অভিযোগে উঠে এল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের নাম। ছবি -Google. গ্রাফিক্স - শুভ্র শর্ভিন, দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।
১৯শে জুন, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
একজন তরুণী চিকিৎসকের মৃত্যুর তদন্ত শুরু হয়েছিল একটি অপরাধের সূত্র ধরে। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু বদলে যায়। প্রশ্ন আর শুধু সেই রাতকে ঘিরে থেমে থাকেনি। প্রশ্ন উঠতে শুরু করে হাসপাতালের ভিতরের সংস্কৃতি, প্রশাসনিক কাঠামো এবং ক্ষমতার অদৃশ্য বলয়কে ঘিরে। আর সেখান থেকেই জনপরিসরে প্রবেশ করে একটি শব্দ, ‘থ্রেট কালচার’!
আরজি কর-কাণ্ডের পর প্রথম দিকে আলোচনা আবর্তিত হচ্ছিল মৃত্যুর ঘটনা এবং তদন্তকে কেন্দ্র করে। কিন্তু আন্দোলন যত জোরালো হতে থাকে, ততই নিহত চিকিৎসকের সহকর্মীদের মুখে বারবার শোনা যেতে থাকে একটি অভিযোগ, হাসপাতালের ভিতরে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল ‘থ্রেট কালচার’।
আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের একাংশের বক্তব্য ছিল, সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলির মতো আরজি করেও এমন এক পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে প্রশাসন বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সরব হওয়া সহজ ছিল না। কেউ সরাসরি অভিযোগ করতেন, কেউ ইঙ্গিত দিতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে বোঝা যেতে থাকে, ক্ষোভের স্রোত অনেক দিনের।
ঘটনার পর বহু বর্তমান ও প্রাক্তন চিকিৎসক সামাজিক মাধ্যমে নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে শুরু করেন। কারও অভিযোগ ছিল, ডিউটি বণ্টনে পক্ষপাতিত্ব হত। কেউ বলতেন, মতের অমিল হলেই অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখে পড়তে হত। আবার কারও দাবি ছিল, প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুললে ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় দেখানো হত। এই অভিযোগগুলির অনেকগুলিই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সামনে এসেছিল এবং সবগুলির স্বাধীন প্রমাণ তৎক্ষণাৎ প্রকাশ্যে আসেনি। তবু জনমনে তার প্রভাব ছিল গভীর। কারণ, প্রথমবার সাধারণ মানুষ হাসপাতালের ভিতরের এমন একটি দিক সম্পর্কে শুনতে শুরু করেন, যা এতদিন মূলত চিকিৎসক মহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এই সময়েই আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসেন আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। ঘটনার পর হাসপাতাল প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে। কেন শুরুতেই সমস্ত তথ্য পরিষ্কারভাবে সামনে আনা হল না? কেন বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য সামনে এল? কেন পরিবারের সদস্য এবং সহকর্মীদের একাংশ অসন্তোষ প্রকাশ করছিলেন? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে জনরোষের বড় অংশ গিয়ে পড়ে অধ্যক্ষের উপর। হাসপাতালের গেটে গেটে পোস্টার পড়তে শুরু করে। সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয় তীব্র সমালোচনা। ধীরে ধীরে সন্দীপ ঘোষ এই বিতর্কের অন্যতম কেন্দ্রীয় চরিত্র হয়ে ওঠেন।
সন্দীপ ঘোষ অবশ্য বারবার দাবি করেছিলেন, তিনি নিয়ম মেনেই কাজ করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, ঘটনার পরে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া অনুসারেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই ব্যাখ্যা আন্দোলনকারীদের একাংশকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। কারণ, তখন প্রশ্নটা শুধুমাত্র একটি ঘটনার ছিল না। প্রশ্ন ছিল বিশ্বাসের। মানুষ জানতে চাইছিলেন, একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজের ভিতরে আসলে কী ধরনের পরিবেশ কাজ করত?
তদন্ত যত এগোচ্ছিল, ততই সামনে আসছিল নিরাপত্তা ব্যবস্থার নানা প্রশ্ন। একজন মহিলা চিকিৎসক রাতের ডিউটিতে ছিলেন। হাসপাতালের ভিতরে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার? যে সেমিনার রুম থেকে দেহ উদ্ধার করা হয়েছিল, সেখানে নজরদারি কতটা ছিল? বহিরাগতদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা কতটা কার্যকর ছিল? এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজতে গিয়ে হাসপাতালের পরিকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাও জনসমালোচনার মুখে পড়ে।
ঘটনার কয়েক দিনের মধ্যে আরজি করকে ঘিরে আরও কিছু অভিযোগ ঘুরতে শুরু করে। চিকিৎসক মহলের একাংশের মধ্যে আর্থিক অনিয়ম, প্রভাবশালী গোষ্ঠীর দাপট এবং প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্ব নিয়ে নানা আলোচনা সামনে আসে। এই অভিযোগগুলির অনেকগুলিই তখন তদন্তাধীন ছিল বা যাচাইয়ের পর্যায়ে ছিল। কিন্তু জনমনে সন্দেহের আবহ এমন জায়গায় পৌঁছেছিল, যেখানে প্রতিটি নতুন অভিযোগই আরও বড় প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছিল।
এদিকে হাসপাতালের ভিতরের ক্ষোভ ধীরে ধীরে বাইরে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। প্রথমে চিকিৎসক সমাজ, তারপর ছাত্রছাত্রী, পরে সাধারণ মানুষ— একের পর এক স্তর এই আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে যেতে থাকে। সামাজিক মাধ্যম তখন প্রতিবাদের বড় মঞ্চ। প্রতিদিন নতুন নতুন পোস্ট, বক্তব্য, অভিজ্ঞতা সামনে আসছে। একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে উঠছিল— মানুষের ক্ষোভ আর শুধু অপরাধীর বিরুদ্ধে নয়। ক্ষোভ ছিল সেই ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও, যাকে অনেকেই দায়ী করতে শুরু করেছিলেন।
অগস্টের দ্বিতীয় সপ্তাহে এসে বাংলার পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে শুরু করে। হাসপাতালের গণ্ডিতে আটকে থাকা ক্ষোভ রাজপথের দিকে এগোচ্ছে। প্রতিবাদের ভাষাও বদলাচ্ছে। মহিলাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে রাত জাগো আন্দোলনে নামেন মহিলারা ৷ যাতে শামিল হতে দেখা যায় খুদে থেকে অশীতিপর বৃদ্ধ বৃদ্ধাদেরও৷ সকলেরই মুখে একটাই কথা জাস্টিস ফর আরজি কর ৷ কারণ, আরজি কর ততদিনে আর শুধুমাত্র একটি হাসপাতালের নাম নয়। এটি হয়ে উঠছে প্রতিবাদের প্রতীক।
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।