২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

‘টাকা নয়, গ্রাম চাই’: আদিবাসীদের ‘চিতা আন্দোলন’

‘টাকা নয়, গ্রাম চাই’: আদিবাসীদের ‘চিতা আন্দোলন’

জীবন্ত চিতায় শুয়ে আদিবাসীদের জল-জঙ্গল বাঁচানোর লড়াই! ছবি - ANI

‘টাকা নয়, গ্রাম চাই’: আদিবাসীদের ‘চিতা আন্দোলন’

কোদাল-বেলচার শব্দ আর বুলডোজারের গর্জনের সমান্তরালে এখন সেখানে কান পাতলে শোনা যাচ্ছে কান্নার রোল আর প্রতিবাদের হুঙ্কার। কেন-বেতবা নদী সংযোগ প্রকল্পের মহাপরিকল্পনা যখন বাস্তবায়নের শেষ ধাপে, ঠিক তখনই এক চরম মানবিক সংকটের মুখোমুখি মধ্যপ্রদেশের চতরপুর জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের আদিবাসী মানুষ। ঢোন্ধন গ্রামের কাছে বাঁধ নির্মাণের কাজ যখন তুঙ্গে, তখন শতাব্দী প্রাচীন ২৪টি গ্রামের ভিটেমাটি থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের উচ্ছেদের এক চরম ও নির্মম তৎপরতা শুরু করেছে প্রশাসন। নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় গত দুই মাস ধরে ধর্না, পথ অবরোধ ও কালেক্টর অফিস ঘেরাওয়ের মাধ্যমে অহিংস ‘সত্যাগ্রহ’ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন এই ভূমিপুত্ররা। আম আদমি পার্টির প্রাক্তন নেতা ও সমাজকর্মী অমিত ভটনাগরের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা এই আন্দোলন এখন এক অভূতপূর্ব রূপ নিয়েছে।

জ্বলল চিতা, দিল্লিতেও পৌঁছাল প্রতিবাদের আঁচ

প্রশাসনের উদাসীনতায় পিঠ দেয়ালে ঠেকে যাওয়া আন্দোলনকারীদের একটি অংশ যখন গত ৫ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে অধিকারের দাবিতে দিল্লির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়, ঠিক তখনই গ্রামের মাটিতে বুক দিয়ে পড়েছিলেন মহিলারা। গত ৮ এপ্রিল, ২০২৬ তারিখে স্থানীয় আদিবাসী মহিলারা এক অভূতপূর্ব এবং প্রতীকী ‘চিতা আন্দোলন’-এর ডাক দেন। নিজেদের জীবন্ত চিতায় শুইয়ে তাঁরা প্রশাসনকে এই বার্তাই দিতে চেয়েছেন যে— জমি ও সংস্কৃতি হারালে তাঁদের জীবন এক জ্বলন্ত চিতার মতোই অর্থহীন। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে এই প্রতিবাদের ছবি ও খবর প্রকাশিত হতেই দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে।

বাঘের ডেরা বনাম মানুষের অস্তিত্বের লড়াই

প্রকল্পের মানচিত্র অনুযায়ী, শতবর্ষ পুরোনো ২৪টি গ্রাম এই বাঁধের গ্রাসে পড়তে চলেছে। এর মধ্যে ৮টি গ্রাম সম্পূর্ণ জলের তলায় তলিয়ে যাবে এবং বাকি ১৬টি গ্রামকে যুক্ত করা হবে ‘পান্না টাইগার রিজার্ভ’-এর কোর জোনের সঙ্গে। পরিবেশবিদ ও নীতি নির্ধারকদের একাংশের মতে, এই প্রকল্প ভারতের পরিবেশগত দূরদর্শিতার ওপর এক মস্ত বড় প্রশ্নচিহ্ন। সুপ্রিম কোর্ট দ্বারা গঠিত কেন্দ্রীয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত কমিটিও (CEC) এই প্রকল্পের নকশা নিয়ে তীব্র আপত্তি তুলেছিল। সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্ট সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছিল:

 "আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি হওয়া উচিত প্রকৃতি-কেন্দ্রিক (Eco-centric), মানব-কেন্দ্রিক (Anthropocentric) নয়। পৃথিবীতে প্রতিটি প্রজাতির সমঅধিকার রয়েছে এবং প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।"

এই সমস্ত আইনি ও পরিবেশগত বাধা উপেক্ষা করেই প্রকল্প এগিয়ে চলেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে চতরপুর জেলা প্রশাসন প্রকল্প এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা (প্রাক্তন ১৪৪ ধারা) জারি করেছে, যাতে বহিরাগতরা আন্দোলনে যোগ দিতে না পারেন। এমনকি আন্দোলনের মুখ অমিত ভটনাগরকে ‘উন্নয়ন-বিরোধী’ তকমা দিয়ে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ এনেছে প্রশাসন।

আদিবাসীদের দাবি: ‘জমির বদলে জমি, গ্রামের বদলে গ্রাম’

উচ্ছেদ হওয়া আদিবাসী সম্প্রদায়ের ক্ষোভ মূলত প্রশাসনের অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে। তাঁদের অভিযোগ, গ্রামসভার ভুয়ো সম্মতির মাধ্যমে তাঁদের অন্ধকারে রাখা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁদের প্রধান ৫টি দাবি হলো:

শতাব্দী প্রাচীন ইতিহাস রক্ষা: সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য জড়ানো এই গ্রামগুলি কোনোভাবেই ধ্বংস করা চলবে না।

আইনের সঠিক প্রয়োগ: জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে ২০১৩ সালের ‘ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন আইন’ (LARR Act) অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।

ঐতিহ্যের সুরক্ষা: আদিবাসী সংস্কৃতির কথা মাথায় রেখে এমনভাবে পুনর্বাসন দিতে হবে যাতে তাঁদের ঐতিহ্যবাহী জীবনযাত্রা ব্যাহত না হয়।

ন্যায্য পুনর্বাসন: নগদ টাকার লোভ দেখিয়ে নয়, ‘জমির বদলে জমি এবং গ্রামের বদলে গ্রাম’ দিতে হবে, যাতে তাঁদের জীবিকা সুরক্ষিত থাকে।

স্বচ্ছ গ্রামসভা: অতীতে হওয়া অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া বাতিল করে সম্পূর্ণ প্রকাশ্য ও সুষ্ঠুভাবে নতুন করে গ্রামসভার আয়োজন করতে হবে।

সাড়ে বারো লাখের প্যাকেজ বনাম নিখোঁজ অধিকার

নথি বলছে, ২০১৩ সালের জমি অধিগ্রহণ আইনের ১১ নম্বর ধারা মেনে বাঁধ অনুমোদনের প্রায় আট বছর আগে গ্রামসভার যে তথাকথিত ‘সম্মতি’ নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে গ্রামবাসীরা বিন্দুমাত্র জানতেন না। বর্তমানে তাঁদের পুনর্বাসনের পরিবর্তে মাথাপিছু মাত্র ১২.৫ লক্ষ টাকার একটি নগদ প্যাকেজ ধরিয়ে দিচ্ছে প্রশাসন, যা ইতিমধ্যেই ৪০ শতাংশ পরিবারের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা পড়েছে। নিয়মানুযায়ী ১৮ বছর বয়সী প্রত্যেক নাগরিককে একটি আলাদা পরিবার বা ইউনিট হিসেবে গণ্য করে পুনর্বাসন দেওয়ার কথা থাকলেও, প্রশাসন যোগ্যতার সময়সীমা ২০২২-২৩ সাল নির্ধারণ করায় বহু তরুণ-তরুণী তাঁদের আইনি অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।

মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ঐতিহাসিক রায় ও আগামী দিনের ইঙ্গিত

এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারি ওড়ছা বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য সংক্রান্ত একটি মামলায় (কমলেশ প্রজাপতি বনাম মধ্যপ্রদেশ রাজ্য) হাইকোর্টের রায় অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আদালত স্পষ্ট জানিয়েছিল যে, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের নামে আদিবাসীদের থেকে নেওয়া ‘স্বেচ্ছায় পুনর্বাসনের’ সম্মতি আসলে চাপের মুখে নেওয়া হয়েছিল। ২০০৬ সালের বন অধিকার আইন (Forest Rights Act) সম্পূর্ণ লঙ্ঘন করে কোনও  উচ্ছেদ করা যাবে না বলেও আদালত নির্দেশ দেয়।

প্রশাসনের অনমনীয় মনোভাব ও দমনপীড়নের নীতি এই গণআন্দোলনকে আরও তীব্র করে তুলবে বলেই মনে করা হচ্ছে। অথচ, একটি শান্তিপূর্ণ ও আইনি সমাধান খুব সহজেই সম্ভব ছিল। সংবিধান এবং দেশের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে যদি এই মেগা প্রজেক্টের কাজ জোর করে  চালানো হয়, তবে তার খেসারত কেবল এই অসহায় আদিবাসী মানুষগুলোকেই নয়, দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজ ও প্রকৃতিকেই দিতে হবে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য