৮ই জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad
ভারত, গোমাংস ও আম্বেদকরের তত্ত্ব

প্রতীকী ছবি - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস

ভারত, গোমাংস ও আম্বেদকরের তত্ত্ব

calender icon 2 ৮ই জুন, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

মানুষের খাদ্যাভ্যাস কি কেবলই তার ব্যক্তিগত রুচি, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে রয়েছে এক গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক দমনের ইতিহাস? ১৯৪৮ সালে লেখা বাবা সাহেব ড. বি. আর. আম্বেদকরের একটি কালজয়ী গবেষণামূলক কাজ নতুন করে এই প্রশ্নটিই আবার আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে বর্তমান প্রেক্ষাপটে।

বৌদ্ধধর্ম এবং গোমাংস: অস্পৃশ্যতার আদি সূত্র

আম্বেদকরের তত্ত্ব অনুযায়ী, সমাজে তথাকথিত 'অস্পৃশ্যতা' বা দলিতদের দূরে ঠেলে দেওয়া কোনো আকস্মিক বা প্রাচীন ঐশ্বরিক নিয়ম ছিল না। এটি ছিল মূলত ক্ষমতার লড়াই ও সংস্কৃতির রাজনীতির এক সুপরিকল্পিত ফলাফল। Beef, Brahmins and Broken Men বইটিতে বাবা সাহেব একটি যুগান্তকারী মন্তব্য করেছেন: "কেবলমাত্র বৌদ্ধধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণেই নয়, বরং এর পাশাপাশি গোমাংস খাওয়ার অভ্যাসের জন্যই সমাজের এই 'ব্রোকেন মেন' বা ছিন্নমূল মানুষেরা একসময় অস্পৃশ্য হয়ে পড়েছিলেন।" তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে এই জোড়া পরিচিতির কারণে একটি বড় জনগোষ্ঠীকে মূল সমাজ থেকে পরিকল্পিতভাবে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল এক অন্ধকার কোণে।

ক্ষমতার লড়াই: ব্রাহ্মণবাদ বনাম বৌদ্ধধর্ম

বইটির পাতায় উঠে এসেছে প্রাচীন ভারতের এক তীব্র সামাজিক ও ধর্মীয় রূপান্তরের গল্প। ইতিহাসের এক বিশেষ সন্ধিক্ষণে বুদ্ধের অহিংসা নীতি এবং জাতপাতহীন দর্শনের ব্যাপক প্রসারের ফলে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা একচেটিয়া বেড়ে যায়। এর ফলে চিরাচরিত ব্রাহ্মণদের সামাজিক একাধিপত্য ও ধর্মীয় শ্রেষ্ঠত্ব মারাত্মক হুমকির মুখে পড়ে।

আম্বেদকর প্রমাণসহ দেখিয়েছেন যে, বৈদিক যুগে ব্রাহ্মণদের নিজস্ব ধর্মাচরণে পশুবলি এবং মাংস খাওয়ার স্পষ্ট প্রচলন ছিল। কিন্তু বৌদ্ধধর্মের তুমুল জনপ্রিয়তার সাথে পাল্লা দিতে এবং নিজেদের হারিয়ে যাওয়া সামাজিক আধিপত্য পুনরুদ্ধার করতে ব্রাহ্মণরা এক চরম কৌশল অবলম্বন করেন। তারা তাদের বৈদিক ধর্মের দীর্ঘদিনের নিয়ম ও অভ্যাসগুলোকে সম্পূর্ণ বিসর্জন দিয়ে রাতারাতি নিজেদের কঠোর নিরামিষাশী হিসেবে ঘোষণা করেন।

গরুর পবিত্রতা: আধিপত্য টিকিয়ে রাখার রাজনীতি

নিজেদের নিরামিষাশী প্রমাণের পাশাপাশি ব্রাহ্মণরা গরুকে পরম পবিত্র পশুর আসনে উন্নীত করেন এবং গো-পূজাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। আম্বেদকরের ভাষায়: "বৌদ্ধ ভিক্ষুদের আধিপত্যকে পরাস্ত করার জন্যই ব্রাহ্মণদের তাদের বৈদিক ধর্মের একটি বড় নিয়মকে স্থগিত বা বাতিল করতে হয়েছিল। এই বিশ্লেষণ যদি সঠিক হয়, তবে এটি স্পষ্ট যে গরুর পূজা হল মূলত বৌদ্ধধর্ম এবং ব্রাহ্মণবাদের মধ্যকার লড়াইয়ের অবসম্ভাবী ফল। হারিয়ে যাওয়া ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার জন্যই ব্রাহ্মণরা এই পথ বেছে নিয়েছিলেন।"

খাদ্য দিয়ে তৈরি পাঁচিল, যা আজও বহাল

আম্বেদকরের এই তত্ত্বটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নিরামিষ আহারকে যখন পবিত্রতা ও সামাজিক শ্রেষ্ঠত্বের নতুন মাপকাঠি বানানো হল, তখন যারা পুরোনো অভ্যাসবশত গোমাংস খাওয়া বজায় রাখলেন—বিশেষ করে প্রান্তিক ও দরিদ্র শ্রমজীবী মানুষেরা—তাদের আচরণকে 'অস্বাভাবিক' বা অপবিত্র বলে দাগিয়ে দেওয়া হল। এইভাবেই খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে সমাজে এক অলঙ্ঘনীয় পাঁচিল তুলে দেওয়া হয়।

কয়েক শতাব্দী আগে খাদ্যাভ্যাসকে হাতিয়ার করে শুরু হওয়া সেই প্রতীকী রাজনীতি আজও ফুরিয়ে যায়নি। বরং সেই পুরোনো ঐতিহাসিক আখ্যানগুলো আজও কোনো না কোনোভাবে সমসাময়িক ভারতের সামাজিক বাস্তবতাকে শাসন করছে এবং দলিত সমাজকে প্রান্তিক করে রাখার ক্ষেত্রে জ্বালানি জুগিয়ে চলেছে। ইতিহাসকে নতুন চশমায় দেখার জন্য এবং বর্তমানের জাতপাতভিত্তিক রাজনীতিকে বুঝতে আম্বেদকরের এই বই অত্যন্ত জরুরি একটি দলিল।

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী

সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

ad-fo-g-ad-space1

অন্যান্য