৪ঠা অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
প্রিয় রাজা’র স্মৃতি বুকে আগলে রেখেছেন বন্ধু হীরা, ভুবনরা

অকালে চলে যান ফুটবলার সঞ্জীব দত্ত। ছবি - Google

প্রিয় রাজা’র স্মৃতি বুকে আগলে রেখেছেন বন্ধু হীরা, ভুবনরা

calender icon 2 ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

কলকাতা ময়দানে এখনও কান পাতলে তাঁর কথা শোনা যায়। বলা হয়, অকালে চলে না গেলে সঞ্জীব দত্তের ফুটবল ক্যারিশমায় আরও কিছুদিন বুঁদ থাকত ভারতীয় ফুটবলমহল। কৃশানু দে-র মতো তিনিও ছিলেন বল প্লেয়ার, বলকে কথা বলাতে পারতেন। তাঁর ডিফেন্স চেরা থ্রু ধরে কত স্ট্রাইকার যে গোল করেছেন, ইয়ত্তা নেই। 

৩৩ বছর আগে ফুটবল মাঠে এক ভয়াবহ ঘটনায় সঞ্জীব ওরফে রাজার জীবনাবসান হয়েছিল। ওই ঘটনার পরে ফুটবল মাঠে প্রাণ হারান ব্রাজিলীয় কিংবদন্তি জুনিয়র। তবুও ঘরের ছেলের মৃত্যুতে এখনও আচ্ছন্ন ফুটবল ময়দান। 

সেই কালো দিন

১৯৯৩ সালে সন্তোষ ট্রফির আসর বসেছিল কান্নুরে। গ্রুপ লিগের গুরুত্বপূর্ণ একটা ম‍্যাচে মুখোমুখি হয় রেলওয়ে বনাম অন্ধ্রপ্রদেশ। রেলওয়ে এক গোলে এগিয়ে, তখনই শূন‍্যে একটা বল হেড করার জন‍্য লাফিয়ে উঠলেন রেলওয়ে দলের সঞ্জীব দত্ত এবং অন্ধ্রের এক ডিফেন্ডার। সঞ্জীব দত্তের লক্ষ‍্য ছিল বলকে বিপদমুক্ত করা ও অন্ধ্রের খেলোয়াড়ের লক্ষ‍্য সঞ্জীবের শরীর। খেলোয়াড়টি কনুই দিয়ে সজোরে আঘাত করলেন সঞ্জীবের বুকে। যেহেতু সঞ্জীব দত্ত শুন‍্যে ছিলেন শরীরের কোনও ভারসাম্য রাখতে পারেননি, তাই খুব উঁচু থেকে তাঁর শরীরটা মাটিতে আছড়ে পড়ে। ততক্ষণে সঞ্জীবের হৃদস্পন্দন থমকে গিয়েছে। সতীর্থ ফুটবলাররা কৃত্রিমভাবে শ্বাসক্রিয়া সচল করার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু তারপরেই দেখা যায় রাজার মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা বেরতে শুরু করে দিয়েছে।  

সেদিন মাঠে ছিল না অ্যাম্বুলেন্স

সেদিন মাঠে ছিল না কোনও অ্যাম্বুলেন্স, দেখা যায়নি চিকিৎসার কোনও ব‍্যবস্থা। সবকিছু মিলিয়ে অকালেই চলে যেতে হয়েছিল বাংলার নামী তারকাকে। তিনি যেহেতু রেলে চাকরি করতেন, তাই সন্তোষ ট্রফিতে সঞ্জীব খেলেছিলেন রেলওয়ের হয়েই। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার আগেই সব শেষ হয়ে যায়। মাত্র ২৮ বছরেই থেমে যেতে হয় ওই প্রতিভাধর নামী তারকাকে।

আরও পড়ুন
ভিনেশের স্মৃতি ফেরালেন সূচিকা, ওজন কমায় সোনার সুযোগ হাতছাড়া!
স্মৃতিতে অম্লান সুদীপ, টুলু ছিলেন ভারতের ‘মিডফিল্ড জেনারেল’
দুটি হাতই নেই, পা দিয়ে তীর ছুঁড়েই দৃষ্টান্ত! প্রেরণার নাম শীতল দেবী

রেল সেই ম্যাচে জিতলেও রাজা হেরে যান জীবনযুদ্ধে। ওই ঘটনার পরেরদিনই ফুটবলার হীরালাল দাস সহ বাকীদের সহায়তায় কান্নুর থেকে মৃতদেহ নিয়ে আসা হয় কলকাতায়। অসংখ্য ফুটবলপ্রেমী তাঁদের প্রিয় রাজাকে শেষবার দেখার জন‍্য জমায়েত হয়েছিলেন ময়দানে। সতীর্থদের কাঁধে চেপে এগিয়ে গিয়েছিলেন শেষ যাত্রার পথে। 

বাড়ি না থাকলেও আজও অটুট রাজার স্মৃতি

তারপরে অনেক কিছুই বদলে গিয়েছে হাওড়ার শিবপুরের আনন্দ কুমার চৌধুরী লেন। তবে হারিয়ে যায়নি সেই করুণ স্মৃতি৷ ৩৩ বছর আগে যে সরু গলিটা ভেসে গিয়েছিল কান্নায়, উপচে পড়েছিল মানুষের ভিড়ে৷ এখনও সেই গলিতে কান পাতলে শোনা যায় রাজা-র নাম৷ সোমবার দুপুরে সঞ্জীবের পাড়ায় ঢুঁ মারতে গিয়ে দেখা গিয়েছে - এত বছর পরেও অটুট তাঁর স্মৃতি৷ শিবপুর বাজার লাগোয়া আনন্দ কুমার চৌধুরী লেনে অনেক ফ্ল্যাট বাড়ি হয়েছে৷ পুরোনো বাড়ি ভেঙে আধুনিক বাড়ি বেড়েছে কালের নিয়মেই৷ কিন্তু কোথায় সেই নামী ফুটবলারের আস্তানা? সেই পুরনো একতলা বাড়ি৷ রাস্তার ধারে তিনটে খোলা জানলা৷ ভিতরে চোখ রাখলেই দেখা যেত, বিভিন্ন টুর্নামেন্টে পাওয়া সঞ্জীবের নানা পুরস্কার ছড়িয়ে ছিটিয়ে৷ সেই বাড়ি আর নেই৷ সেখানে এখন একটা দোতলা বাড়ি৷ সঞ্জীব মারা যাওয়ার পরে তাঁর বিধবা মা ওই একতলা বাড়িটায় বেশ কয়েক বছর ছিলেন৷ তারপর সঞ্জীবের দিদিরাই মাকে নিয়ে চলে যান৷ বাড়িটাও বিক্রি হয়ে যায়৷ সঞ্জীবের মা-ও বেশ কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছেন তাঁর মেয়ের কাছেই বারাসতে৷

রাজার ছোটবেলার বন্ধুরা রয়েছেন, তেমনই দেখা গেল সুভাষ মান্না ও ভুবন চট্টোপাধ্যায়দের। রাজার স্মৃতিতে তাঁরাও বেদনাহত। সুভাষ বলছিলেন, ‘‘রাজা মাঠের অলরাউন্ডার ছিলেন। একটা সময় স্ট্রাইকার থেকে মাঝমাঠে খেলেছে, পরে আবার মোহনবাগানে লেফটব্যাক হিসেবে খেলেও নাম করেছিল।’’ ভুবনের কথাতেও রাজার দাপট। জানালেন, ‘‘রাজা তখনই ভারতীয় দলে সুযোগ পেয়ে গিয়েছে। ওরকমভাবে যদি মৃত্যু না হতো, ওঁর খেলা দেখে মনে পড়ে যেত চুনীদা-র কথা। সেই কারণেই আমাদের বন্ধুকে কোনওদিন ভুলতে পারব না। রাজা আমাদের হাওড়ার গর্ব ছিল।’’

কথা রাখেনি AIFF

সঞ্জীবের বাড়ির ঢিল ছোঁড়া দূরে থাকেন প্রাক্তন ফুটবলার হীরালাল দাস৷ সঞ্জীবের কফিন নিয়ে তিনিই শহরে ফিরেছিলেন৷ সহযোদ্ধার কথা বলতে গেলে এখনও গলা ধরে আসে হীরার। বুকে কষ্ট নিয়েই জানিয়েছেন, সেইসময় সঞ্জীবের স্মৃতির উদ্দেশে ফেডারেশন জানিয়েছিল, সন্তোষ ট্রফির ফেয়ারপ্লে ট্রফির নাম দেওয়া হবে রাজার নামে। কিন্তু কোথায় কী, কিছুই হয়নি। আর বর্তমানে তো সন্তোষ ট্রফির কোনও গুরুত্বই নেই। রেলও আর টুর্নামেন্টে নাম দেয় না, তারা চাকরি দিতে পারে না ফুটবলারদের। এ দেশের আর কীই বা হবে!’’

সঞ্জীবের অকাল প্রয়াণের পরে তাঁর নিজের অঞ্চল তাঁর স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে বাড়ির সামনে একটি তুলসী মঞ্চে তাঁর নাম লিখে রেখেছে। আর শিবপুর বার্নিং ঘাটে তাঁর স্মৃতি রক্ষার্থে একটি শহিদ বেদী করা হয়েছে। না হলে সারা হাওড়াতে আর তাঁর কোনও স্মৃতি চিহ্ন নেই। একদা নামী ফুটবলার এভাবেই হয়তো একসময় হারিয়ে যাবেন স্মৃতির পাতা থেকেও! শুধু রাজার স্মৃতি নিয়ে বেঁচে তাঁর সমসাময়িক বন্ধুরাই।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
শুভ্র মুখোপাধ্যায়
শুভ্র মুখোপাধ্যায়

কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য