২৮শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
নস্টালজিয়া আর বেঁচে থাকার অদম্য রূপকথা – পর্ব ৫ (শেষ)

কলেজ স্ট্রিট বা উত্তর কলকাতার চেনা গলিতে হাঁটলে আজও দেখা মিলবে ‘হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’, ‘তরুণ নিকেতন’ বা ‘জগন্নাথ হোটেল’-এর মতো জীবন্ত ইতিহাসের। ছবি - Google.

নস্টালজিয়া আর বেঁচে থাকার অদম্য রূপকথা – পর্ব ৫ (শেষ)

calender icon 2 ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

সময় বদলেছে, কলকাতার আকাশচুম্বী বহুতল আর ক্যাফে সংস্কৃতির ভিড়ে আজ হারিয়ে যেতে বসেছে সেই চেনা মেস বাড়ি আর পাইস হোটেলগুলো। যেখানে এক পয়সা বা এক আনা দিয়ে খাবারের হিসাব শুরু হতো, আজ সেখানে কয়েকশো টাকার নোট অনায়াসে খরচ হয়ে যায়।

কলকাতার ঐতিহ্যের শিকড়

তা সত্ত্বেও, কলকাতার ঐতিহ্যের শিকড় এতটাই গভীরে যে, শত ঝোড়ো হাওয়ার মধ্যেও শহরের বুকে এখনও টিকে আছে হাতেগোনা কয়েকটি শতবর্ষ প্রাচীন পাইস হোটেল। তারা শুধু খাবার বিক্রি করে না, তারা আসলে কলকাতার এক শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে চলেছে।

চুন-সুরকির দেওয়ালে পুরনো কলকাতার গন্ধ

কলেজ স্ট্রিট বা উত্তর কলকাতার চেনা গলিতে হাঁটলে আজও দেখা মিলবে ‘হোটেল সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম’, ‘তরুণ নিকেতন’ বা ‘জগন্নাথ হোটেল’-এর মতো জীবন্ত ইতিহাসের। ১৯৩৮ সালে শুরু হওয়া সিদ্ধেশ্বরী আশ্রম আজও চুন-সুড়কির দেওয়ালে সেই পুরনো কলকাতার গন্ধ ধরে রেখেছে। আজও সেখানে প্রতিদিন সকালবেলা নিয়ম করে গঙ্গার টাটকা রুই, কাতলা, পাবদা বা পারশে মাছ আসে। ফ্রিজ ব্যবহার না করার সেই পুরনো কায়দা আজও তারা মেনে চলে। দুপুরের দিকে সেখানে গেলে আজও দেখা যাবে সেই চেনা ব্যস্ততা, যেখানে কাঠের টেবিলে বসে কলাপাতা বা কাঁসার থালায় গরম ধোঁয়া ওঠা ভাতের সাথে মাছে-ভাতে বাঙালি রসনাতৃপ্তি করছেন শহরের চেনা-অজানা মানুষ।

বাড়ির রান্নার মতো হালকা অথচ সুস্বাদু

তবে আধুনিক যুগের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে এই হোটেলগুলোকে অনেক লড়াই করতে হচ্ছে। কলাপাতার জোগান কমে আসায় এখন অনেক জায়গায় শালপাতা বা চিনেমাটির থালা জায়গা করে নিয়েছে। কাগজের ডায়েরিতে পেনসিল দিয়ে আঁকিবুঁকি কেটে হিসাব করার জায়গায় এসেছে ক্যাশ কাউন্টার। কিন্তু খাবারের সেই চেনা স্বাদ, যেখানে বেশি মশলা বা কৃত্রিম রঙের ব্যবহার থাকে না, এক্কেবারে বাড়ির রান্নার মতো হালকা অথচ সুস্বাদু, তা আজও অপরিবর্তিত।

ঐতিহ্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা

এই হোটেলগুলোর বর্তমান প্রজন্ম তাদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য ধরে রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কারণ তারা জানেন এগুলো কেবল ব্যবসা নয়, এগুলো কলকাতার এক একটি ঐতিহ্যবাহী স্মারক।বোর্ডিং হাউস থেকে শুরু করে এই পাইস হোটেলের ‘মহল’ হয়ে ওঠার যাত্রাটি আসলে কলকাতারই বিবর্তনের ইতিহাস। গ্রাম থেকে শহরে আসা এক উদ্বাস্তু, স্বপ্নসন্ধানী কলকাতার যে লড়াই, সেই লড়াইয়ের প্রধান জ্বালানি জুগিয়েছে এই সস্তার হোটেলগুলো।

আজ হয়তো সময়ের নিয়মে অনেক মেস বাড়ি ভেঙে প্রমোটিং হয়ে যাচ্ছে, পাইস হোটেলগুলোর জায়গায় গজিয়ে উঠছে ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁ। কিন্তু কলকাতার ইতিহাসের পাতায় এই পাইস হোটেল এবং বোর্ডিং হাউসগুলো চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। এক থালায় জমে থাকা শতবর্ষের কলকাতা আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শহরটা কেবল ইট-পাথরের নয়, এই শহরটা আসলে মানুষের, তাদের লড়াইয়ের আর তাদের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছার।

(শেষ)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

অন্যান্য