

কাবো ভার্দের জাতীয় ফুটবল দল। ছবি - Google.
১৩ই জুলাই, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
চলতি বছরের (২০২৬) ফুটবল বিশ্বকাপ যখন মাঝপর্বে, তখন গোটা আফ্রিকার চোখ আটকে ছিল একটা ছোট্ট দ্বীপপুঞ্জের দিকে। নাম তার কাবো ভার্দে (Cabo Verde)। মানচিত্রে আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডের পশ্চিম উপকূলে ছোট ছোট কিছু বিন্দুর মতো জেগে থাকা এই দেশ যে এবার বিশ্বকাপে খেলবে, সেটাই ছিল এক পরম বিস্ময়। কিন্তু তারা শুধু খেললই না, স্পেন, উরুগুয়ে আর সৌদি আরবের মতো বাঘা বাঘা টিমকে গ্রুপ পর্বে রুখে দিয়ে যখন নকআউট পর্বে পা রাখল, তখন ফুটবল দুনিয়া এক ঐতিহাসিক রূপকথা প্রত্যক্ষ করছিল। শেষ পর্যন্ত আর্জেন্টিনার কাছে ৩–২ ব্যবধানে হেরে যখন তাদের দৌড় থামল, তখন দলের ৫৬ বছর বয়সী কোচ বুবিস্তা সংবাদ সম্মেলনে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি। ধরা গলায় তিনি বলেছিলেন, "আমরা শুধু আমাদের দ্বীপের প্রতিনিধিত্ব করছি না, আমরা প্রতিনিধিত্ব করছি গোটা আফ্রিকার। এটা আমাদের পরম অহংকার।"
বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা আফ্রিকান প্রবাসীদের বুক এই কথায় গর্বে ভরে উঠেছিল ঠিকই, কিন্তু খোদ কাবো ভার্দের ঘরের ভেতর আফ্রিকান সংহতি আর আত্মপরিচয়ের রসায়নটা এত সহজ নয়। বাইরে থেকে যাকে এক নিটোল আফ্রিকান রূপকথা মনে হয়, তার গভীরে লুকিয়ে আছে পাঁচশো বছরের ঔপনিবেশিক ক্ষত, বর্ণবাদের জটিল স্তর, লাতিন আমেরিকা ও কিউবার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক বিপ্লবী অতীত এবং ইউরোপ বনাম আফ্রিকার টানাপোড়েনের এক অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব।
কাবো ভার্দে আসলে কে? সে কি শুধুই আফ্রিকার অংশ, নাকি আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা এক হারিয়ে যাওয়া লাতিন ল্যাবরেটরি?
ইতিহাসের ধুলো ঘাটলে দেখা যায়, পঞ্চদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যখন পর্তুগিজ নাবিক দিওগো গোমেস এবং দিওগো আফনসো এই দ্বীপপুঞ্জে পা রাখেন, তখন এখানে কোনো মানুষের বসতি ছিল না। ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের এই সমষ্টি আটলান্টিকের বুকে একাকী জেগে ছিল। ১৪৬২ সালে পর্তুগিজরা যখন সবচেয়ে বড় দ্বীপ সান্তিয়াগোতে প্রথম উপনিবেশ স্থাপন করে, তখন তারা সেখানে ক্রান্তীয় অঞ্চলের প্রাচীনতম ইউরোপীয় শহর 'রিবেইরা গ্রান্দে' (আজকের সিদাদে ভেলহা) গড়ে তোলে।
শুরুতে মাদেইরা দ্বীপের মতো এখানেও আখের চাষ করার চেষ্টা হয়েছিল, কিন্তু কাবো ভার্দের শুষ্ক জলবায়ু তাতে বাধা দেয়। তবে প্রকৃতির সেই খামখেয়ালিপনাকে পর্তুগিজরা পুষিয়ে নিল ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস এক ব্যবসা দিয়ে— ট্রান্স-আটলান্টিক দাস ব্যবসা। ইউরোপ, আফ্রিকা আর আমেরিকার মধ্যবর্তী ত্রিভুজাকার বাণিজ্য পথের ঠিক মাঝখানে কৌশলগত অবস্থানে ছিল এই দ্বীপপুঞ্জ। ফলে, আফ্রিকা মহাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বন্দি করে আনা হাজার হাজার কালো মানুষকে এই দ্বীপে নিয়ে আসা হতো।
সিদাদ ভেলহার ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটে আজ যে ক্যাথলিক চার্চটি দাঁড়িয়ে আছে, সেটি আসলে ছিল আফ্রিকানদের 'ডিহিউম্যানাইজেশন' বা অমানবিকীকরণের প্রথম ধাপ। মূল ভূখণ্ড থেকে ধরে আনা বন্দিদের এখানে এনে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হতো, যাতে আন্তর্জাতিক বাজারে তাদের চড়া দামে বিক্রি করা যায়। তাদের আফ্রিকান নাম— যেমন 'বাল্দে' বা 'সেক'— কেড়ে নিয়ে জোর করে পর্তুগিজ নাম দেওয়া হতো, যেমন ম্যানুয়েল বা হোসে। সমাজবিজ্ঞানীরা বলেন, কাবো ভার্দে ছিল আফ্রিকানদের ল্যাটিনাইজেশন বা নিজস্ব পরিচয় ভুলিয়ে দেওয়ার এক আদিম পর্তুগিজ ল্যাবরেটরি।
এখানেই পর্তুগিজরা দাসদের চামড়ার রং এবং কাজের ধরন অনুযায়ী একটা কঠোর সামাজিক স্তরবিন্যাস তৈরি করে। পাঁচ শতাব্দী ধরে চলা সেই ব্যবস্থার ফলেই আজকের কাবো ভার্দের সমাজে 'কালারিজম' বা গায়ের রঙের ভেদাভেদ এত গভীরে প্রোথিত। দেশটির বেশিরভাগ মানুষই মিশ্র বর্ণের (light-skinned), আর ঠিক এই কারণেই কাবো ভার্দের বহু মানুষ আজও নিজেদের আফ্রিকান ভাবার চেয়ে পর্তুগিজ ভাবতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাঁরা যুক্তি দেন, ইউরোপীয়রা আসার আগে তো এই দ্বীপ শূন্য ছিল, তবে আমরা আফ্রিকান হব কেন? শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পর্তুগিজরা তাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল 'লুসো-ট্রপিক্যালিজম'-এর তত্ত্ব— অর্থাৎ পর্তুগিজরা নাকি অন্যান্য ইউরোপীয়দের চেয়ে অনেক বেশি 'মানবিক' ঔপনিবেশিক ছিল, কারণ তারা কৃষ্ণাঙ্গদের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ক তৈরি করে এক মিশ্র সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছিল। কিন্তু এই মধুর তত্ত্বের আড়ালে চাপা পড়ে গিয়েছিল চাবুকের দাগ আর আত্মপরিচয় লোপাটের দীর্ঘ ইতিহাস।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।