

নাৎসি শাসনের দুঃস্বপ্ন ফিরবে জার্মানিতে? ছবি - Google
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো কট্টর ডানপন্থী দল জার্মানির কোনো রাজ্যে সরকার গঠনের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেল। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য স্যাক্সনি-আনহাল্টের সাম্প্রতিক নির্বাচনে অভিবাসনবিরোধী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী দল ‘অল্টারনেটিভ ফর ডয়চল্যান্ড’ (AfD)-এর অভাবনীয় জয় গোটা ইউরোপের রাজনীতিতেই তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দেশটির প্রভাবশালী সাময়িকী 'ডের স্পিগেল' এই ফলাফলকে ৯ মাত্রার এক "রাজনৈতিক ভূমিকম্প" বলে আখ্যায়িত করেছে।
এই জয় কেবল একটি রাজ্যের ক্ষমতার পালাবদল নয়, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভিতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।
স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্য নির্বাচনে প্রায় ৪৪ শতাংশ (৪৩.৮%) ভোট পেয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার একদম কাছাকাছি পৌঁছে গেছে এএফডি। ৮৩ আসনের প্রাদেশিক সংসদে দলটি নিশ্চিত করেছে ৩৯টি আসন।
এর বিপরীতে, বর্তমান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেয়ার্ৎসের ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ দল ‘ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন’ (সিডিইউ) মুখ থুবড়ে পড়েছে। তারা পেয়েছে মাত্র ১৭.২ শতাংশ ভোট (১৫টি আসন), যা এএফডির চেয়ে প্রায় ২৭ শতাংশ পয়েন্ট পিছিয়ে। চ্যান্সেলরের জোটসঙ্গী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরাও (এসপিডি) মাত্র ৯ শতাংশের কিছু বেশি ভোট পেয়ে কার্যত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
এএফডির শীর্ষ নেতৃত্ব স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, এই জনাদেশ তাদের রাজ্য পরিচালনার জন্যই। ক্ষমতায় গেলে শিক্ষানীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পাশাপাশি অবৈধ অভিবাসী বিতাড়ন ও বিতর্কিত সব সামাজিক নীতি কার্যকরের ঘোষণা দিয়েছে দলটি।
জার্মানির যুদ্ধোত্তর রাজনীতিতে একটি অলিখিত ঐকমত্য ছিল—গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদ রক্ষার স্বার্থে কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দল কট্টর ডানপন্থী বা নাৎসি মতাদর্শের ছায়ায় থাকা দলগুলোর সঙ্গে হাত মেলাবে না। জার্মান রাজনীতিতে এটিকে বলা হয় ‘ফায়ারওয়াল’ (Brandmauer) নীতি। কিন্তু স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলাফল এই নীতিকে বড় পরীক্ষার মুখে ফেলেছে:
জোট গঠনের জটিলতা: এএফডি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থেকে সামান্য দূরে থাকায় সরকার গড়তে তাদের অন্য দলের সমর্থন প্রয়োজন।
‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ জোটের অসম্ভব সমীকরণ: অতীতে কট্টর ডানপন্থীদের রুখতে বাম, মধ্যপন্থী ও রক্ষণশীলরা মিলে জগাখিচুড়ি বা তথাকথিত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন’ জোট গঠন করলেও, এবার এএফডি এত বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে যে তাদের বাদ দিয়ে সরকার গড়ার মতো রাজনৈতিক বৈধতা সিডিইউ হারিয়েছে বলে দলের রাজ্য নেতারাও স্বীকার করছেন।
নতুন নির্বাচনের ঝুঁকি: এএফডির মুখ্যমন্ত্রী পদপ্রার্থী উর্লিখ জিগমুন্ট স্পষ্ট জানিয়েছেন, অন্য দলগুলো সরাসরি বা পরোক্ষ সমর্থন না দিলে তারা ফের নির্বাচনের পথ বেছে নিতে পারেন।
ক্ষমতায় আসার মাত্র ১৬ মাসের মাথায় এই পরাজয় চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মেয়ার্ৎসের নেতৃত্বের ওপর বড় ধরনের আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ফলাফল দেখে মেয়ার্ৎস নিজেও "গভীরভাবে হতবাক" হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচনী সমীক্ষাগুলো বলছে, এই পরাজয়ের পেছনে মূল কারণ ছিল:
১. অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধি: স্যাক্সনি-আনহাল্ট জার্মানির অপেক্ষাকৃত দরিদ্র অঞ্চলগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক অস্থিরতা ও মুদ্রাস্ফীতির কারণে জ্বালানি তেলের আকাশছোঁয়া দাম সাধারণ মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে।
২. প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের হতাশা: অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারের দেওয়া আশ্বাস বাস্তবে রূপ না পাওয়ায় ভোটাররা ক্ষোভে ব্যালট বাক্সে রায় দিয়েছেন।
৩. অভিবাসনকে ছাপিয়ে অর্থনৈতিক অসন্তোষ: প্রচলিত ধারণার বাইরে গিয়ে এবার ভোটারদের প্রধান মাথাব্যথার কারণ ছিল প্রতিদিনের জীবনযাত্রার ব্যয় ও জীবিকা, যা এএফডির পালে অতিরিক্ত হাওয়া জুগিয়েছে।
এই ফলাফলের প্রভাব কেবল স্যাক্সনি-আনহাল্টেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। চলতি মাসেই রাজধানী বার্লিন এবং মেকলেনবার্গ-ওয়েস্টার্ন পোমেরানিয়ার রাজ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে।
ইতিমধ্যেই জনমত সমীক্ষায় মেকলেনবার্গে এএফডি এগিয়ে রয়েছে, আর বার্লিনের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণেও তারা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে উঠে এসেছে। এএফডির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানিয়েছে, তাদের লক্ষ্য এখন ২০২৯ সালের জাতীয় সাধারণ নির্বাচনে অন্তত ৪০ শতাংশ ভোট নিশ্চিত করে বার্লিনের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় যাওয়া।
পূর্ব জার্মানির এই রায় স্পষ্ট বুঝিয়ে দিয়েছে, মূলধারার দলগুলো সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট ও উদ্বেগের বাস্তবসম্মত সমাধান না দিলে জার্মান রাজনীতিতে ডানপন্থী চরমপন্থার রাশ টানা আগামী দিনগুলোতে আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
