বাবাসাহেব আম্বেদকর। ছবি - Google
৮ই জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
আমরা যখন দুপুরের চড়া রোদে ক্লান্ত হয়ে তৃপ্তি করে এক থালা ভাত খেতে বসি, তখন কি একবারও ভাবি এই থালার ওপরেও রাজনীতির একটা অদৃশ্য হাত পাহারাদারি করছে? আমাদের খিদে, আমাদের ভালোলাগা, আর আমাদের হাজার বছরের খাদ্যাভ্যাসকেও যে কেউ সমাজ আর ক্ষমতার দাঁড়িপাল্লায় মেপে ‘পবিত্র’ বা ‘অপবিত্র’ দাগিয়ে দিতে পারে, তা হয়তো রোজকার ব্যস্ততায় খেয়াল পড়ে না। কিন্তু বহু বছর আগে এই অদ্ভুত অদৃশ্য পাঁচিলটাকে ধরে সজোরে ঝাঁকুনি দিয়েছিলেন ড. বি আর আম্বেদকর। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছিলেন, ভারতবর্ষের রান্নাঘরগুলো আসলে এক-একটা রাজনৈতিক যুদ্ধক্ষেত্র।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা একটু ভাবি, দেখব আমাদের চারপাশে এক অদ্ভুত প্রচার চালানো হয়। বিশ্বাস করানো হয় যে, নিরামিষ খাবারই নাকি খাঁটি ভারতীয় সংস্কৃতির একমাত্র দর্পণ। কিন্তু এই ‘আদর্শ’ ধারণার আড়ালে চাপা পড়ে যায় কোটি কোটি মানুষের কান্না, অধিকার আর তাঁদের অস্তিত্ব। এ দেশে বহু আদিবাসী এবং নিম্নবর্ণের শুদ্র সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে গরুর মাংস খাওয়াটা কোনো অপরাধ বা বিলাসিতা ছিল না, ছিল অতি সাধারণ এক জীবনযাত্রা। অথচ একটা সুপরিকল্পিত সামাজিক প্রচারের মাধ্যমে তাঁদের এই মুখের গ্রাসকে ‘নিচু’ নজরে দেখা শুরু হল। খাবারের পাতে তৈরি করা হলো এক অদৃশ্য দেওয়াল।
আম্বেদকর খুব স্পষ্ট করে দেখিয়েছিলেন, এই যে কোনো একটা খাবারকে কলঙ্কিত করা, কাউকে তাঁর খাদ্যাভ্যাসের জন্য অপরাধী বানিয়ে দেওয়া এটা আসলে কোনো ধর্ম বা সংস্কৃতির বিষয় নয়, এটা আদ্যোপান্ত ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার নোংরা রাজনীতি। ঠিক যেমনটা আমরা ২০১২ সালে ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বিফ ফেস্টিভ্যাল’-এ ছাত্রদের বুক চিতিয়ে লড়তে দেখেছিলাম। সেখানে খাবার কেবল পেট ভরানোর মাধ্যম ছিল না, তা ছিল উচ্চবর্ণের আধিপত্যের গালে একটা সজোরে চড়। আজ যখন রাষ্ট্র বা আদালত কোনো খাবারের ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপায়, তখন আম্বেদকরের অনুগামীরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ভাবেন এ তো সেই প্রাচীন ছোঁয়াছুঁয়ির রাজনীতিরই এক আধুনিক রূপ, এক নতুন ‘অস্পৃশ্যতা’।
আজকের গবেষক আর চিন্তাবিদরা যখন আম্বেদকরের সেই পুরনো, ধুলো জমা কঠিন যুক্তিগুলোকে নতুন করে আমাদের সামনে মেলে ধরেন, তখন মনে হয় যেন ইতিহাসের একটা অন্ধকার ঘরে কেউ আলো জ্বেলে দিল। সাধারণ মানুষের বোঝার সুবিধার্থে তাঁরা আম্বেদকরের দর্শনকে একদম সহজ করে তুলেছেন। প্রাচীনকালের সেই কৌশলী শব্দগুলো যেমন ‘অন্ত্যবাসিন’ বা ‘ম্লেচ্ছ’ কীভাবে একটা জ্যান্ত মানুষকে সমাজ থেকে একঘরে করে দেওয়ার জন্য অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো, তার নিখুঁত ব্যবচ্ছেদ করেছেন তাঁরা। যাঁরা ভারী ভারী ইতিহাস বা সংস্কৃত গ্রন্থ পড়েননি, তাঁদের বুকেও এই ব্যাখ্যাগুলো এক অদ্ভুত যন্ত্রণা আর সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। আম্বেদকর আমাদের শিখিয়েছিলেন, যতক্ষণ না সমাজে সত্যিকারের সাম্য আসছে, ততক্ষণ এই বৈষম্যগুলো নিয়ে বুক ফুলিয়ে, অনবরত প্রশ্ন তুলে যেতে হবে। কোনো আপস করা চলবে না।
তবে সত্যকে খুঁজতে গেলে সব দিকটাই দেখতে হয়। এই বই বা আলোচনাগুলোর কিছু খামতিও আমাদের মনকে খটকা দেয়। কখনো কখনো মনে হয়, আম্বেদকরের মূল লেখার চেয়ে সম্পাদকদের নিজেদের পাণ্ডিত্য প্রদর্শনের চেষ্টাই যেন বেশি বড় হয়ে উঠেছে। সাধারণ পাঠক যেখানে আম্বেদকরের ভেতরের সেই দ্রোহের আগুনটাকে ছুঁতে চান, সেখানে প্রাচীন স্মৃতির পাতা থেকে টেনে আনা অতিরিক্ত খুঁটিনাটি তথ্য অনেক সময় খেই হারিয়ে ফেলে।
সবচেয়ে বেশি আঘাত লাগে তখন, যখন কেউ ‘স্পেকুলেটিভ মেটেরিয়ালিজম’ বা কাল্পনিক বস্তুবাদের মতো জটিল তত্ত্ব এনে দাবি করতে চায় যে, জাতপাত নাকি কেবলই কিছু আকস্মিক বা ভাগ্যের পরিহাসে তৈরি হয়েছে! শুনতে খুব দার্শনিক মনে হলেও, বুক চিরে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসে। কারণ যে মানুষগুলো শত শত বছর ধরে এই জাতপাতের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে রক্ত-জল করা খাটুনি খাটলেন, তাঁদের সেই বাস্তব লড়াই, অর্থনৈতিক শোষণ আর ঐতিহাসিক যন্ত্রণাকে স্রেফ ‘ভাগ্যের পরিহাস’ বলে উড়িয়ে দেওয়াটা কি এক ধরণের নির্মম পরিহাস নয়? এই বিমূর্ত দর্শন আম্বেদকরের সেই মাটির কাছাকাছি থাকা বাস্তব লড়াইয়ের গুরুত্বকেই কোথাও যেন একটু হালকা করে দেয়।
আম্বেদকরের প্রাসঙ্গিকতা
তবুও সবশেষে একটা অমোঘ সত্যের সামনে আমাদের দাঁড়াতেই হয়। আমাদের তথাকথিত মূলধারার বুদ্ধিজীবীরা আজও আম্বেদকরের সেই বৈপ্লবিক প্রশ্নগুলোকে পুরোপুরি হজম করতে পারেন না। কারণ আম্বেদকর শুধু ওপর ওপর মলম লাগাতে চাননি, তিনি আঙুল তুলেছিলেন আমাদের সমাজের খোলসটার দিকেই। তাঁর লড়াই শুধু ছোঁয়াছুঁয়ি দূর করার জন্য ছিল না, তাঁর স্বপ্ন ছিল জাতপাতের এই বিষবৃক্ষটাকে একদম শিকড় থেকে উপড়ে ফেলা।
আজকের দিনেও যখন আমরা খবরের কাগজে কোনো দলিত যুবকের ওপর অত্যাচারের খবর পড়ি, বা কারো খাদ্যাভ্যাস নিয়ে সমাজকে খেঁকিয়ে উঠতে দেখি, তখন বুঝতে পারি—আম্বেদকর কতটা প্রাসঙ্গিক ছিলেন। সমাজের তথাকথিত সুধীসমাজ হয়তো আজও চোখ বুজে ঘুমের ভান করে আছেন, কিন্তু আম্বেদকরের সেই জ্বলন্ত প্রশ্নগুলো আজও আমাদের হেঁশেলের প্রতিটি কোণ থেকে, আমাদের ভাতের থালার ওপর থেকে সমাজের বিবেককে প্রতিনিয়ত তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।