৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

‘শতাব্দীর লাডলি’ জোহরা সেহগল: বয়স যেখানে শুধু একটি সংখ্যা

‘শতাব্দীর লাডলি’ জোহরা সেহগল: বয়স যেখানে শুধু একটি সংখ্যা

johra sehgal-bday

‘শতাব্দীর লাডলি’ জোহরা সেহগল: বয়স যেখানে শুধু একটি সংখ্যা

calender icon 2 ২৭শে এপ্রিল, ২০২৬

আজ জন্মদিন

একটা দৃশ্য কল্পনা করা যাক - একটি জানালার পাশে বসে আছেন এক প্রবীণা। সাদা চুলে নরম আলোর ছোঁয়া, চোখে দুষ্টু ঝিলিক, ঠোঁটে অমলিন হাসি নিয়ে নীরবে পর্যবেক্ষণ করছেন জীবন। মনে হয়, যেন সময়কে নিজের সঙ্গী করে হার না মানা এক প্রজ্ঞা। এই দৃশ্য এবং তার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা অনুভূতি নিখুঁতভাবে তুলে ধরে যে ব্যক্তিত্বকে তিনি জোহরা সেহগল - একজন শিল্পী, যিনি বয়সকে অতিক্রম করে বেঁচে থাকার এক নতুন সংজ্ঞা রচনা করেছেন।

এক অদম্য প্রাণ

১৯১২ সালের ২৭ এপ্রিল ব্রিটিশ শাসিত ইউনাইটেড প্রভিন্সের সাহারানপুরে একটি ঐতিহ্যবাহী মুসলিম রোহিলা পাঠান পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাহেবজাদী জোহরা মমতাজুল্লাহ খান বেগম । কিন্তু তাঁর ভিতরে ছিল এক অদম্য আকাঙ্ক্ষা - নিজেকে খুঁজে পাওয়ার ও নিজের মতো করে বাঁচার। আর রক্ষণশীলতার শেকলের মাঝখানে এই অবাধ্য আর কৌতূহলী মন আগামীতে পৌঁছে যাবে বিশ্বের মঞ্চে।

নৃত্যে খুঁজে পাওয়া মুক্তি

মায়ের অকাল মৃত্যুর পর ব্যতিক্রমী জীবনের এই আকাঙ্ক্ষা লাহোরের কুইন মেরি কলেজে, পর্দাপ্রথা, জার্মানির মেরী উইগম্যানের ব্যালে ইন্সটিউট, পাশ্চাত্য আধুনিক নৃত্যশৈলীর প্রশিক্ষণ পেরিয়ে তাঁকে জগৎ খ্যাত নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্করের দলে পৌঁছে দেয়। নৃত্যের ছন্দে জোহরা খুঁজে পান মুক্তির স্বাদ। ইউরোপের থিয়েটার, জাপানের মঞ্চ আর আমেরিকার দর্শক - সবখানেই তাঁর নাচ হয়ে উঠলো এক গল্প, যেখানে ভারতীয় সংস্কৃতি নতুন রূপে ধরা দিত। তাঁর শরীরের ভঙ্গিমায় ছিল যেন এক আস্ত কবিতা, আর প্রতিটি মুদ্রায় ছিল জীবনের স্পন্দন। স্বাভাবিক ভাবেই তাঁর খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লো গোটা বিশ্বে।

জীবনের মঞ্চে ব্যক্তিগত বিপ্লব

জোহরা’র জীবনের সাথে বিপ্লব এক সমার্থক শব্দ। তা সে ছোটবেলার স্বাধীন চলাফেরা কিংবা চিন্তাভাবনা হোক অথবা প্রেম ও বিবাহ-ই হোক না কেন। ১৯৪০ সালে ভারতে ফিরে আসার পর সেহগাল আলমোরায় উদয় শঙ্কর ইন্ডিয়া কালচারাল সেন্টারে শিক্ষিকা হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং সেখানেই তাঁর সাথে আলাপ হয় তরুণ বিজ্ঞানী, চিত্রশিল্পী এবং নৃত্যশিল্পী কামেশ্বর সেহগালের সাথে। তৎকালীন রাজনৈতিক দ্বিজাতি তত্ত্ব, পরিবারের অসম্মতি, সমাজের বাধা অতিক্রম করে তিনি তাঁর থেকে বছর সাতেকের ছোট, হিন্দু জনজাতির রাধা সোয়ামী সম্প্রদায়ের এই মানুষটিকে ভালোবেসে বিবাহ করেন। সেই সময়ে তাঁদের এই ব্যতিক্রমী পদক্ষেপ আগামীর জন্য খুলে দেয় ভালোবাসার উন্মুক্ত পথ এবং তৈরি করে নিজের শর্তে বেঁচে থাকার এক মানবিক দৃষ্টান্ত।

মঞ্চে জীবনের প্রতিচ্ছবি

গুরুদত্তের ‘বাজি’ ও রাজ কাপুরের ‘আওয়ারা’ -সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্রে নৃত্য পরিচালনার মধ্যে দিয়ে জোহরা হয়ে ওঠেন একজন প্রথিতযশা কোরিওগ্রাফার। কিন্তু এখানেই শেষ নয়, ১৯৪৫ সালে ‘পৃথ্বী থিয়েটার’-এর মাধ্যমে তাঁর মঞ্চে অনুপ্রবেশ ঘটে। মঞ্চের আলো-আঁধারিতে তিনি হয়ে ওঠেন চরিত্রের প্রাণ। তাঁর অভিনয়ে কোনো অতিরঞ্জন ছিলো না, ছিলো - সহজ, স্বাভাবিক, অথচ গভীর এক মানবিক অনুভব। পরবর্তী সময়ে আই.পি.টি.এ -এর  সাথে যুক্ত হয়ে একের পর এক কাজের মধ্যে দিয়ে তিনি বুঝিয়ে দেন, শিল্প শুধু বিনোদন নয় - সমাজের প্রতিচ্ছবি, প্রতিবাদের ভাষা। 

ছোট ভূমিকায় বড় জাদু

ক্যামেরার সামনে জোহরা ছিলেন যেন এক ঝলক হাওয়া - ক্ষণিক, কিন্তু স্মরণীয়। তাঁর অভিনীত ‘নীচা নগর’ প্রথম ভারতীয় চলচ্চিত্র হিসেবে আন্তর্জাতিক স্তরে পদার্পণ করে এবং কান্‌স ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে ‘পাম ডি'অর’ সম্মানে ভূষিত হয়। আসলে চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনে জোহরার উপস্থিতি ছিল একেবারে অনন্য। ‘দিল সে’, ‘হম দিল দে চুকে সনম’, ‘বীর-জারা’, ‘চিনি কম, ‘সাওয়ারিয়া’ এর মত হিন্দি চলচ্চিত্রে তাঁর সংক্ষিপ্ত উপস্থিতিও দর্শকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। ছোটপর্দায় ‘মুল্লা নাসিরুদ্দিন’, ‘এক থা রাস্টি’, ‘আম্মা অ্যান্ড ফ্যামিলি’, ‘জিন্দগি কিতনি খুবসুরত হ্যায়’- এর মধ্যে দিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন গৃহস্থ পরিবারের বরিষ্ঠ সদস্য এবং ছোটদের প্রিয় ‘দাদি’! লন্ডনে থাকাকালীন বিবিসি-এর সাথে ‘ডক্টর হু’, ‘নেইবারস’ -এর মতো টেলিভিশন সিরিজ এবং জেমস আইভরি প্রোডাকশনের ‘দ্য কোর্টেসানস অফ বোম্বে’, ‘দ্য রাজ কোয়ার্টেট’, ‘তন্দুরি নাইটস’ -এর মতো একাধিক ইংরেজি চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্যে দিয়ে তার বহুমাত্রিক প্রতিভা আন্তর্জাতিকতার সীমা অতিক্রম করে। ‘বেন্ড ইট লাইক বেকহ্যাম’ ছবির মাধ্যমে। তাঁর মুখের হাসি, চোখের দুষ্টুমি আর সংলাপের স্বাভাবিকতা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠলেন পৃথিবীর একজন গুরুত্বপূর্ণ বরিষ্ঠ অভিনেত্রী।

শেষ পর্যন্ত ‘জীবন্ত’ থাকা

২০১৪ সালের ১০ই জুলাই তাঁর জীবন নিঃশব্দে এই পৃথিবীর মঞ্চ ত্যাগ করে। শতবর্ষের অধিক আয়ুর এই জীবনকালে প্রতিভা ও কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ ভারতবর্ষের সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী, পদ্মভূষণ ও পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছে। অর্জন করেছেন সঙ্গীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার। কিন্তু সব কিছুর উর্ধে জোহরা সেহগলের জীবনের স্বীকৃতি বোধহয় শেষ দিন পর্যন্ত ‘জীবন্ত’ থাকা।

জোহরা সেহগল আমাদের উপহার দিয়ে যান -  অনাবিল আনন্দ মুখর আস্ত জলজ্যান্ত জীবন। তাইতো তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয় - “ এখনো বেঁচে আছি - এই আনন্দটাই সবচেয়ে বড় !”

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
সৌরীশ পান্ডে ঋষি

সৌরীশ পান্ডে ঋষি

জন্ম মুর্শিদাবাদের আজিমগঞ্জে। সাংবাদিকতা ও চলচ্চিত্র নিয়ে পড়াশোনা। সময় কাটে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চর্চায়। বর্তমানে লেখালিখি, ডিজিটাল কন্টেন্ট এবং চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে কর্মব্যস্ত।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য