৩০শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

রাজপথে মোবারক বিরোধী আন্দোলন (পর্ব ৩)

রাজপথে মোবারক বিরোধী আন্দোলন (পর্ব ৩)

স্টেডিয়ামের এক্সিট গেটগুলো বাইর থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল। ছবি - Google.

রাজপথে মোবারক বিরোধী আন্দোলন (পর্ব ৩)

calender icon 2 ২৪শে জুলাই, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

পরদিন সকালে যে খবরগুলো আসতে শুরু করে, তা পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দেয়। স্টেডিয়ামে ঢোকার সময় নিরাপত্তার কোনো প্রাথমিক চেকিং বা মেটাল ডিটেক্টর ব্যবহার করা হয়নি। দাঙ্গা পুলিশ বা সিকিউরিটি ফোর্সের সদস্যরা সেখানে দাঁড়িয়ে স্রেফ তামাশা দেখছিল, তারা সহিংসতা থামানোর কোনো চেষ্টাই করেনি। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হল, পালানোর সময় দেখা যায় স্টেডিয়ামের এক্সিট গেটগুলো বাইর থেকে তালাবদ্ধ করে রাখা হয়েছিল, যার ফলে হুড়োহুড়ি করে বের হতে গিয়ে বহু সমর্থক দম আটকে মারা যান।

তৎকালীন সামরিক শাসক 'সুপ্রিম কাউন্সিল অফ দ্য আর্মড ফোর্সেস' (এসসিএএফ) দ্রুত এই ঘটনার জন্য ফুটবল হুলিগান এবং ‘বিদেশি চক্রান্ত’কে দায়ী করে তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করে। কিন্তু মিশরের সচেতন জনগণ এবং বিপ্লবীরা খুব ভালো করেই বুঝেছিলেন যে, এই ঘটনাটি মোবারক আমলের পুরনো গোয়েন্দা সংস্থা ও সিকিউরিটি ফোর্সের একটি পরিকল্পিত 'ম্যানেজড ভায়োলেন্স'। ২০১১ সালের বিপ্লবে আল-আহলি ক্লাবের উগ্র সমর্থক গোষ্ঠী—যাদের 'আল্ট্রাস' (Ultras) বলা হয়—তারা রাজপথে মোবারক বিরোধী আন্দোলনে সামনের সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই করেছিল। কায়রোর তহরীর স্কোয়ারে পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও লাঠিচার্জ মোকাবিলা করার যে সাহস এই তরুণরা দেখিয়েছিল, তারই বদলা নেওয়া হয়েছিল পোর্ট সাইদের মাঠে। শাসকগোষ্ঠী বিশ্বকে দেখাতে চেয়েছিল যে—সামরিক শাসন দুর্বল হলে দেশ কতটা অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার দিকে যেতে পারে।

ক্লাব সংস্কৃতির পেছনে ইতিহাস ও ‘আল্ট্রাস’দের জন্মক্লাব সংস্কৃতির পেছনে ইতিহাস ও ‘আল্ট্রাস’দের জন্ম

মিশরে ফুটবল ক্লাবগুলোর নাম ও ইতিহাস অনুধাবন না করলে এই সহিংসতা ও রাজনৈতিক জটিলতা বোঝা সম্ভব নয়। মিশরের বেশিরভাগ ঐতিহাসিক শহর বা জেলাগুলোর ফুটবল ক্লাব তাদের শহরের নামেই নামকরণ করা হয়, যেমন—জামালেক বা ইসমাইলিয়া। কিন্তু পোর্ট সাইদের ক্লাবটির নাম 'নাদি আল-মাসরি' (যার অর্থ ‘মিশরীয় স্পোর্টিং ক্লাব’)। কায়রোর ‘আল-আহলি’ (জাতীয় স্পোর্টিং ক্লাব)-র প্রতি প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সুয়েজ খালের সামরিক সংগ্রামের ইতিহাস থেকে তাদের এই নাম বেছে নেওয়া।

রাজতন্ত্রের পতনের পর জামাল আবদেল নাসেরের আমলে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর নিজস্ব ক্লাব লিগে যুক্ত হয় (যেমন সেনাবাহিনীর ক্লাব 'আল-গাইশ' বা পুলিশের ক্লাব 'আল-শুর্থা')। এর পর আনোয়ার সাদাতের আমলে মুক্তবাজার অর্থনীতির ছোঁয়ায় বড় বড় প্রাইভেট কর্পোরেট কোম্পানির দলও লিগে খেলতে আসে। কিন্তু এই প্রাতিষ্ঠানিক বা কর্পোরেট দলগুলোর নিজস্ব কোনো বিশাল ভক্তগোষ্ঠী ছিল না। ভক্তদের আবেগ ও রক্তের টান ছিল কেবল ঐতিহাসিক 'জামাহিরিয়া' বা সামাজিক ক্লাবগুলোর সাথেই।

২০০৭ সালের পর থেকে মিশরের ফুটবলে জন্ম নেয় এক নতুন সংস্কৃতি—'আল্ট্রাস' (Ultras)।

আল-আহলির সমর্থকদের উগ্র ও সংঘবদ্ধ গ্রুপটির নাম ছিল 'আল্ট্রাস আহলাভি'।
জামালেকের সমর্থকদের নাম 'হোয়াইট নাইট'।
ইসমাইলিয়ার ছিল 'ইয়েলো ড্রাগন'।

এই তরুণরা কেবল ড্রাগ বাজানো আর ফ্লেয়ার জ্বালানো সমর্থক ছিল না, তারা গড়ে তুলেছিল এক ধরনের অ্যান্টি-এস্টাবলিশমেন্ট বা শাসনতন্ত্র-বিরোধী নেটওয়ার্ক। মোবারকের স্বৈরাচারী পুলিশ রাষ্ট্র যখন দেশে কোনো সভা-সমাবেশ বা রাজনৈতিক প্রতিবাদ করতে দিত না, তখন এই ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোই হয়ে উঠত তরুণদের ক্ষোভ প্রকাশের একমাত্র উন্মুক্ত মঞ্চ। পুলিশের সাথে তাদের সংঘর্ষ নিয়মিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ফলে ২০১১ সালের বিপ্লব যখন শুরু হয়, তখন রাজপথে পুলিশের ব্যারিকেড কীভাবে ভাঙতে হয়, কীভাবে টিয়ারগ্যাসের মধ্যে টিকে থাকতে হয়—তা এই আল্ট্রাসদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানত না। আর সেই রাজনৈতিক সক্রিয়তার চূড়ান্ত মাশুল তাদের দিতে হয়েছিল ২০১২ সালের পোর্ট সাইদ ট্র্যাজেডিতে।

এই ঘটনার পর মিশরীয় সরকার টানা দুই বছরের জন্য দেশের সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ফুটবল লিগ বন্ধ করে দেয়। স্টেডিয়ামে দর্শক প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। এর এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়ে জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে।

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী

সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য