আরজি কর 'অভয়া'র ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল গোটা দুনিয়াকে। গ্রাফিক আর্ট - শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১৯শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কিছু কিছু সকাল শুধু একটি দিন নয়, বদলে দেয় একটি সময়কে। ২০২৪ সালের ৯ অগস্ট ছিল তেমনই একটি সকাল। কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের সেমিনার রুম থেকে উদ্ধার হওয়া এক তরুণী চিকিৎসকের দেহ পরবর্তী কয়েক মাসে এমন এক গণ আন্দোলনের জন্ম দেয়, যা বাংলার সামাজিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসে আলাদা অধ্যায় হয়ে থাকবে।
কলকাতার আকাশে তখনও বর্ষার মেঘ। শহরের রাজনৈতিক ও সংবাদমাধ্যমের বড় অংশের নজর ছিল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের শেষযাত্রাকে ঘিরে। রাজ্যের রাজনৈতিক মহল ব্যস্ত, সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরা ব্যস্ত, সাধারণ মানুষের আলোচনার কেন্দ্রও ছিল অন্যত্র। কিন্তু উত্তর কলকাতার আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের একটি ভবনের চতুর্থ তলায় তখন এমন একটি ঘটনা ঘটেছে, যা কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সমস্ত খবরকে ছাপিয়ে যায়।
সকালের দিকে হাসপাতালের সেমিনার রুম থেকে উদ্ধার করা হয় এক তরুণী চিকিৎসকের নিথর দেহ। তিনি ছিলেন পোস্ট-গ্র্যাজুয়েট প্রশিক্ষণরত চিকিৎসক। আগের রাতেও তিনি ডিউটিতে ছিলেন। সহকর্মীদের সঙ্গে রাতের খাবারও খেয়েছিলেন। তারপর বিশ্রামের জন্য গিয়েছিলেন । তারপরই ভয়াবহ ঘটনা ৷
ভোরের আলো ফোটার কয়েক ঘণ্টা পরেই হাসপাতালের অন্দরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুনের খবর। প্রথম দিকে কী ঘটেছিল, সেই নিয়ে নানা ধরনের গুঞ্জন তৈরি হতে থাকে। হাসপাতালের করিডর জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে উৎকণ্ঠা, বিভ্রান্তি এবং আতঙ্ক।
ঘটনার পরপরই চিকিৎসক মহল এবং পরিবারের সদস্যদের মধ্যে নানা প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল? একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ভিতরে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা কর্মী, চিকিৎসক ও নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি থাকার কথা, সেখানে একজন ডিউটিরত মহিলা চিকিৎসক কীভাবে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়লেন?
ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি, দেহে আঘাতের চিহ্ন এবং পরবর্তী তদন্তের প্রাথমিক তথ্য সামনে আসতেই স্পষ্ট হয়ে যায়, এটি শুধুমাত্র একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা নয়। সেই মুহূর্ত থেকেই বিষয়টি আর একটি হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ ঘটনা হয়ে থাকেনি। এটি জনস্বার্থের প্রশ্নে পরিণত হতে শুরু করে।
নিহত চিকিৎসকের পরিবারের সদস্যরা হাসপাতালে পৌঁছনোর পর নানা প্রশ্ন সামনে আসে। তাঁদের বক্তব্য, প্রথম দিকে তাঁরা পর্যাপ্ত তথ্য পাননি। ঘটনার প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণাও দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগ পরবর্তী সময়ে জনমনে গভীর প্রভাব ফেলে। কারণ, একটি পরিবারের শোকের পাশাপাশি সামনে চলে আসে সরকারি হাসপাতালের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন। ক্রমশ ক্ষোভ জমতে শুরু করে সহকর্মী চিকিৎসকদের মধ্যেও। অনেকেই মনে করতে থাকেন, শুধু অপরাধীকে চিহ্নিত করলেই হবে না, ঘটনার প্রতিটি স্তর খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঘটনার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তদন্ত শুরু হয়। হাসপাতালের সিসিটিভি ফুটেজ, কর্মীদের বয়ান, যাতায়াতের তথ্য— সব কিছু খতিয়ে দেখা শুরু করে কলকাতা পুলিশ। কিন্তু একই সঙ্গে সামনে আসে আরও বড় প্রশ্ন। হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? ডিউটিতে থাকা চিকিৎসকদের জন্য পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছিল কি? রাতের হাসপাতাল কতটা নিরাপদ? কর্মক্ষেত্রে মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে কোথায় কোথায় ঘাটতি ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর তখনও অজানা ছিল। কিন্তু সেদিনই বপন হয়েছিল এক বৃহত্তর আন্দোলনের বীজ।
প্রথম দিনের শেষে আরজি কর-কাণ্ড শুধুমাত্র একটি অপরাধ তদন্ত ছিল না। এটি হয়ে উঠেছিল বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহির প্রশ্ন। তখনও কেউ জানতেন না, কয়েক দিনের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নামবেন। জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে রাজ্যজুড়ে। রাজ্য, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্দোলনের ঢেউ পৌঁছে যাবে সারা বিশ্বে ৷ আদালত, প্রশাসন, রাজনীতি— সব কিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে আসবে এই একটি ঘটনা।
(চলবে)
মৃত্যুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কেন আত্মহত্যার জল্পনা ছড়িয়ে পড়েছিল? পরিবারের সদস্যরা ঠিক কী অভিযোগ করেছিলেন? হাসপাতালের ভিতরে কীভাবে জন্ম নিয়েছিল প্রথম সন্দেহ? আর কেন সেই সন্দেহই পরবর্তী সময়ে জনরোষের আগুনে ঘি ঢেলেছিল?
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।