

মেঘে ঢাকা কার্শিয়ং। ছবি - Google.
১লা অক্টোবর, ২০২৬
দার্জিলিংয়ের চেনা ভিড়, ম্যাল রোডের জ্যাম আর কোলাহল এড়িয়ে পাহাড়ের খাঁটি নির্জনতা খুঁজছেন? কুয়াশায় ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখোমুখি হতে পা বাড়ান উত্তরবঙ্গের ৫ অফবিট গ্রামে—সিটং, অহলদারা, মহালদিরাম, তাবাকোশী ও রঙ্গারুন। হোমস্টে, স্থানীয় পাহাড়ি খাবার আর ৭ দিনের নিখুঁত ভ্রমণসূচি নিয়ে বিস্তারিত গাইড।
ছুটি পেলেই মন পাহাড় পাহাড় করে? আর পাহাড় মানেই যদি হাতের কাছের সেই একই দার্জিলিং হয়, তাহলে তো একঘেয়েমি আসতে বাধ্য! সেই একই ম্যাল রোড, চকবাজারের ট্র্যাফিক জ্যাম! কদাচিৎ কাঞ্চনজঙ্ঘার উঁকি, নয়তো শুধুই গ্লেনেরিজ, কেভেন্টারস-এ পোজ দিয়ে ছবি তোলো খাও-দাও ব্যাস, ঘোরা শেষ! আজ্ঞে না বস, উত্তরবঙ্গের জাদু তবে ধরাই দেয়নি আপনার কাছে।
এবার পথ বদলানোর সময় এসেছে। বিশ্বাস করুন, দার্জিলিংয়ের সমান্তরালেই পাহাড়ি কুয়াশার চাদর জড়িয়ে চুপচাপ ঘুমিয়ে আছে এমন কিছু গ্রাম, যেখানে পা রাখলেই দিলখুশ হয়ে যাবে। ভাববেন, এত কাছেই ছিল, জানতাম না! তাই আর দেরি না করে জেনে নিন সেরা কিছু অফবিট ডেস্টিনেশন, একেবারে হাতের নাগালেই!
এবার ট্যুর প্ল্যান করলে গন্তব্য হোক— সিটং, অহলদারা, মহালদিরাম, তাবাকোশী আর রঙ্গারুন—এক সপ্তাহের সুন্দর অফবিট লুপে চিনে নেওয়া যাক উত্তরবঙ্গের জাদু। কী ভাবে যাবেন আর কী দেখবেন? রইল লো বাজেট ট্রিপের সাত-সতেরো।

শিলিগুড়ির সমতল ছাড়িয়ে সেবক বা শিবখোলার পাহাড়ি রাস্তা ধরে আড়াই থেকে তিন ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায় মহানন্দা বন্যপ্রাণ অভয়ারণ্যের কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা সিটং উপত্যকায়। স্থানীয় লেপচাদের ভাষায় সিটং মানে শীতল পাহাড়ি ঝর্ণা। শীতের শুরুতে এখানে পা রাখলে মনে হয় গোটা পাহাড়টাই যেন হলুদ আর কমলার রঙে সেজে উঠেছে। গ্রামের প্রতিটি বাড়ির উঠোনে ঝুঁকে থাকে ফলভরা কমলালেবু গাছ। সিটংয়ের শতাব্দীপ্রাচীন বাঁশের তৈরি চার্চ আর ধাপে ধাপে নেমে যাওয়া পাহাড়ি জনপদ এক নিমেষেই নাগরিক ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয়।
সিটং থেকে সামান্য ওপরে উঠলেই অহলদারা ভিউপয়েন্ট। পাহাড়ের শীর্ষদেশে দাঁড়ালে চারপাশের ৩৬০ ডিগ্রি প্যানোরামিক দৃশ্য চোখের সামনে উন্মুক্ত হয়। একদিকে বিস্তীর্ণ চা বাগান, অন্যদিকে কালিম্পংয়ের পাহাড় আর অনেক নিচে সাপের মতো এঁকেবেঁকে চলা রূপোলি তিস্তা নদী। সূর্যাস্তের সময় যখন তিস্তার জলে পড়ন্ত রোদের সোনালি আভা ঠিকরে পড়ে, সেই দৃশ্য কোনো রূপকথার চেয়ে কম নয়।

অহলদারা ছাড়িয়ে আরও কিছুটা উঁচুতে উঠলেই সিনকোনা প্ল্যান্টেশন ও ঘন পাইন-ফার গাছের নিঃশব্দ রাজ্য—মহালদিরাম। এখানে শুধুই মেঘের আনাগোনা। ঘুম ভেঙেই দেখবেন ঘরে ঢুকে পড়েছে মেঘ! কখনও আপনি উপরে মেঘ নীচে। আবার কখনও রোদ ঝলমলে সকালে হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি পেলে চমকাবেন না যেন! এক হাত দূরেই দেখবেন বৃষ্টি নেই, সব পড়ছে আপনার মাথায়। কেন এমন হয় জানেন? মজার বিষয় হল, পাইন গাছ জল ধরে রাখে। ইচ্ছে মতো সেই জল ছেড়ে সেগুলো স্থানীয় বৃষ্টি তৈরি করে। মহালদিরামে তাই সব সময়েই মেঘ-বৃষ্টির খেলা। ব্রিটিশ আমলে ম্যালেরিয়ার ওষুধ কুইনাইন তৈরির জন্য এখানকার পাহাড়জুড়ে রোপণ করা হয়েছিল সিনকোনা গাছ। এখানকার বাতাসে এখনও সেই পুরনো ইতিহাসের সোঁদা গন্ধ। পর্যটকদের আনাগোনা এখানে প্রায় নেই বললেই চলে। নির্জন পাহাড়ি ট্রেইলে বুনো অর্কিড আর ফার্নের ফাঁক দিয়ে নেমে আসা রোদের আলো-ছায়া দেখতে দেখতে কাটিয়ে দেওয়া যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হাতে সময় থাকলে এখানেই কেটে যেতে পারে দিন তিনেক। আর কম দিনের ট্যুর প্ল্যান করলে অন্তত ২ দিন এখানে থেকে যেতেই হবে আপনাকে।
মহালদিরামের নির্জনতা পেছনে ফেলে কার্শিয়াং ও মিরিক রোড ধরে নামলে পৌঁছানো যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূগোলের জনপদ তাবাকোশীতে। সাধারণত পাহাড়ি গ্রামগুলো পাহাড়ের মাথায় বা ঢালে থাকে, কিন্তু তাবাকোশী একটি স্বতন্ত্র নদী উপত্যকা। গোপালধারা চা বাগানের সবুজ মখমলের ঠিক বুক চিরে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী ‘রংবং’। নদীর পাথরে বসে পা ডুবিয়ে শান্ত দুপুর কাটানো কিংবা কাঠের সাঁকো পেরিয়ে চা পাতা তোলার দৃশ্য দেখা—এখানে সময় যেন পুরোপুরি থমকে থাকে। অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত ফার্স্ট ফ্লাশ চায়ের স্বাদ নিয়ে নদীর কলতানে রাত কাটানোর অভিজ্ঞতা তাবাকোশীর অনন্য প্রাপ্তি।
এই ট্রিপের সবচেয়ে নাটকীয় মোড় অপেক্ষা করে থাকে রঙ্গারুনে। দার্জিলিং শহর থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত হলেও এক দুর্গম উপত্যকায় লুকিয়ে থাকায় এটি চেনা পর্যটকদের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে। লেপচা শব্দ ‘রং-রুন’ থেকে এই নামের উৎপত্তি, যার অর্থ নদীর বাঁক। পাহাড়ি গভীর চা বাগানের খাঁজে অবস্থিত এই গ্রামের হোমস্টেগুলোর জানলা খুললেই কাঞ্চনজঙ্ঘার সুবিশাল বরফচূড়া এত সামনাসামনি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় যে বিস্ময়ে স্তব্ধ হতে হয়।
ভোরবেলা যখন সূর্যকিরণে কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় গোলাপি ও সোনালি আলোর বিস্ফোরণ ঘটে, তখন মনে হয় হিমালয় এক ব্যক্তিগত ক্যানভাস। ব্রিটিশ আমলের পরিত্যক্ত চাবাগানের বাংলো, ঘন জঙ্গলের ভেতর দিয়ে ট্রেকিং ট্রেইল আর স্থানীয় নেপালি গৃহস্থালির উষ্ণ আতিথেয়তা—রঙ্গারুন শহুরে পর্যটকদের কেবল অতিথি করে রাখে না, তাদের ফিরিয়ে দেয় প্রকৃতির সেই আদিম সান্নিধ্য যা ভিড়ভাট্টার দার্জিলিং বহু আগেই হারিয়ে ফেলেছে। চেনা গন্তব্যের বাইরে উত্তরবঙ্গের এই পাঁচ জনপদ তাই নিছক ভ্রমণ নয়, মনের ক্লান্তি ধুয়ে ফেলার এক নিখাদ থেরাপি।

ভিড় আর কোলাহল এড়িয়ে প্রকৃতির একেবারে আদিম কোলে নিজেকে সঁপে দেওয়ার জন্য এর চেয়ে নিখুঁত সফর আর কী হতে পারে!
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।
