

ভিক্টর রিপারবেল্লি। ছবি - Google
৬ই আগস্ট, ২০২৬
একশো জন বিনিয়োগকারী ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। বলা হয়েছিল, এই ব্যবসার কোনও ভবিষ্যৎ নেই। আট বছর পর সেই সংস্থার মূল্য ৪ বিলিয়ন ডলার। ChatGPT-র উন্মাদনার আগেই যে তরুণ বুঝেছিলেন, আগামী পৃথিবী আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে তৈরি হবে না, তৈরি হবে অ্যালগরিদমের ভিতরে।
প্রত্যেক প্রযুক্তি বিপ্লবের একটি অদ্ভুত অভ্যাস আছে। যখন সেটি জন্ম নেয়, তখন পৃথিবী তাকে গুরুত্ব দেয় না। বরং উপহাস করে। পরে সেই প্রযুক্তিই মানুষের জীবনযাত্রা পাল্টে দেয়। বাষ্পীয় ইঞ্জিনের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছিল। ইন্টারনেটের ক্ষেত্রেও। স্মার্টফোনের ক্ষেত্রেও। আর এখন সেই একই গল্প যেন আবার লেখা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে ঘিরে।
আজ AI মানেই ChatGPT। কয়েক লাইনের নির্দেশ লিখলেই লেখা, ছবি, ভিডিও, গান- সবই তৈরি করে দিচ্ছে যন্ত্র। কিন্তু এই বিপ্লব রাতারাতি আসেনি। এর পিছনে রয়েছে এমন অনেক মানুষের গল্প, যাঁরা তখনই ভবিষ্যৎ দেখতে পেরেছিলেন, যখন পৃথিবী বর্তমান নিয়েই ব্যস্ত ছিল।
২০১৭ সালে যখন তিনি বিনিয়োগকারীদের সামনে নিজের পরিকল্পনা তুলে ধরছিলেন, তখন কেউ তাঁকে 'দূরদর্শী' বলেননি। বরং বলা হয়েছিল, "এই প্রযুক্তির জন্য বাজার নেই।" আরও অনেকে বলেছিলেন, "মানুষ কোনও দিন কম্পিউটারের তৈরি উপস্থাপককে বিশ্বাস করবে না।"
তার পর শুরু হয় প্রত্যাখ্যানের দীর্ঘ অধ্যায়।
আরও একটি বৈঠক। আবার 'না'। এইভাবে একসময় সংখ্যাটা একশো ছুঁয়ে ফেলে। একশো বার ব্যর্থতা। একশো বার সন্দেহ। একশো বার ফিরে আসা। অনেক উদ্যোক্তার কাছে এটুকুই যথেষ্ট হতো স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়ার জন্য। কিন্তু রিপারবেল্লির কাছে সেটি ছিল না ব্যর্থতা। বরং তিনি এটিকে সময়ের সমস্যা বলে মনে করেছিলেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, প্রযুক্তি যত এগোবে, পৃথিবী একদিন তাঁর ভাবনাকেই গ্রহণ করবে।
রিপারবেল্লি কোনও ভিডিও সংস্থা তৈরি করতে চাননি। তিনি দেখতে পেয়েছিলেন, বিশ্বের সবচেয়ে বড় সমস্যা আসলে ভিডিও বানানো নয়, 'যোগাযোগ'।
একটি বহুজাতিক সংস্থার কথা ভাবুন। একই প্রশিক্ষণমূলক বার্তা পৌঁছে দিতে হবে ৪০টি দেশে। প্রত্যেক দেশের ভাষা আলাদা। প্রত্যেক জায়গায় আবার নতুন করে ভিডিও শুট করতে হবে। অভিনেতা, ক্যামেরা, আলো, সম্পাদনা- সব মিলিয়ে বিপুল খরচ।
রিপারবেল্লির প্রশ্ন ছিল, এই পুরো ব্যবস্থাটাই যদি সফ্টওয়্যার করে দিতে পারে? যদি একজন মানুষকে একবার ডিজিটাল অবতারে রূপান্তর করা যায়, তাহলে কি সেই মানুষটিকে আর ক্যামেরার সামনে দাঁড়াতে হবে? আজ এই প্রশ্নের উত্তর খুব স্বাভাবিক মনে হয়। কিন্তু ২০১৭ সালে এটি ছিল প্রায় বিজ্ঞান কল্পকাহিনি।
স্টার্টআপ দুনিয়ায় একটি কথা খুব জনপ্রিয়- "Being too early often looks exactly like being wrong." অর্থাৎ, সময়ের অনেক আগে পৌঁছে গেলে মানুষ আপনাকে ভুলই ভাববে। ভিক্টর রিপারবেল্লির ক্ষেত্রেও সেটাই ঘটেছিল। বিনিয়োগকারীরা ব্যবসা দেখছিলেন বর্তমানের চোখ দিয়ে। রিপারবেল্লি দেখছিলেন ভবিষ্যতের চোখ দিয়ে। এই দুই দৃষ্টিভঙ্গির সংঘর্ষই তৈরি করেছিল একশোটি প্রত্যাখ্যান।
২০২২ সালের নভেম্বরে ChatGPT আত্মপ্রকাশ করল। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে AI শব্দটি গবেষণাগারের অভিধান থেকে উঠে এসে পৌঁছে গেল সাধারণ মানুষের মোবাইল ফোনে। যে প্রযুক্তিকে এতদিন পরীক্ষামূলক বলা হচ্ছিল, সেটিই হয়ে উঠল বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতার কেন্দ্র।
মাইক্রোসফট, গুগল, মেটা, অ্যামাজন- প্রত্যেকেই AI-তে হাজার হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ শুরু করল। সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে গেল, রিপারবেল্লি ভুল ছিলেন না। তিনি শুধু অনেক আগে পৌঁছে গিয়েছিলেন।
স্টার্টআপের ইতিহাসে এমন ঘটনা নতুন নয়। প্রথমে যারা বিশ্বাস করেনি, সাফল্যের পরে তারাই অংশীদার হতে চায়। ভিক্টর রিপারবেল্লির ক্ষেত্রেও সেই ছবিই দেখা যায়। আজ সংস্থাটির মূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলার। বিশ্বের বহু বড় সংস্থা তাদের AI ভিডিও প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। কর্মীদের প্রশিক্ষণ, বিপণন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিষেবা- সর্বত্র বাড়ছে AI-নির্ভর ভিডিওর ব্যবহার। যে ব্যবসাকে একদিন 'অসম্ভব' বলা হয়েছিল, সেটিই এখন নতুন শিল্পের সংজ্ঞা লিখছে।
এই গল্প কেবল একজন উদ্যোক্তার সাফল্যের নয়। এটি আমাদের সময়েরও গল্প। একটা সময় টাইপরাইটার হারিয়ে গিয়েছিল কম্পিউটারের কাছে। ফিল্ম ক্যামেরা হেরেছিল ডিজিটালের কাছে। কাগজের মানচিত্রকে সরিয়ে দিয়েছিল GPS।
এখন সেই পরিবর্তনের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে ভিডিও শিল্প। আগামী দিনে হয়তো প্রতিটি সংস্থার নিজস্ব AI উপস্থাপক থাকবে। সংবাদ পাঠ করবেন ডিজিটাল অবতার। শিক্ষক পড়াবেন ভার্চুয়াল শ্রেণিকক্ষে। চিকিৎসক রোগীকে বোঝাবেন AI-তৈরি ভিডিওর মাধ্যমে। ভাষার সীমাও অনেকটাই ভেঙে যাবে। এই পরিবর্তনের বীজ যে কয়েকজন মানুষ অনেক আগে বপন করেছিলেন, ভিক্টর রিপারবেল্লি তাঁদের মধ্যে অন্যতম।
তাঁর গল্প তাই ব্যবসার সাফল্যের গল্প নয়। এটি বিশ্বাসের গল্প। এটি সময়কে হার মানানোর গল্প। এটি প্রমাণ করে, ইতিহাসে সবচেয়ে বড় উদ্ভাবনের জন্ম হয় তখনই, যখন পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ বলে— "এটা কখনও সম্ভব নয়।"
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
