কেন শুরুতেই দেওয়া হল আত্মহত্যার তত্ত্ব? প্রশ্ন উঠেছিল। গ্রাফিক আর্ট - শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১৯শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
একটি মৃত্যুর তদন্তে প্রথম কয়েক ঘণ্টায় তৈরি হয় তদন্তের ভিত্তি, নির্ধারিত হয় ঘটনার প্রাথমিক বয়ান। আরজি কর-কাণ্ডেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু ৯ অগস্টের সেই সকালে ঘটনাস্থলের চেয়েও বেশি বিতর্ক তৈরি হয়েছিল একটি প্রশ্নকে ঘিরে— প্রথমে কেন হাসপাতালের তরফে নিহত চিকিৎসকের পরিবারকে আত্মহত্যার কথা বলা হয়েছিল? আর সেই প্রশ্নই কীভাবে জনমনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিল?
৯ অগস্টের সকাল যত গড়াতে থাকে, আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের অন্দরে ততই বাড়তে থাকে অস্বস্তি। তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর খবর হাসপাতালের করিডর ছেড়ে পৌঁছে যায় চিকিৎসক মহল, সংবাদমাধ্যম এবং প্রশাসনের কাছে। কিন্তু মৃত্যুর খবরের সঙ্গে সমানতালে ছড়াতে থাকে বিভ্রান্তিও।
ঘটনার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে ভিন্ন ভিন্ন তথ্য ঘুরতে শুরু করে। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, প্রথমে তাঁদের কাছে স্পষ্টভাবে পরিস্থিতির কথা জানানো হয়নি। কেউ অসুস্থতার কথা বলেছিলেন, কেউ আবার আত্মহত্যার সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে পরে দাবি করেন তাঁরা। এই অস্পষ্টতাই পরবর্তী সময়ে অন্যতম বড় বিতর্কে পরিণত হয়। প্রশ্ন ওঠে, তদন্তের আগেই কেন হাসপাতালের তরফে আত্মহত্যার চেষ্টার কথা বলা হল?
নিহত চিকিৎসকের বাবা-মা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর দ্রুত বদলে গেল পরিস্থিতি । মেয়ের দেহে এত আঘাতের চিহ্ন কেন? সেই দৃশ্য দেখার পর থেকেই তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করে— যদি আত্মহত্যা হয়ে থাকে, তাহলে এই আঘাতগুলির ব্যাখ্যা কী? সহকর্মীর মৃত্যুর শোকের পাশাপাশি এ প্রশ্ন উঠল জুনিয়র ডাক্তারদের মধ্যেও। ফলে প্রথম দিকে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছিল, তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। হাসপাতালের করিডর, ডাক্তারদের বিশ্রামকক্ষ, ছাত্রাবাস— সর্বত্র শুরু হয় আলোচনা। প্রশ্ন উঠতে থাকে, তদন্তের আগেই 'আত্মহত্যা'-র লেবেল দিয়ে দেওয়া হল কেন?
প্রাথমিক তদন্ত এগোতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে সামনে এল ময়নাতদন্তের তথ্য। সেই তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তকারীরা ঘটনাটিকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে দেখতে শুরু করেন। জনমনে ক্ষোভ দ্রুত বাড়তে থাকল। শুরু হল সমস্ত সোশ্যাল মিডিয়া জুড়ে প্রতিবাদ। চিকিৎসক মহলের বাইরেও সাধারণ মানুষের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠল আরজি কর। হাসপাতালের ভেতর থেকে প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খেতে খেতে ছড়িয়ে পড়ল গ্রামে, শহরান্তরে, এমনকি দেশান্তরেও— আসলে কী ঘটেছিল সেই রাতে?
ঘটনার পর পরিবার আরও একটি গুরুতর অভিযোগ তোলে। তাঁদের দাবি ছিল, মেয়ের শেষকৃত্য দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য চাপ দেওয়া হয়েছিল। যদিও প্রশাসনের তরফে এই অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। যেখানে সরকারি হাসপাতালের মধ্যে একজন কর্তব্যরত চিকিৎসক ছাত্রীকে খুন হতে হল, সেখানে বিচারের পরিবর্তে প্রশাসনের বিরুদ্ধে 'চাপ তৈরি'র এই অভিযোগ জনমনে প্রবল আলোড়ন সৃষ্টি করে। কারণ, তখন ইতিমধ্যেই ঘটনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ফলে নতুন অভিযোগগুলি সাধারণ মানুষের সন্দেহকে আরও উসকে দেয়।
এদিকে পুলিশি তদন্তও দ্রুত এগোচ্ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ, হাসপাতালের বিভিন্ন অংশে যাতায়াতের তথ্য, কর্মীদের বয়ান— সব কিছু খতিয়ে দেখা শুরু হয়। তদন্তকারীরা হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকেও নজর দেন। কে কোথায় ছিলেন, কে কখন কোন অংশে গিয়েছিলেন, কোন দরজা খোলা ছিল— এমন অসংখ্য প্রশ্নের উত্তর খোঁজা শুরু হয়। তদন্তে নেমে কলকাতা পুলিশ গ্রেফতার করে সিভিক ভলান্টিয়ার সঞ্জয় রায়কে ৷ কিন্তু সঞ্জয় একাই কি এই নারকীয় কাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল ? নাকি বাকিদের আড়াল করতে তাঁকে একা কে বলির পাঁঠা করা হল ! অর্থাৎ তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুতে স়ঞ্জয় রায়কে গ্রেফতারি বিতর্ক থামানোর বদলে নতুন একাধিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল ।
আরজি কর-কাণ্ডের ইতিহাসে দ্বিতীয় দিনটি গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণে। সেদিন থেকেই মানুষের একাংশ মনে করতে শুরু করেন, এই ঘটনার সমস্ত উত্তর এখনও সামনে আসেনি। একদিকে পরিবারের অভিযোগ, অন্যদিকে চিকিৎসকদের ক্ষোভ, তার সঙ্গে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক— সব মিলিয়ে তৈরি হতে থাকে অবিশ্বাসের এক আবহ। আর সেই অবিশ্বাসই পরবর্তী সময়ে গণ আন্দোলনে পরিণত হয়।
(চলবে)
ঘটনার তদন্ত যত এগোয়, ততই সামনে আসতে শুরু করে আরজি কর হাসপাতালের অন্দরমহল নিয়ে বিস্ফোরক অভিযোগ। চিকিৎসকদের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে একটি শব্দ— ‘থ্রেট কালচার’। কী সেই থ্রেট কালচার? কেন আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ?
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।