অনীক দত্ত। ছবি -Google, গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
৩০শে মে, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
২০১২ সাল ছিল বাংলা ছবির ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য বছর। মধ্যগগনে থাকা পরিচালকদের সেরা ছবির বছর, পাশাপাশি নবীন পরিচালকরা ছক ভাঙলেন বাংলা ছবি ঘরানার। মুক্তি পেল ঋতুপর্ণ ঘোষের সবথেকে সাহসী ছবি 'চিত্রাঙ্গদা', এক ইচ্ছের গল্প। অভিনয় ও পরিচালনায় ঋতুপর্ণ নিজে। সঙ্গে এল অঞ্জন দত্তের 'দত্ত ভার্সেস দত্ত', বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'এলার চার অধ্যায়', মৈনাক ভৌমিকের 'বেডরুম', রাজ চক্রবর্তীর 'বোঝে না সে বোঝে না', কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের 'শব্দ', সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের 'হেমলক সোসাইটি'। তবে সবথেকে বেশি চলল শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়ের 'মুক্তধারা' এবং নবাগত পরিচালক অনীক দত্তর 'ভূতের ভবিষ্যৎ'। বলতে দ্বিধা নেই বাকি সব ছবিকে পার করে সে বছর আট থেকে আশিকে হাসিয়ে ছাড়ল 'ভূতের ভবিষ্যৎ'। সিরিয়াস মননশীল ছবি আর হার্ডকোর মেনস্ট্রিম ছবির ছক ভেঙে এক নতুন সাহসী পথের জন্ম দিলেন অনীক দত্ত। দর্শক যে ছবি দেখে নির্মল আনন্দ খুঁজে পেল। কিন্তু এই ছবি আমাদের শিক্ষিত করল, চোখে আঙুল দিয়ে দেখাল সমাজের বিপন্ন চেহারা, বাঙালির অস্তিত্ব আজ কতটা সংকটে, কলকাতা শহরের অস্তিত্ব আজ কতটা হারিয়ে যেতে চলেছে।
'ভূতের ভবিষ্যৎ' সব শ্রেণীর দর্শককে সিনেমাহলমুখী করতে পেরেছিল। নিখাদ হাস্যরসের মধ্যে দিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্য পেশ করতে অনীক দত্তের মতো কম পরিচালকই পেরেছেন এই সময়ে। অনীকের এই সংলাপ-বিপ্লব বারবার মনে করায় 'হীরক রাজার দেশে'র সত্যজিৎ রায়কে। সাদা চোখে ছোটদের ছবি মনে হলেও 'হীরক রাজার দেশে'র মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ছবি আর হয় না। অনীক সেই আলো স্পর্শ করতে পেরেছিলেন তাঁর প্রথম ছবিতেই। বিদেশের পুরস্কারের থেকেও অনীকের কাছে মূল্যবান ছিল দর্শকের ভালবাসা।
এক ক্যান্সার আক্রান্ত বৃদ্ধ হাসতে ভুলে গিয়েছিলেন মারণ রোগের দুশ্চিন্তায়। তাঁর স্ত্রী অনীক দত্তকে ফোন করে বলেছিলেন আপনার 'ভূতের ভবিষ্যৎ' দেখে আমার স্বামী আবার হাসি ফিরে পেয়েছে।' সেদিন আর অন্যও কিছু ভাবতে পারেননি অনীক।

'ভূতের ভবিষ্যৎ' ছবির প্রতিটি চরিত্র আজও দর্শক মনে গেঁথে রয়েছে। অনীক যেমন সুন্দর ক্যাচি সংলাপে ভরপুর গল্প বলায় বিশ্বাসী ছিলেন, তেমনই অভিনেতা নির্বাচনে স্টার ফ্যাক্টরে বিশ্বাসী ছিলেন না। একাধিক চরিত্রাভিনেতাদের নিয়েই 'ভূতের ভবিষ্যৎ'-এর মতো বক্সঅফিস হিট কালজয়ী ছবি বানান তিনি। পরবর্তীকালে 'আশ্চর্য প্রদীপ' ছবিতে শাশ্বত চট্টোপাধ্যায়, শ্রীলেখা মিত্র ও রজতাভ দত্ত, শেষ ছবি 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' আবীর চট্টোপাধ্যায় সে অর্থে মেগাস্টার নন। আবার 'অপরাজিত' ছবিতে জিতু কমলের মতো ছোট পর্দার অভিনেতাকে টক অফ দ্য টাউন বানিয়ে দেন অনীক।
কিন্তু প্রথম ছবির পর অনীক দত্তের সেই ম্যাজিক কি কমে যাচ্ছিল? 'ভূতের ভবিষ্যৎ' এর মতো ছবি বানিয়ে দর্শকের আশা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি নিজেই। কোথাও গিয়ে যেন নিজের প্রথম ছবিকে আর অতিক্রম করতে পারলেন না অনীক দত্ত। অতীতের পরিচালক পার্থপ্রতিম চৌধুরীর সঙ্গে মেলে অনীকের যাত্রাপথ। পার্থপ্রতিমের প্রথম ছবি ছিল 'ছায়াসূর্য'। যা দেখে তখনকার বাঙালি ভেবেছিল সত্যজিৎ-মৃণাল-ঋত্বিকের পর আরেক নবীন যুগের পরিচালক এলেন। কিন্তু পরবর্তীকালে ছবি বানালেও প্রথম ছবির উচ্চতাকে আর ছুঁতে পারেননি তিনি এবং অবসাদ আর স্বল্পায়ু ছিল তাঁরও।

অনীক দত্তের দ্বিতীয় ছবি 'আশ্চর্য প্রদীপ'। বিশাল এক্সপেকটেশন ছিল দর্শকের। কিন্তু এই ছবি সেই আশাপূরণে ব্যর্থ। সমাজের জ্বলন্ত বাস্তব তুলে ধরলেও ছবিটি বেশ মোটা দাগের, চড়া দাগের অভিনয় এবং বানিজ্যিক ভাবেও অসফল। বেশ মনে আছে যে অনীকের 'ভূতের ভবিষ্যৎ' হাউসফুল হল দেখেছিলাম সপ্তম সপ্তাহেও তাঁর দ্বিতীয় ছবির প্রথম সপ্তাহে হাতে গোনা দর্শক, হল ফাঁকা। এই ছবির শেষ দৃশ্য তবু চমকে দিয়েছিল দর্শককে।
অনীকের থ্রিলার রহস্য ছবি 'মেঘনাদ বধ রহস্য' উন্নতমানের ছবি ছিল না। দাগ কাটতে পারেনি ছবিটি। বহু দর্শক সে সময় আশাহত হয়ে বলেছিলেন 'অনীক দত্ত কি ক্রমহাসমান রেখার মতো ফুরিয়ে যাচ্ছেন?'
তবে ক্ষমতায় থাকা সরকারের বিরুদ্ধে সত্যি বলতে শিরদাড়া সোজা করে অনীকের মতো আর একজনও তো পারেননি। তাই তাঁর 'ভবিষ্যতের ভূত' ছবির ওপর পড়ল সরকারের কোপ। এই ছবি রাজনৈতিক স্যাটায়ার ছবি হলেও এই অত্যাধিক কমেডি মোড়কে সরকারকে সমালোচনা ছবির মান কমিয়ে দেয়। তাৎক্ষণিক সময়ে এই ছবি প্রাসঙ্গিক হলেও, যুগে যুগে অনীকের এই ছবি চিরন্তন নয়।

তবে তিনি আবার ফিরলেন। 'অপরাজিত' ছবি বক্সঅফিসে সুপার ডুপার হিট। আলোচনার শীর্ষে। বছরের শ্রেষ্ঠ ছবির সম্মান। কিন্তু এ ছবি কতখানি অনীকের নিজের? সত্যজিৎ রায়ের মতো জিতু কমলের প্রস্থেটিক মেকআপ যা রূপটান শিল্পী সোমনাথ কুণ্ডুর জাদুতে আর জিতুর কণ্ঠে চন্দ্রাশিস রায়ের কণ্ঠ দর্শকের জোয়ার নিয়ে এল হলে। কিন্তু ছবির নানা দিক দুর্বল। বিশেষত অপু-দুর্গার কাশবনের ভিতর দিয়ে দৌড় একেবারেই মন ছুঁলো না। তবু 'অপরাজিত' করেই অনীক অপরাজিত সে বছর। জিতুকে সবাই বলল সত্যজিতু।

বরং 'বরুণবাবুর বন্ধু' ছবিতে অনীক ফ্যামিলি ড্রামাতে সংসারের আসল রূপটি দেখিয়ে দেন। এই ছবি লকডাউন করোনা আবহে একদমই চলতে পারেনি। ছবিটি কিছু অংশ উচ্চমানের হতে পারত। এই ছবিতে 'শাখা প্রশাখা' ছবির ছায়া স্পষ্ট। সত্যজিতের ছায়ায় থেকেছেন অনীক। নতুন বাঁকবদল ঘটাতে পারেননি সে অর্থে।
অনীকের শেষ ছবি 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই' তাঁর সবথেকে দুর্বল ছবি। শরীর আর ধকল নিতে পারছিল না। যার ছাপ তাঁর নির্মাণে স্পষ্ট। তবু গত বছর পুজো রিলিজ ছবিগুলোর মধ্যে এই ছবি সবথেকে হিট। সেটা অনীক দত্তের নামেই।
অনীক দত্ত তাঁর প্রথম ছবিকে অতিক্রম করতে পারেননি। কোথাও গিয়ে তিনি ' 'ওয়ান বুক অথার'। অনেকেই বলবেন অনীক দত্ত সত্যজিৎ রায়ের উত্তরসূরি। তা আদতে নয়। সত্যজিৎ রায় মানে তো শুধু 'হীরক রাজার দেশে' নন, 'দেবী', 'নায়ক','শাখা প্রশাখা','সোনার কেল্লা' বা 'তিন কন্যা'।
অনীকের ছবিগুলির নানা দৃশ্যে সত্যজিৎ প্রভাব স্পষ্ট। কিন্তু তা অনেকের ছবিতেই পাওয়া গিয়েছিল। আজ ৩০মে যেমন যে পরিচালকের মৃত্যুদিন। তিনি ঋতুপর্ণ ঘোষ। যার প্রস্থানও আকস্মিক ছিল ২০১৩তে। ঋতুপর্ণ ঘোষের কথা ছিল তিনি পিএইচডি করবেন অর্থনীতি নিয়ে জেইউতে। কিন্তু সত্যজিৎ প্রভাবিত হয়েই তাঁর বিজ্ঞাপনে আসা, চলচ্চিত্রে আসা। ঋতুপর্ণর 'উৎসব' দেখে অপর্ণা সেন বলেছিলেন 'তুই তো মানিক কাকাকে পুরো টুকে দিয়েছিস!' ঋতুপর্ণ মজা করে অপর্ণাকে বা অন্যদের বলতেন 'হ্যাঁ ছেলেমেয়েদের বাবা-মায়ের মতোই দেখতে হয়, মিল থাকে!'
অনীক দত্তর কারও উত্তরসূরী হওয়ার প্রয়োজন নেই। তিনি একাই হাঁটতে জানতেন, একাই লড়তে জানতেন, একার সিদ্ধান্তে জীবনের হাত ছাড়তে পারলেন। নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়াতে তিনি কারও পরোয়া করেননি। এ সাহস ক'জন পায়! বাংলা ছবির ইতিহাসে তিনি ধুমকেতু হয়ে রয়ে যাবেন আজীবন নতুন যুগের কলাকুশলীদের আদর্শ হয়ে।
(শেষ)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কৈশোর থেকেই বাংলা ক্লাসিক ছবির প্রতি বিশেষ আগ্রহ। লেখার সূচনা প্রিন্ট থেকে ডিজিটালে। বায়োস্কোপের গবেষণাধর্মী লেখালেখি চলছে বহু বছর ধরেই। 'সুরের জাদুকর হেমন্ত', 'স্মৃতিটুকু থাক', 'গানে গল্পে বাঙালির লতা' এবং ঋতুপর্ণ ঘোষের প্রথম জীবনী 'ঋ-তে ঋতু', ছেলেবেলা থেকে মেয়েবেলার লেখক।