নিয়ে তবেই আপনি কাশীর নাগরিকত্ব পেলেন! পাশেই মৃত্যুঞ্জয় মহাদেব—যেখানে থাকা প্রাচীন কুয়োর জলে রোগমুক্তির বিশ্বাস নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী মানুষ ভিড় করছে।

এবার একটু শহরের দক্ষিণ দিকে যেতে চান? অটো নিয়ে সোজা চলে আসুন দুর্গা কুণ্ডে। গাঢ় লাল রঙের চতুষ্কোণ সেই ঐতিহাসিক দুর্গা মন্দির, যার বারান্দায় বসে বানরদের তাণ্ডব দেখার আলাদা মজা। সেখান থেকে ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে তুলসী মানস মন্দির—যেখানে মার্বেল পাথরের দেওয়ালে খোদাই করা রয়েছে আস্ত ‘রামচরিতমানস’।

আর একটু এগোলেই তুলসীদাসের স্মৃতিবিজড়িত সঙ্কটমোচন মন্দির। বজরঙ্গবলীর সামনে দাঁড়িয়ে দেশি ঘিয়ের খাঁটি বেসনের লাড্ডুর ভোগ মুখে দিতে চান? তবে সাবধান, মন্দিরের চত্বরের বানরদের চোখ ফাঁকি দিয়ে সেই লাড্ডু বাঁচিয়ে নিয়ে ফেরা কিন্তু আস্ত একটা রণকৌশল! মন্দির সফর শেষ করে বিকেলে ঢুকে পড়ুন বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (BHU) ক্যাম্পাসে। সুবিশাল সবুজে ঘেরা এই ক্যাম্পাসের ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে বিড়লাদের তৈরি নিউ বিশ্বনাথ মন্দির (VT)। সাদা মার্বেলের আকাশছোঁয়া চূড়া আর অদ্ভুত এক পিনপতন নিস্তব্ধতা—ঘাটের কোলাহলের পর এখানে কিছুক্ষণ বসে থাকলে মনটা আশ্চর্য রকম শান্ত হয়ে যায়।

ভোরগঙ্গার স্তব্ধতা, মণিকর্ণিকার চিতা আর দশাস্বমেধের আলো

কাশীর আসল আত্মা কিন্তু লুকিয়ে তার ঘাটগুলোতে। আর সেই আত্মাকে ছুঁতে হলে ভোর সাড়ে পাঁচটায় আলসেমি ছেড়ে অসি ঘাটে এসে কাঠের নৌকোয় চেপে বসতে হবে।

অসি থেকে রাজঘাট—দাঁড়ের এক একটা টানে যখন নৌকো মাঝগঙ্গায় এগোয়, চোখের সামনে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে সুবিশাল পাথুরে ঘাটগুলো। কুয়াশার চাদর ভেদ করে সূর্যের প্রথম লালচে আভা যখন ঘাটের ওপর পড়ে, মনে হবে আস্ত একটা ইতিহাস যেন ঘুমের ঘোর ভেঙে চোখ মেলল। নৌকো যখন মণিকর্ণিকা আর হরিশ্চন্দ্র ঘাটের সামনে এসে থামবে, বুকের ভেতরটা একটু ছ্যাঁৎ করে উঠবেই।

মৃত্যুকে কখনো এত সহজে, এত নিরাসক্তভাবে চোখের সামনে পুড়তে দেখেছেন? একের পর এক চিতার লেলিহান শিখা, স্বজনদের চোখের জল আর মাঝগঙ্গায় ডানা ঝাপটানো গাঙচিল। জীবনের সব অহংকার, রাগ আর ব্যাঙ্ক ব্যালেন্স যে এক মুঠো ছাইয়ে শেষ হয়ে যায়—এই চরম সত্যটা খুব কাছ থেকে উপলব্ধি করতে চান? মণিকর্ণিকার ঘাটে এসে দাঁড়ালে আর আলাদা করে কোনো দর্শনের বই পড়তে হয় না।

আর সন্ধে নামলেই দৃশ্যপট পুরো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে যায় দশাস্বমেধ ঘাটে। হাজার হাজার মানুষের মাথার ভিড়, নৌকোর ওপর নৌকো জুড়ে তৈরি হওয়া ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, আর উঁচু বেদীতে দাঁড়িয়ে পুরোহিতদের সমবেত সান্ধ্য আরতি। আগুনের শিখা, ডমরুর গর্জন আর ঘণ্টার আওয়াজে যখন চারদিক পুজো পুজো হয়ে ওঠে, তখন সেই উন্মাদনায় গা না ভাসিয়ে থাকা অসম্ভব। আরতি শেষ হলে আবার গোধুলিয়া চকের দিকে হেঁটে আসুন। রাস্তায় ভিড় দেখে চমকাবেন না। লাইন দিয়ে কাশীর বিখ্যাত টোমোটর চাট অবশ্যই কিনে খাবেন, নাহলে বড় মিস! এছাড়াও যেগুলো সারা দিনে ঘুরতে ফিরতে অবশ্যই চেখে দেখবেন--- রাবড়ি দেওয়া লস্যি, ইডলি-দোসা, আলুর পরোটা, মালাইয়ু, রাবড়ি, ক্ষীর, পনির এবং কফি। আর নিশ্চয়ই বলে দিতে হবে না বেনারসের পানের কথা! সেই মাদকতা একবার শরীরে ঢুকলে কলকাতা ফিরেও সহজে কিন্তু কাটবে না। শহরেও ওই পান খুঁজবেন! যথারীতি পাবেন না।  তাই পেট পুরে আশ মিটিয়ে খেয়ে আসুন বেনারসে। পনির পসিন্দা হোক কী রাবড়ি... এত আলাদা যে ও স্বাদের ভাগ হবে না!

অলিগলি, কেল্লা আর আড্ডার বেনারস

পুজো দিলেন, প্রার্থনা করলেন এত মন্দিরে, মণিকর্ণিকায় জীবনের নশ্বরতাও বুঝে এলেন। কিন্তু কাশীকে কি শুধু দেবালয়ের ঘেরাটোপে আটকে রাখা যায়? কাশী একটা জীবন্ত মিউজিয়াম। এখানে প্রতিটা পোড়া ইটের পেছনে একটা করে গল্প আছে, প্রতিটা ঘাটের আড়ালে আছে আস্ত একটা সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের দাগ। কুস্তির আখড়ার মাটির গন্ধ থেকে শুরু করে গঙ্গার ওপারে রাজপ্রাসাদের রোশনাই, আর বিকেল নামলে ঘাটের চাতালে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তর্কাতর্কি—বেনারসের এই রক্তমাংসের রূপটা না দেখলে আপনার কাশীবাস আধখেঁচড়া থেকে যাবে।

মন্দিরের লাইন ছেড়ে চলুন, শহরের বাকি আকর্ষণগুলো এক নজরে দেখে নেওয়া যাক।

কেল্লা, আখড়া আর বেনারসি বুনন: শহরের মূল দ্রষ্টব্য

আরও পড়ুন
একঘেয়ে দার্জিলিং? সস্তায় পাহাড় ঘুরুন এই ৫ রুটে!
‘না’ থেকেই নক্ষত্রযাত্রা
‘শতাব্দীর লাডলি’ জোহরা সেহগল: বয়স যেখানে শুধু একটি সংখ্যা
  • রামনগর কেল্লা ও রাজবাড়ি:

গঙ্গার ঠিক উল্টো পাড়ে অষ্টাদশ শতকের লাল বেলেপাথরের সুবিশাল দুর্গ। বেনারসের রাজার এই বাসভবনে আজও পুরনো রাজকীয় গন্ধ ভুরভুর করে। ভেতরে রয়েছে এক আশ্চর্য ভিন্টেজ মিউজিয়াম—যেখানে মধ্যযুগীয় পালকি, হাতির পিঠের সোনার হাওদা, চকচকে তলোয়ার আর একটা জটিল জ্যোতির্বিজ্ঞানের ঘড়ি রাখা আছে যা একাই দিন, ক্ষণ আর গ্রহের অবস্থান মেপে দেয়। কেল্লার বাইরে দাঁড়িয়ে বিখ্যাত ‘শিবপ্রসাদ’-এর কাঠের উনুনে জ্বাল দেওয়া ঘন মালাই দেওয়া লস্যিতে চুমুক না দিলে এই সফর অপূর্ণ।

  • ঐতিহাসিক ঘাট ও কেল্লার প্রাচীর:
    • চেত সিং ঘাট: ঘাট মানেই শুধু পুজো নয়, যুদ্ধের রক্তও। ওয়ারেন হেস্টিংসের ব্রিটিশ ফৌজের বিরুদ্ধে রাজা চেত সিং যে কেল্লায় দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিলেন, নদীর পাড়ে মাথা তুলে থাকা সেই সুউচ্চ পাথুরে দুর্গ দেখলে এখনও গায়ে কাঁটা দেয়।
    • সিন্ধিয়া ঘাট ও হেলানো শিবমন্দির: নদীর দিকে প্রায় ৪৫ ডিগ্রি কোণে হেলে জলের মধ্যে তলিয়ে যাওয়া শিবমন্দির—কাশীর নিজস্ব ‘পিসার হেলানো মিনার’।
    • দ্বারভাঙা ও ব্রিজরামা প্যালেস ঘাট: ঘাট থেকে খাড়া উঠে যাওয়া সুবিশাল গ্রিক-রোমান আর ভারতীয় স্থাপত্যের মেলবন্ধন। আস্ত এক প্রাসাদের ছাঁচ।
  • কাশীর কুস্তির আখড়া (তুলসী আখড়া):

ভোরের আলো ফুটতেই তুলসী ঘাটের কাছে মাটির আখড়ায় উঁকি দিতে চান? যেখানে আজও লাল মাটি মেখে ডন-বৈঠক মারেন পালোয়ানরা। তেল মালিশ, মুগুর ভাঁজা আর শতবর্ষ প্রাচীন ভারতীয় আখড়া সংস্কৃতির সেই খাঁটি দৃশ্য আধুনিক বেনারসের এক বিরল দলিল।

  • মদনপুরা ও পিলিকুঠির তাঁতি মহল্লা:

দোকানের কাচঘেরা শো-রুম নয়, খাঁটি বেনারসি শাড়ি কীভাবে জন্ম নেয় তা নিজের চোখে দেখতে চান? ঢুকে পড়ুন মদনপুরার ঘিঞ্জি মুসলিম মহল্লায়। খটখট শব্দে চলা তাঁতের আওয়াজ, আর জরির সুতোয় বোনা নকশার জাদুকরদের কাজ দেখলে বোঝা যায় কেন এই শিল্প যুগ যুগ ধরে অমর।

  • ভারত কলা ভবন (BHU ক্যাম্পাস):

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটির চত্বরে লুকিয়ে থাকা এই সংগ্রহশালা দেশের অন্যতম সেরা আর্ট মিউজিয়াম। মুঘল আর রাজস্থানি মিনিয়েচার পেইন্টিং, প্রাচীন ভাস্কর্য, বেনারসি সিল্কের ঐতিহাসিক সংগ্রহ আর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ব্যবহৃত জিনিসপত্রের এমন সম্ভার ইতিহাসপ্রেমীদের চমকে দেবেই।

  • ভারত মাতা মন্দির:

কোনও দেব-দেবী নেই, কোনও মূর্তিও নেই। মহাত্মা গান্ধীর উদ্বোধন করা এই ঐতিহাসিক মন্দিরের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে গোটা অখণ্ড ভারতের সুবিশাল এক ত্রিমাত্রিক মার্বেল রিলিফ ম্যাপ—পাহাড়, নদী, মালভূমি সব একেবারে নিখুঁত স্কেলে পাথরে খোদাই করা।

৪ দিন ৩ রাতের ট্রিপ প্ল্যান

  • Day 1: বিশ্বনাথের গলি, তাঁতশিল্প ও সান্ধ্য আরতি

সকালে বেনারস পৌঁছে ঘাটের কাছে চেক-ইন। স্নান সেরে বিশ্বনাথ ধাম ও অন্নপূর্ণা দর্শন। দুপুরে শালপাতায় গরম কচুরি খেয়ে ঢুকে পড়ুন মদনপুরার তাঁতিদের গলিতে—তাঁতের খটখট শব্দ আর বেনারসি শাড়ির আসল বুনন দেখা। বিকেলে দশাস্বমেধ ঘাটে নৌকোয় বসে সুবিশাল গঙ্গা আরতি। রাতে গোদৌলিয়ার গলিতে তমোতর চাট আর বিখ্যাত বেনারসি পান।

(রাত্রিবাস: বেনারস)

  • Day 2: ভোরগঙ্গার স্থাপত্য, আখড়া ও রামনগর কেল্লা

ভোর সাড়ে পাঁচটায় অসি ঘাট থেকে বোট রাইড—মাঝনদী থেকে চেত সিং কেল্লার প্রাচীর, সিন্ধিয়া ঘাটের হেলানো মন্দির আর মণিকর্ণিকা দেখা। ঘাটে ফিরে তুলসী ঘাটের ঐতিহ্যবাহী আখড়ায় পালোয়ানদের কুস্তি দর্শন। রামভান্ডারে প্রাতরাশ সেরে দুপুরে গঙ্গা পার হয়ে সোজা রামনগর কেল্লা। রাজকীয় অস্ত্রাগার ও ঘড়ি দেখে কেল্লার বাইরে মালাই লস্যি খাওয়া। সন্ধ্যায় অসি ঘাটের চাতালে বসে আড্ডা ও সুফি সঙ্গীতের আসর।

(রাত্রিবাস: বেনারস)

  • Day 3: বুদ্ধের সারনাথ ও ভারত কলা ভবন

সকালে কালভৈরব দর্শন সেরে গাড়ি বা অটো নিয়ে সোজা সারনাথ (১০ কিমি)। ধমেখ স্তূপ, প্রাচীন বৌদ্ধবিহার আর সারনাথ মিউজিয়ামে দাঁড়িয়ে থাকা অশোকের মূল সিংহচতুর্মুখ দর্শন। দুপুরে ফিরে এসে বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটি (BHU) ক্যাম্পাসে ঢোকা। বিশাল ভারত কলা ভবন মিউজিয়াম দেখা এবং শান্ত ক্যাম্পাসে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেওয়া। রাতে ঘাটের সিঁড়িতে একলা সময় কাটানো।

(রাত্রিবাস: বেনারস)

  • Day 4: অভিনব ভারত মাতা মন্দির ও শেষ বেলার কেনাকাটা

সকালে ভারত মাতা মন্দিরে গিয়ে মার্বেলের অখণ্ড ভারতের মানচিত্র দেখে নেওয়া। এরপর চক ও ঠাটেরি বাজারে কেনাকাটা—কাঠের খেলনা, পিতলের বাসন, বেনারসি শাড়ি আর মিষ্টির দোকান থেকে খাঁটি ক্ষীরের লাল প্যাঁড়া প্যাক করানো। দুপুরে শেষ এক কাপ মালাই চা আর বেনারসি পান মুখে পুরে ট্রেনের পথ ধরা।

পকেট ও বাজেট (জনপ্রতি আনুমানিক)

  • যাতায়াত: শহরে ঘোরার জন্য অটো বা টোটো (শেয়ারে ১০–২০ টাকা, রিজার্ভে ১০০–১৫০ টাকা)। সারনাথ ও রামনগর কেল্লা ঘুরে আসার জন্য অটো রিজার্ভ করলে খরচ পড়বে ৭০০ থেকে ৯০০ টাকা। ভোরবেলার বোট রাইডে কাঠের নৌকো শেয়ারে নিলে জনপ্রতি ২০০–৩০০ টাকা।
  • এন্ট্রি ফি: রামনগর কেল্লা (৫০ টাকা), সারনাথ মিউজিয়াম ও স্তূপ চত্বর (২৫–৫০ টাকা), ভারত কলা ভবন (নামমাত্র ফি)।
  • থাকা ও খাওয়া: পরিচ্ছন্ন হেরিটেজ গেস্টহাউস বা হোমস্টে এবং দিনভর চাট, কচুরি, লস্যি ও দু’বেলার ভরপেট খাওয়া মিলিয়ে দিনপ্রতি খরচ পড়বে জনপ্রতি ১,৩০০ থেকে ১,৬০০ টাকা।
  • মোট বাজেট: মোট ৫ দিনের ট্রিপে একদিন রইল যাতায়াতের জন্য। কলকাতা থেকে যাওয়া-আসার দূরপাল্লার ট্রেনের বা প্লেনের টিকিট বাদ দিলে, ৪ দিনের এই সম্পূর্ণ বৈচিত্র্যময় সফরে জনপ্রতি খরচ দাঁড়াবে বড়জোর ৬,৫০০ থেকে ৮,০০০ টাকার মধ্যে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়
তিয়াস বন্দ্যোপাধ্যায়

সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য