

৪৮ বছর আগে ইস্টবেঙ্গল-আরারত ম্যাচ। ছবি - Google
২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রায় পাঁচ দশক আগে রাশিয়ার শক্তিশালী আরারত ক্লাবকে স্বাভাবিক খেলাটাই খেলতে দেয়নি ইস্টবেঙ্গল। বিদেশি দলের বিরুদ্ধে বরাবরের ভালো খেলা ইস্টবেঙ্গল সেদিন শেষ মুহূর্তে এসে একটা ছোট্ট ভুলের জেরে পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই লড়াই ভারতীয় ফুটবলের ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।
এবারের আইএফএ শিল্ড শুরু হয়েছে। কলকাতার দুই প্রধান প্রথম ম্যাচেই জয় পেয়েছে। এবার কেন, অনেকদিন ধরেই শিল্ডে আর বিদেশি দল খেলতে আসে না। মোহনবাগান এবার সিনিয়র দল নামালেও ইস্টবেঙ্গল প্রথম ম্যাচেই জুনিয়র সমৃদ্ধ দল নামিয়েছে। কিন্তু অতীতের স্মৃতি যদি মনে করি দেখব লাল হলুদ দল বিদেশী দলের বিরুদ্ধে বারবার ভাল ফুটবল খেলেছে।
শুধু তাই নয় এবার এএফসি লিগের ম্যাচে অন্যের ঘরের মাঠে গিয়ে জর্ডনের দলকে আটকে দিয়েছে ইস্টবেঙ্গল। কেন বারবার বিদেশি দলের বিরুদ্ধে ভাল খেলে তারা, সেটি ময়দানে মিথ হয়ে রয়েছে।
বিশেষ করে ৭০ - ৯০ দশকে বারবার এই কথাটা প্রমানিত হয়েছে। পাস ক্লাব..পোর্ট অথরিটি..পিয়ং ইয়ং...লেভেন্টিস ইউনাইটেড...সেলেঙ্গার...আল জাওরা সহ বহু নামী বিদেশি দলকে পরাজিত করেছে লাল হলুদ যোদ্ধারা।
আবার দূর্দান্ত লড়াই করার পরেও ১৯৭৮ সালের শিল্ড সেমিফাইনালে রাশিয়ার আরারত ক্লাবের কাছে একেবারে শেষ মুহূর্তের গোলে পরাজিত হয়েছিল ইস্টবেঙ্গল। ইরানের পাস ক্লাবের বিরুদ্ধে ইস্টবেঙ্গলের জয় ঐতিহাসিক হয়ে রয়েছে। গোল করেছিলেন প্রয়াত পরিমল দে।
যেমন স্মৃতিতে ধরা পড়ে আরারাত ম্যাচের কথা। লড়াইয়ের আরেক নাম ইস্টবেঙ্গল..তাই ওই শিল্ড সেমিফাইনালে শক্তিশালী আরারত দলের বিরুদ্ধে কিছুতেই হারব না এই মানসিকতা নিয়ে মাঠে নেমে কীভাবে আরারতের মতো শক্তিশালী দলের সহজাত স্বচ্ছন্দ ও তালমিলকে ভেঙে দেওয়া যায় তার প্রমান সেদিন মাঠ ভর্তি দর্শকেরা দেখতে পেয়েছিল।
চিরাচরিত ৪-২-৪ ছকের পরিবর্তে রক্ষণকে জমাট করার জন্য ৪-৩-৩ ছকে দল নামিয়ে ছিল ইস্টবেঙ্গল। কাউন্টার অ্যাটাক নির্ভর ফুটবলে বিশ্বাস রেখেছিল। মিহির বসুকে একটু নীচ থেকে ব্যবহার করা হয়, সেদিন অসাধারণ খেলেছিলেন মিহির বসু। আক্রমনভাগে লোক কম থাকায় অধিকাংশ সময়ে ইস্টবেঙ্গলের সীমানায় বল ঘোরাফেরা করলেও রক্ষণ জমাট থাকায় আরারতের ফুটবলাররা তিন কাঠি লক্ষ্য করে শট নেওয়ার সুযোগ খুব একটা পায়নি..যে কটা গোলমুখী আক্রমণ ছিল, সেগুলো গোলরক্ষক ভাস্কর গাঙ্গুলি অসাধারণ দক্ষতার সাথে প্রতিহত করেন। ৭৫ মিনিটের মাথায় ভাস্করের আউটিং-এ সামান্য ভুল থাকায় আরারতের ১০ নম্বর খেলোয়াড় আগনেসিয়ানের শট ফাঁকা গোলে ঢুকে যাচ্ছিল, নিশ্চিত গোল ভেবে লাল হলুদ গ্যালারির সবার মাথার হাত পড়ে গেছে, কিন্তু কোথা থেকে মাটি ফুঁড়ে দেবদূতের মতো উদয় হন শ্যামল ঘোষ। বল গোলে ঢোকার মূহূর্তে অসাধারণ দক্ষতায় গোল লাইন সেভ করে ইস্টবেঙ্গলকে তো রক্ষা করনই, সাথে লাল হলুদ গ্যালারিতে স্বস্তি এনে দিয়েছিলেন।
৫৫ মিনিটের পর থেকেই শুরু হয়েছিল বৃষ্টি, মাঠ পিচ্ছিল হয়ে যাওয়ায় ভাল খেলার অন্তরায় হয়ে ওঠে। রক্ষণে ব্যস্ত থাকলেও ইস্টবেঙ্গল যে প্রতি আক্রমনে যায়নি এমনটা নয়। প্রথমার্ধে উলগাথন সুবিধাজনক জায়গায় বল পেয়ে গেলে শট নিতে সামান্য দেরী করায় আরারতের স্টপার কর্নার করে সে যাত্রায় দলকে রক্ষা করেনা। দ্বিতীয়ার্ধে সুরজিৎ সেনগুপ্তর শট ক্রশবারের ওপর দিয়ে চলে যায়। সত্যি বলতে কি সেদিন সুরজিৎ আর সাবির আলি ঠিক মতো বলের যোগান পায়নি দল রক্ষনাত্বক স্ট্রাটেজি নেওয়ায়। সবাই যখন অতিরিক্ত সময়ে খেলা দেখার জন্য মানসিক প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই অর্থাৎ ৮৬ মিনিটের মাথায় বাঁ দিক থেকে ভেসে আসা সেন্টারে পা ছুঁইয়ে একমাত্র গোলটা করেন আরারতের অধিনায়ক আনদ্রানিক। এই একটি গোলেই সেমিফাইনালের নিষ্পত্তি হয়ে যায়। নাহলে ওই ম্যাচে লাল হলুদের লড়াই ভারতীয় ফুটবল ইতিহাসে চিরন্তন হয়ে গিয়েছে। আজ সেই ম্যাচের ৪৮ বছর পূর্ণ হল। ওই ম্যাচ নিয়ে মিহির বসু জানিয়েছেন, দারুণ খেলা হয়েছিল। আমরা জিতেই যেতাম। কোচ ছিলেন প্রয়াত পি কে ব্যানার্জি।
সেদিন ইস্টবেঙ্গল দলে কারা খেলেছিলেন, সেটিও জানালেন ওই ম্যাচের ট্রাজিক নায়ক মিহির। গোলে : ভাস্কর গাঙ্গুলি। ডিফেন্স: সমীর মূখার্জী, চিন্ময় চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল ঘোষ, সত্যজিৎ মিত্র। মিডফিল্ডার: সমরেশ চৌধুরী, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, সুরজিৎ সেনগুপ্ত, মিহির বসু। স্ট্রাইকার: সাবির আলি(তপন দাস).. উলগানাথন।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
