আম্বেদকর। গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
৯ই জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কটি বইয়ের পাতা ওল্টানোর শব্দ আর রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা চেনা গন্ধের মধ্যে গভীর একটা সম্পর্ক আছে। আমাদের সমাজে আমরা প্লেটে কী তুলে নিচ্ছি, তা কেবল আমাদের খিদের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা ঠিক করে দেয় সমাজে আমাদের স্থান কোথায়। ২০১৯ সালে নতুন করে প্রকাশিত বি. আর. আম্বেদকরের ‘বিফ, ব্রাহ্মণস অ্যান্ড ব্রোকেন মেন’ বইটি পড়তে গিয়ে এই নির্মম সত্যটাই বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সম্পাদক এস. আনন্দ এবং অ্যালেক্স জর্জ যখন আম্বেদকরের মূল লেখার পাশে সুবিশাল টীকা বা ব্যাখ্যা সাজাচ্ছিলেন, তখন তাঁরা আসলে ইতিহাসের এক অন্ধকার গলির দিশারি হিসেবে কাজ করছিলেন।
ইতিহাসের চশমা ও আম্বেদকরের দর্শন
যাঁরা প্রাচীন সংস্কৃত টেক্সট বা ঔপনিবেশিক ইতিহাস খুঁটিয়ে পড়েননি, তাঁদের জন্য এই বইয়ের প্রতিটি টীকা যেন এক একটি চশমা, যা দিয়ে অতীতের অন্যায়গুলোকে স্পষ্ট দেখা যায়। সম্পাদকরা স্পষ্টতই আম্বেদকরপন্থী অবস্থান নিয়েছেন। তাঁরা দেখিয়াছেন কীভাবে উচ্চবর্ণের আদর্শ সমাজকে বোঝাতে চায় যে তাদের চিন্তাভাবনা ও সংস্কৃতিই ‘নিখুঁত এবং সম্পূর্ণ’। অথচ আম্বেদকর এই তথাকথিত নিখুঁত ধারণাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে আমাদের অনবরত প্রশ্ন তুলতে শিখিয়েছিলেন যতক্ষণ না সমাজে সত্যিকারের সাম্য আসছে।
আধুনিকতার আড়ালে ‘খাঁটি নিরামিষ’-এর দেওয়াল
বইটি বন্ধ করে যখন আমরা আজকের চেনা বাস্তবতার দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি সেই ‘জ্ঞানীরা’ হয়তো আজও ঘুমাচ্ছেন, কিন্তু বৈষম্যের আগুনটা জ্বলছে চড়া আঁচে। আজকের দিনে এই বই পড়া কোনো কঠিন কাজ নয়, কারণ আমাদের চারপাশের সমাজটাই তো এই বৈষম্যের জীবন্ত দলিল। আজকের আধুনিক ভারতেও জাতপাতের পরিচয় লুকিয়ে আছে আমাদের খাবার টেবিলের সংস্কৃতিতে।
আজকের যুগে ‘খাঁটি নিরামিষ’ বা ‘পিওর ভেজ’ শব্দটা কেবল একটা খাবারের পছন্দ নয়, তা যেন এক অদৃশ্য প্রাচীর। বড় বড় ফুড ডেলিভারি অ্যাপ যখন ঘটা করে ‘পিওর ভেজ’ ডেলিভারি ফ্লিট চালু করে, তখন প্রযুক্তির আলোতেও জাতপাতের সেই পুরনো ছোঁয়াছুঁয়ির অন্ধকারটাই নতুন রূপ নিয়ে ফিরে আসে। অন্যদিকে, দলিত, মুসলিম বা উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের মাংস খাওয়ার অভ্যাসকে আজও হীন চোখে দেখা হয়, গায়ে লেপ্টে দেওয়া হয় সামাজিক কলঙ্ক।
চোখের জল ও সামাজিক বর্জন
এখানেই মিশে আছে সাধারণ মানুষের রোজকার অপমান আর চোখের জল। কোনো এক মহানগরের আধুনিক অ্যাপার্টমেন্টে যখন উত্তর-পূর্ব ভারতের কোনো তরুণ বা দলিত পরিবার মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজতে যায়, তখন আবাসন কমিটির ‘শুধুমাত্র নিরামিষাশী’ নীতি তাঁদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল থেকে শুরু করে অফিসের ক্যাফেটেরিয়া, সবখানেই নিরামিষ ছাড়া অন্য যেকোনো খাবারকে বাঁকা চোখে দেখা হয়।
ডেনিস কিকন এবং অনন্যা পাটগিরির মতো গবেষকরা ঠিক এই জায়গাটাতেই আঙুল তুলেছেন। খাবারকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা এই ‘ভদ্র’ বর্ণবাদ মানুষের আত্মমর্যাদাকে প্রতিদিন ক্ষতবিক্ষত করে। মায়ের হাতের চেনা রান্নাটা যখন বাইরের চার দেওয়ালে এসে ‘অপবিত্র’ বা ‘অস্পৃশ্য’ হয়ে যায়, তখন সেই অপমানটা কেবল খাবারের থাকে না, তা হয়ে ওঠে অস্তিত্বের সংকট।
ইতিহাসের পাতা পেরিয়ে
তাই ‘বিফ, ব্রাহ্মণস অ্যান্ড ব্রোকেন মেন’ কেবল লাইব্রেরির দিকে সাজিয়ে রাখার মতো কোনো একাডেমিক বই নয়। কাঞ্চা ইলাইয়া শেফার্ডের তীক্ষ্ণ ভূমিকা এবং আনন্দ ও জর্জের অক্লান্ত পরিশ্রম এই বইটিকে বর্তমানের প্রতিটি অধিকার লড়াইয়ের ইশতেহার বানিয়ে তুলেছে। এই বই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাবা সাহেব আম্বেদকর ইতিহাসের পাতায় বন্দি কোনো মৃত চরিত্র নন বরং তিনি আজও আমাদের রান্নাঘরে, আমাদের মিছিলে এবং আমাদের আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে বেঁচে থাকা এক চিরন্তন পথপ্রদর্শক।
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।