

একটি জীবন্ত ইতিহাস, রাজনৈতিক মতাদর্শের মিলনমেলা এবং সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর। ছবি - Google.
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কলকাতার বোর্ডিং হাউস বা মেস বাড়িগুলো কেবল চার দেওয়ালের কিছু ঘর ছিল না; সেগুলো ছিল এক একটি জীবন্ত ইতিহাস, রাজনৈতিক মতাদর্শের মিলনমেলা এবং সংস্কৃতির আঁতুড়ঘর।
উনিশ ও বিশ শতকের কলকাতায় যখন জাতীয়তাবাদী আন্দোলন তীব্র হয়ে উঠছে, তখন এই মেস বাড়িগুলোই হয়ে উঠেছিল ব্রিটিশ-বিরোধী সশস্ত্র বিপ্লবীদের গোপন আস্তানা। দূর-দূরান্ত থেকে আসা তরুণরা শহরের কলেজগুলোতে ভরতি হওয়ার পাশাপাশি জড়িয়ে পড়ছিলেন স্বাধীনতার লড়াইয়ে। আর তাদের ছদ্মবেশে থাকার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা ছিল এই ঘিঞ্জি, কোলাহলপূর্ণ বোর্ডিং হাউসগুলো।
ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, উত্তর ও মধ্য কলকাতার বহু নামী-বেনামী মেস বাড়ির ঘরে বসেই তৈরি হয়েছিল বহু সশস্ত্র বিপ্লবের নীল নকশা। অনুশীলন সমিতি বা যুগান্তর দলের বিপ্লবীরা প্রায়শই সাধারণ চাকুরিজীবী বা ছাত্রের পরিচয় দিয়ে এই মেসগুলোতে ঘর ভাড়া নিতেন। মেসের ম্যানেজার বা পাঁচকবামুনরা অনেক সময় সব জেনেও দেশের টানে মুখ বুজে থাকতেন, বিপ্লবীদের গোপন চিঠি আদান-প্রদানে সাহায্য করতেন। পুলিশের নজর এড়াতে মেসের ছাদে গভীর রাতে চলত গোপন বৈঠক।
গোয়েন্দা পুলিশের ডায়েরিতে তৎকালীন কলকাতার মেস বাড়িগুলোকে ‘সেডিশন বা রাষ্ট্রদ্রোহের বাসা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছিল।স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে এই রাজনৈতিক চরিত্রটি বদলে যায় এক প্রবল সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক চরিত্রে। মেস বাড়িগুলো হয়ে ওঠে আড্ডার ‘মহল’। মেসের একেকটি ঘর ছিল যেন একেকটি ক্ষুদ্র সংসদ। সেখানে আলোচনার কোনো সীমানা ছিল না। ফুটবল মাঠের ইস্টবেঙ্গল-মোহনবাগান লড়াই থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি, ভিয়েতনাম যুদ্ধ, সিনেমা, লিটল ম্যাগাজিনের ভবিষ্যৎ- সবকিছু নিয়ে ঝড় উঠত মেসের সন্ধের আড্ডায়।
চা আর সস্তার চানাচুরের সঙ্গে চলত তর্ক, যে তর্কের উত্তাপে অনেক সময় রাত পার হয়ে ভোর হয়ে যেত।এই মেস সংস্কৃতির সবচেয়ে সুন্দর দিকটি ছিল এর যৌথতা। মেসের বাসিন্দারা সবাই আসতেন আলাদা পরিবার থেকে, কিন্তু মেসের ভেতরে তারা হয়ে উঠতেন এক অখণ্ড পরিবার। কারও বাড়ি থেকে আমের আচার বা সন্দেশ এলে তা সমবণ্টন হতো মেসের সব ঘরে। কেউ অসুস্থ হলে রাত জেগে সেবা করার জন্য মেসের বাকি সদস্যরা পালা করে ডিউটি দিতেন।
একাকী শহরের বুকে এই মেস বাড়িগুলোই ছিল এক টুকরো চেনা গ্রাম বা আপন ঘর। আজ কলকাতা কর্পোরেটের ফ্ল্যাট সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, যেখানে প্রতিবেশীর খবর রাখার সময় কারও নেই। কিন্তু শতবর্ষের কলকাতা সাক্ষী আছে, কীভাবে এই একান্নবর্তী মেস বাড়িগুলো একদিন নিঃসঙ্গ মানুষদের এক সুতোয় বেঁধে রেখেছিল এবং কলকাতার বুকে এক অনন্য নাগরিক যৌথতার জন্ম দিয়েছিল।
(চলবে)
পরের পর্বে শেষ
এক থালায় বন্দি কলকাতার শতবর্ষের লড়াই, নস্টালজিয়া আর বেঁচে থাকার অদম্য রূপকথা।
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।