

AI বিশ্ব পর্যটনকে বদলে দিয়েছে। ছবি - Google
২৮শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
AI ও ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব পর্যটন। এখন হাতের স্মার্টফোনটাই হয়ে উঠেছে স্মার্টেস্ট ট্যুর গাইড। কোথায় ঘুরতে যাবেন থেকে শুরু করে ট্রেন বা ফ্লাইটের টিকিট কাটা, থাকার জায়গা বুক করা এমনকি ঘণ্টা-মিনিটের নিক্তি মেপে ট্যুর প্ল্যান সবই আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ও ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে মুহূর্তের মধ্যে হয়ে যাচ্ছে।
ব্যাগ গুছিয়ে অজানা গন্তব্যে বেরিয়ে পড়ার রোমাঞ্চ মানুষের মজ্জাগত। কিন্তু সেই রোমাঞ্চের সঙ্গী যদি হয় আধুনিক প্রযুক্তি, তবে কেমন হয়? ভাবুন তো, টিকিট কাটা থেকে শুরু করে অচেনা শহরের অলিগলি চিনে নেওয়া, প্রযুক্তির হাত ধরে সবই হচ্ছে নিমিষে। পর্যটন এখন আর শুধু মানচিত্র আর গাইডবইয়ের পাতায় আটকে নেই। ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের থিম ঠিক এই কথাটাই আরও ভালো করে মনে করিয়ে দিল।
‘ডিজিটাল অ্যাজেন্ডা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে পর্যটনের নতুন রূপরেখা তৈরি’ করার এই ভাবনাকে সামনে রেখেই এগোচ্ছে গোটা বিশ্ব। উল্লেখ্য ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে এবারের থিম কান্ট্রি ছিল এল সালভাদর।
একটা সময় ছিল যখন ট্যুর প্ল্যানিং বা টিকিট বুকিংয়ের জন্য ট্রাভেল এজেন্টের দরজায় কড়া নাড়তে হত। এখন সেই দিন অতীত। আপনার স্মার্টফোনটাই এখন সবচেয়ে বিশ্বস্ত ট্যুর গাইড। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে মুহূর্তের মধ্যে তৈরি হয়ে যাচ্ছে নিখুঁত ভ্রমণ প্ল্যান। ধরুন, আপনি ঠিক করলেন সামনের সপ্তাহান্তে একটু নিরিবিলিতে কাটাবেন। আপনার পছন্দ হাওড়া স্টেশন থেকে ট্রেনে চেপে গন্তব্যে পৌঁছানো। সেখানে থাকবে নদীর শান্ত পরিবেশ, হয়ত একটা হাউসবোট। আর পাতে চাই খাঁটি বাঙালি স্বাদ। যেমন মুচমুচে ভেটকি ফিশ ফ্রাই আর গরম ভাতের সাথে চিংড়ি মালাইকারি।
ঠিক এইটুকু তথ্য দিলেই চোখের সামনে ভেসে উঠবে একদম কাস্টমাইজড একটা ট্যুর প্ল্যান। শুধু তাই নয়। স্মার্ট অ্যালগরিদম অতীত ডেটা বিশ্লেষণ করে বলে দিচ্ছে, ঠিক কখন ফ্লাইটের বা হোটেলের ভাড়া সবচেয়ে কম থাকবে। ফলে পকেটের রেস্ত বাঁচানোও এখন অনেক সহজ হয়ে গিয়েছে। যাওয়ার আগেই ভার্চুয়াল রিয়েলিটির মাধ্যমে যে রিসর্টে থাকবেন, সেখানকার ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ দেখে নিয়েও পারবেন। ফলে এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিকল্প যেমন বেড়েছে, তেমনই সিদ্ধান্ত নেওয়াটাও জলের মতো সোজা হয়ে গিয়েছে।
বর্তমান বিশ্বের অন্যতম বড় মাথা ব্যথা হল ওভারট্যুরিজম বা অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ। জনপ্রিয় গন্তব্যগুলো মানুষের ভিড়ে হাঁসফাঁস করছে। ফলে ক্ষতি হচ্ছে পরিবেশ এবং পর্যটন ক্ষেন্দ্রের স্বাভাবিকতার। এই সঙ্কট থেকে বাঁচার পথও দেখাচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তি।
এই প্রসঙ্গে ইতালির ভেনিস শহরের কথাই ধরা যাক। প্রতিদিন সেখানে হাজার হাজার মানুষের ঢল নামে। এই ভিড় সামলাতে শহরটিতে তৈরি হয়েছে একটি স্মার্ট কন্ট্রোল রুম। সিসিটিভি ক্যামেরা আর মোবাইল নেটওয়ার্কের ডেটা বিশ্লেষণ করে রিয়েল টাইমে ভিড়ের হিসাব রাখা হচ্ছে। মাত্রা ছাড়ালেই পর্যটকদের বিকল্প রুট ব্যবহারের নির্দেশ দেওয়া হয়। জাপানের কিয়োটোতেও একই অবস্থা। বিখ্যাত মন্দিরগুলোতে বসানো সেন্সরের সাহায্যে ভিড়ের পূর্বাভাস মেলে। ফলে দর্শনার্থীদের স্মার্টফোনে নোটিফিকেশন পাঠিয়ে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা সময়ে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। যার মাধ্যমে ভিড় নিয়ন্ত্রণ করতে সুবিধা হয়।
নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামে ডিজিটাল ম্যাপের সাহায্যে পর্যটকদের কম পরিচিত, কিন্তু নজরকাড়া জায়গাগুলোর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পেরুর ম্যাচু পিচুতে তো আবহাওয়া আর অতীত ডেটা ম্যাচ করিয়ে প্রতিদিন কতজন দর্শনার্থী প্রবেশ করতে পারবেন তা নির্ধারণ করা হচ্ছে। এভাবেই পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকছে ডিজিটাল প্রযুক্তির হাত ধরে।
নতুন জায়গায় গিয়ে ভাষার সমস্যায় পড়েননি এমন পর্যটক মেলা ভার। কিন্তু এখন রিয়েল টাইম ট্রান্সলেশন অ্যাপের সাহায্যে স্থানীয় মানুষের সাথে সহজেই কথোপকথন চালানো যায়। গাইড ছাড়াই স্থানীয় সংস্কৃতির সাথে মিশে যাওয়ার এক অদ্ভুত আনন্দ রয়েছে। অগমেন্টেড রিয়েলিটির কল্যাণে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর আবেদনও এখন বহুগুণ বেড়ে গেছে। ফলে কোনও প্রাচীন ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে স্মার্টফোনের ক্যামেরা ধরলেই স্ক্রিনে ভেসে ওঠে শত শত বছর আগের সেই স্থাপত্যের আসল রূপ। ইতিহাস যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে।
এর পাশাপাশি বিমানবন্দরে ইমিগ্রেশন থেকে শুরু করে হোটেলে ঢোকা পর্যন্ত ফেসিয়াল রিকগনিশন আর বায়োমেট্রিক স্ক্যানের ব্যবহার লম্বা লাইনে দাঁড়ানোর বিরক্তি দূর করেছে।
প্রযুক্তির সুবিধা শুধু বড় বড় এয়ারলাইন্স বা ফাইভ স্টার হোটেলের একচেটিয়া অধিকারে এখন আর সীমাবদ্ধ নয়। এটি স্থানীয় অর্থনীতিকেও দারুণভাবে চাঙ্গা করছে। সোশ্যাল মিডিয়া আর ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের হাত ধরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের হোমস্টে মালিক বা স্থানীয় হস্তশিল্পীরা সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছেন বিশ্বের যে কোনও প্রান্তের মানুষের কাছে। ডিজিটাল পেমেন্টের কারণে স্থানীয় অর্থনীতিতে অর্থের লেনদেন আরও স্বচ্ছ ও দ্রুত হচ্ছে।
সব কিছুর পরও একটা কথা মনে রাখা জরুরি। প্রযুক্তি যতই উন্নত হোক, মানুষের উষ্ণ আতিথেয়তার কোনও বিকল্প হয় না। একজন স্থানীয় মানুষের আন্তরিক হাসি বা যত্ন করে খাওয়ানোর স্মৃতি কোনও যন্ত্র তৈরি করতে পারবে না। প্রযুক্তি আমাদের যাত্রাপথকে সহজ করবে, ভিড় সামলাবে, খরচ বাঁচাবে। কিন্তু ভ্রমণের মূল নির্যাস হল মানুষের সাথে মানুষের সংযোগেই থেকে যাবে। ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবস এই শিক্ষাই দিল, ডেটা আর মানুষের মেলবন্ধনেই লুকিয়ে আছে পর্যটনের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
