২০শে জুন, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad
ইতিহাসে শালীনতার চাদর? ‘ড্যান্সিং গার্ল’ বিতর্ক ও NCERT (পর্ব ১)

মহেঞ্জোদারো-র বিখ্যাত নৃত্যরত নারীমূর্তি। মূল ছবি -Google, গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

ইতিহাসে শালীনতার চাদর? ‘ড্যান্সিং গার্ল’ বিতর্ক ও NCERT (পর্ব ১)

calender icon 2 ২০শে জুন, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে ইতিহাস মাটির নিচে নিশ্চুপে ঘুমিয়ে ছিল, তাকে যখন হঠাৎ একবিংশ শতকের অদৃশ্য কোনও হাত দিয়ে ‘পরিমার্জিত’ করার চেষ্টা করা হয়, তখন তা কেবল একটি বইয়ের পাতার সংশোধন থাকে না; তা হয়ে ওঠে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক লড়াইয়ের দলিল। সম্প্রতি ভারতের শিক্ষা মহলে ঠিক এমনই এক অদ্ভুত আলোড়ন উঠেছে। ৪,৫০০ বছরের পুরোনো এক ব্রোঞ্জের কিশোরী, যাকে আমরা ‘ড্যান্সিং গার্ল’ বা মোহেঞ্জোদারোর নৃত্যরতা তরুণী বলে জানি, সে হঠাৎ করেই যেন আধুনিক শিক্ষার দরবারে এক চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এনসিইআরটি (NCERT)-র নবম শ্রেণীর এক নতুন চারুকলার পাঠ্যবইতে এই প্রাচীন ভাস্কর্যটির ছবিটিকে নাকি একটু বদলে দেওয়া হয়েছে—ভিজ্যুয়ালি তার অনাবৃত শরীরকে ঢেকে দেওয়া হয়েছে এক কাল্পনিক আবরণে। যুক্তি? এটি নাকি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের জন্য ‘বয়স-উপযোগী’ বা এজ-অ্যাপ্রোপ্রিয়েট নয়।

এই একটি ঘটনাই আজ আমাদের বাধ্য করছে ইতিহাসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কিছু মৌলিক প্রশ্ন করতে। ইতিহাস কি কোনও ঘরের সাজানো ড্রয়িংরুমের আসবাব, যা পছন্দ না হলে আমরা চাদর দিয়ে ঢেকে দেব? নাকি ইতিহাস হল এক নির্মম, নগ্ন এবং অপরিবর্তনীয় সত্যি, যাকে তার নিজের রূপেই গ্রহণ করতে হয়?

মাটির নিচের নীরবতা ও আধুনিক কোলাহল

সিন্ধু সভ্যতার সেই প্রাচীন দিনগুলোর কথা ভাবা যাক, যখন সিন্ধু নদের অববাহিকায় গড়ে উঠছিল এক আশ্চর্য নগরসভ্যতা। আজ থেকে প্রায় সাড়ে চার হাজার বছর আগে, কোনও এক নামহীন শিল্পী পরম মমতায় ব্রোঞ্জ গলিয়ে তৈরি করেছিলেন চার ইঞ্চির এক ছোট্ট নারীমূর্তি। এক হাত কোমরে, অন্য হাতটি উরুর ওপর আলতো করে রাখা, বাহুভর্তি চুড়ি, গলায় ঝুলছে পুঁতির মালা। সে কোনও রাজকীয় মহিমা নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই, তার অবয়বে আছে এক অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস আর আদিম সাবলীলতা। কোনও বস্ত্রের আবরণ তার দেহে ছিল না, কারণ তৎকালীন সমাজে হয়তো তা স্বাভাবিক ছিল, অথবা শিল্পীর চোখে মানবদেহের এই রূপই ছিল চিরন্তন।

হাজার হাজার বছর ধরে সে মাটির অন্ধকারে চাপা পড়ে ছিল। ১৯২৬ সালে প্রত্নতাত্ত্বিক জন মার্শাল যখন তাকে খুঁজে বের করলেন, তখন গোটা বিশ্ব বিস্মিত হয়ে দেখেছিল প্রাচীন ভারতীয় উপমহাদেশের ধাতব শিল্পের সেই চরম উৎকর্ষকে। কিন্তু আজ, এত শতাব্দী পর, আধুনিক যুগের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে যখন কিছু মানুষ সিদ্ধান্ত নেন যে এই সাড়ে চার হাজার বছরের প্রাচীন সত্য কিশোর-কিশোরীদের মনে ‘খারাপ প্রভাব’ ফেলতে পারে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটি ইতিহাসের নয়, সমস্যাটি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির।

 ‘বয়স-উপযোগী’ বনাম সত্যের অপলাপ

শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় দায়িত্ব হল শিক্ষার্থীদের মনকে মুক্ত করা, তাকে সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে শেখানো। কিন্তু যখন ‘বয়স-উপযোগী’ করার নামে কোনও ঐতিহাসিক নিদর্শনকে বিকৃত করা হয়, তখন শিক্ষার সেই মূল উদ্দেশ্যটাই ধাক্কা খায়। এনসিইআরটি-র এই সিদ্ধান্তটির বিরুদ্ধে খোদ তাদেরই নিজস্ব কমিটির সদস্যরা, যেমন ইতিহাসবিদ মিশেল দানিনো, সরব হয়েছেন। তিনি খুব কড়া ভাষায় একে ‘ভিক্টোরিয়ান মানসিকতা’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

ভিক্টোরিয়ান যুগ ছিল এমন এক সময়, যখন মানবদেহ, নগ্নতা বা যেকোনও প্রাকৃতিক বিষয়কে এক ধরণের কৃত্রিম লজ্জা বা ট্যাবু দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হতো। মজার বিষয় হল, যে ভারতের মাটিতে খজুরাহো বা কোনারকের মতো স্থাপত্য রয়েছে, যেখানে শরীরকে কখনো পাপ বা লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়নি, সেখানে আজ একটি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনকে দেখে আধুনিক সমাজ লজ্জিত হচ্ছে। স্কুল শিক্ষকেরা বছরের পর বছর ধরে এই মূর্তিটি পড়িয়ে আসছেন, কোনওদিন কোনও ক্লাসরুমে এটিকে নিয়ে কোনও অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি। তাহলে হঠাৎ এই কৃত্রিম শালীনতার চাদর জড়ানোর তাড়না কেন?

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী

সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য