১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
চার্জশিট, আদালতের কাঠগড়া এবং একটি নাম (পর্ব ৮)

এক মৃত্যু, বহু বিস্ফোরণ। গ্রাফিক্স- শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

চার্জশিট, আদালতের কাঠগড়া এবং একটি নাম (পর্ব ৮)

calender icon 2 ২রা জুলাই, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

তদন্তের কাজ শেষ পর্যন্ত আদালতের দরজায় এসে থামে। সেখানে আবেগ নয়, বিচার হয় প্রমাণের ভিত্তিতে। আরজি কর-কাণ্ডেও দীর্ঘ আন্দোলন, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং তদন্তের একাধিক নাটকীয় মোড়ের পর নজর গিয়ে ঠেকে আদালতের দিকে। সিবিআই চার্জশিট জমা দেয়। শুরু হয় বিচারপর্ব। কিন্তু আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়ানো এক ব্যক্তিকে ঘিরেই কি শেষ হয়ে গিয়েছিল এই মামলার সমস্ত প্রশ্ন? নাকি বিতর্ক তখনও বেঁচে ছিল?

চার্জশিটে একটিই নাম

মাসের পর মাস তদন্তের পর সিবিআই আদালতে তাদের চার্জশিট পেশ করে। তদন্তকারী সংস্থার বক্তব্য ছিল, ফরেন্সিক প্রমাণ, ডিজিটাল তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ, কল রেকর্ড এবং সাক্ষ্যপ্রমাণ একত্রে বিচার করলে একটি নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, চিকিৎসক ছাত্রীকে ধর্ষণ খুনের মামলায় মূল এবং একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে উঠে আসে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়ের নাম। চার্জশিটে দাবি করা হয়, ঘটনার রাতে তিনি আরজি কর হাসপাতালের সেমিনার রুমে প্রবেশ করেছিলেন এবং সেখানেই সংঘটিত হয়েছিল সেই নৃশংস অপরাধ।

প্রমাণের শৃঙ্খল

 ডিজিটাল তথ্য, মোবাইল ফোনের অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য, সিসিটিভি ফুটেজ এবং ফরেন্সিক রিপোর্ট— সবকিছু মিলিয়ে তদন্তকারীরা আদালতের সামনে একটি নির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পৃথকভাবে কোনও একটি প্রমাণ নয়, বরং সমস্ত তথ্য একত্রে বিচার করলে অভিযুক্তের বিরুদ্ধেই শক্তিশালী প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই যুক্তির উপরই দাঁড়িয়ে ছিল সিবিআইয়ের মামলা।

শুরু হল বিচারপর্ব

চার্জশিট জমা পড়ার পর মামলার বিচারপর্ব শুরু হয়। শিয়ালদহ আদালতে একের পর এক সাক্ষীর বয়ান রেকর্ড করা হতে থাকে। নিহত চিকিৎসকের পরিবার, সহকর্মী, তদন্তকারী অফিসার, ফরেন্সিক বিশেষজ্ঞ, হাসপাতালের কর্মী— বহু গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বক্তব্য শোনা হয়। প্রতিটি শুনানি ঘিরে ছিল প্রবল জনআগ্রহ। কারণ, আদালতের ভিতরে যা ঘটছিল, তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যাচ্ছিল সংবাদমাধ্যম এবং জনপরিসরে।

সঞ্জয় রায়ের অবস্থান

বিচার চলাকালীন সঞ্জয় রায় নিজেকে নির্দোষ বলে দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, তাঁকে ফাঁসানো হয়েছে এবং তিনি এই অপরাধের সঙ্গে জড়িত নন। অন্যদিকে তদন্তকারীরা আদালতে বারবার দাবি করেন, প্রমাণের শৃঙ্খল এতটাই শক্তিশালী যে তা অন্য কোনও ব্যাখ্যার সুযোগ রাখে না। এই দুই বিপরীত অবস্থানের মধ্যে দিয়েই বিচার এগোতে থাকে।

পরিবারের প্রশ্ন থামেনি

বিচারপর্ব এগোচ্ছিল তবে নিহত চিকিৎসকের পরিবারের অবস্থান ছিল আলাদা। তাঁরা বারবার জানাতে থাকেন, তাঁদের লড়াই শুধুমাত্র একজনের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য নয়। তাঁদের দাবি ছিল, গোটা ঘটনার পূর্ণ সত্য সামনে আসা প্রয়োজন। পরিবারের বক্তব্যে বারবার উঠে আসে একটি প্রশ্ন— একজনই কি  এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে ? নাকি আরও অনেকে ছিল? এই প্রশ্নই মামলাটিকে সাধারণ ফৌজদারি মামলা থেকে আলাদা করে দেয়।

জনমতের বিভাজন

রাস্তায় আন্দোলন আগের মতো তীব্র না থাকলেও জনমনে বিতর্ক তখনও জীবন্ত। একাংশ মনে করছিলেন, তদন্তকারী সংস্থা যথেষ্ট প্রমাণ সংগ্রহ করেছে এবং বিচার নিজের পথে এগোচ্ছে। অন্য অংশের বক্তব্য ছিল, এখনও কিছু প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। বিশেষ করে ঘটনার আগের ও পরের কয়েক ঘণ্টা এবং প্রশাসনিক ভূমিকা নিয়ে সংশয় রয়ে গিয়েছে। ফলে আদালতের বিচার এবং জনআলোচনা— দুই সমান্তরাল পরিসর তৈরি হয়।

রায়ের দিন

দীর্ঘ শুনানি এবং সাক্ষ্যগ্রহণের পর অবশেষে আসে রায়ের দিন। শিয়ালদহ আদালত সঞ্জয় রায়কে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত করে। পরে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আদালতের মতে, উপস্থাপিত প্রমাণ অভিযুক্তের অপরাধ প্রমাণ করার জন্য যথেষ্ট। রায় ঘোষণার মুহূর্তে আদালত চত্বরে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। কেউ মনে করেছিলেন বিচার হয়েছে, কেউ আবার বলেছিলেন লড়াই এখনও শেষ হয়নি।

রায়ের পরও শেষ নয় বিতর্ক

সাধারণত কোনও মামলায় রায় ঘোষণার পর বিতর্ক অনেকটাই স্তিমিত হয়ে যায়। কিন্তু আরজি কর-কাণ্ডে তার উল্টোটা ঘটেছিল। নিহত চিকিৎসকের পরিবার প্রকাশ্যে জানিয়ে দেয়, তাঁরা এখনও মনে করেন পুরো সত্য সামনে আসেনি। তাঁদের বক্তব্য ছিল, বিচারপ্রক্রিয়াকে সম্মান জানিয়েও তাঁরা আরও কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন। এই অবস্থানই মামলাটিকে নতুন অধ্যায়ের দিকে নিয়ে যায়।

হাইকোর্টের পথে নতুন লড়াই

রায়ের পর বিষয়টি আবার পৌঁছে যায় কলকাতা হাইকোর্টে। সেখানে নতুন করে উঠতে থাকে তদন্তের পরিধি, প্রমাণের বিশ্লেষণ এবং বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের সম্ভাবনা নিয়ে প্রশ্ন। আদালতও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ করতে শুরু করে। যা পরবর্তী সময়ে আবার নতুন বিতর্কের জন্ম দেয়।

অসমাপ্ত সত্যের অনুসন্ধান

আরজি কর-কাণ্ডের এই পর্যায়ে এসে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে যায়। আদালতের রায় একটি আইনি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটাতে পারে, কিন্তু সামাজিক ও মানসিক প্রশ্নের সব উত্তর সবসময় দিতে পারে না। এই মামলার ক্ষেত্রেও অনেক মানুষের মনে সেই অসমাপ্ত প্রশ্নগুলি রয়ে গিয়েছিল।

আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই শুরু হয় নতুন লড়াই।

(চলবে)

পর্ব ৯-এ থাকছে:

রায়ের পরও শেষ নয় লড়াই— হাইকোর্টের কড়া প্রশ্ন, পরিবারের আর্জি এবং অসম্পূর্ণ সত্যের অনুসন্ধান”

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

অন্যান্য