

আজকের কলকাতায় মেস সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। ছবি - Google.
২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
কলকাতার কলেজ স্ট্রিটে এখনও দুপুর নামলে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখা যায়। বইয়ের দোকানের সামনে ছাত্রদের ভিড়, ফুটপাতে পুরনো বইয়ের স্তূপ, প্রেসের শব্দ, রিকশার ঘণ্টি- সব মিলিয়ে যেন এক চিরচেনা কলকাতা। এই কোলাহলের মধ্যেই একটি ছোট্ট দরজা। বাইরে থেকে দেখলে আর পাঁচটা পুরনো বাড়ির মতোই। কিন্তু সেই দরজা পেরোলেই যেন সময়ের কাঁটা পিছিয়ে যায় একশো বছর!
এখানেই ছিল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস। আর আজ এই জায়গার পরিচয়, ‘মহল’, কলকাতার অন্যতম পরিচিত পাইস হোটেল। একটি বাড়ি কী ভাবে বদলে যায় সময়ের সঙ্গে? কী ভাবে ছাত্রদের থাকার মেস হয়ে ওঠে বাঙালির স্মৃতির রান্নাঘর? ‘মহল’-এর গল্প আসলে সেই বদলে যাওয়া কলকাতার গল্প।
আজকের কলকাতায় মেস সংস্কৃতি অনেকটাই হারিয়ে যাওয়া অধ্যায়। কিন্তু একটা সময় ছিল, যখন গ্রামের ছেলে শহরে পড়তে এলে, চাকরির সন্ধানে যুবক কলকাতায় এলে, প্রথম আশ্রয় মিলত এই বোর্ডিং হাউসেই। উনিশ শতকের শেষ থেকে বিশ শতকের শুরুর কলকাতা ছিল শিক্ষার ও কর্মসংস্থানের কেন্দ্র। প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, আদালত, অফিস- সবকিছুকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল নতুন এক শহুরে জীবন।
সেই জীবনের অন্যতম অংশ ছিল ‘মেস বাড়ি’। কয়েকটি ঘর, একসঙ্গে থাকা কয়েকজন মানুষ, ভাগ করে নেওয়া খাবারের টেবিল, আর তার মধ্যেই তৈরি হত বন্ধুত্ব, বিতর্ক, সাহিত্যচর্চা। ১৯১৭ সালে নন্দলাল দত্তের উদ্যোগে শুরু হয়েছিল প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউস। উদ্দেশ্য ছিল শহরে আসা ছাত্র ও কর্মজীবী মানুষের জন্য থাকার জায়গা তৈরি করা।
একটি বাড়ির আসল ইতিহাস লুকিয়ে থাকে তার বাসিন্দাদের মধ্যে। প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসের সেই ইতিহাসের পাতায় উঠে আসে বাংলা সাহিত্যের দুই উজ্জ্বল নাম- শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় এবং জীবনানন্দ দাশ। সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে এই বাড়ির গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় শরদিন্দুর সঙ্গে যোগসূত্রের কারণে। ব্যোমকেশ বক্সীর স্রষ্টার স্মৃতির সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই পুরনো বোর্ডিং হাউস। কবি জীবনানন্দ দাশও এই বাড়িতে থেকেছেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়। শহরে পড়াশোনা ও কর্মজীবনের নানা সময়ে এই বোর্ডিং ছিল তাঁর কলকাতার ঠিকানাগুলির একটি।
ভাবা যায়? যে করিডর দিয়ে হয়তো একদিন হেঁটে গিয়েছেন এক তরুণ কবি, যে ঘরে সন্ধ্যার আলোয় লেখা হয়েছে কোনও কবিতার খসড়া! আজ সেই জায়গাতেই বসে কেউ দুপুরের ভাত খাচ্ছেন। ইতিহাস কখনও কখনও এমনই সাধারণ হয়ে আমাদের সামনে বসে থাকে!
কিন্তু শহর তো থেমে থাকে না। স্বাধীনতার পর কলকাতার চেহারা বদলাতে শুরু করল। মানুষের জীবনযাত্রা বদলাল। একসময় যে মেসবাড়িতে কয়েকজন মিলে থাকা ছিল স্বাভাবিক, পরে মানুষ চাইতে শুরু করল নিজের আলাদা জায়গা। ধীরে ধীরে কমতে থাকল পুরনো বোর্ডিং সংস্কৃতি।
প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং হাউসও সেই পরিবর্তনের সাক্ষী। কিন্তু এই বাড়ির রান্নাঘর হারিয়ে যেতে দিল না তার অতীতকে।
মেসবাড়ির রান্নাঘর থেকেই জন্ম নেয় নতুন পরিচয়, ‘মহল’ পাইস হোটেল। ১৯৯১ সালে শুরু হয় এই নতুন যাত্রা। থাকার জায়গা নয়, এবার মানুষের আসার কারণ হল খাবার। কিন্তু খাবারের সঙ্গে রয়ে গেল পুরনো দিনের সেই আন্তরিকতা। কাঠের টেবিল, সাধারণ পরিবেশ, কলাপাতায় ভাত, ডাল, মাছের ঝোল- সবকিছুর মধ্যেই যেন রয়েছে পুরনো কলকাতার গন্ধ। এখানে খাবার শুধু পেট ভরায় না, ফিরিয়ে নিয়ে যায় একটা সময়ের কাছে।
এক থালায় একশো বছরের শহর
কলকাতার ইতিহাস শুধু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল, বড় বড় বাড়ি বা স্মৃতিসৌধে লেখা নেই। ইতিহাস লুকিয়ে থাকে এমন ছোট্ট জায়গাতেও। যেখানে একদিন ছাত্ররা থেকেছে, সাহিত্যিকরা হেঁটেছেন, স্বপ্ন দেখা মানুষরা শহরে নিজেদের জায়গা খুঁজেছেন, আজ সেখানে বসে সাধারণ মানুষ খাচ্ছেন দুপুরের ভাত!
‘মহল’ তাই শুধু একটি পাইস হোটেল নয়। এ যেন কলকাতার একটি জীবন্ত আর্কাইভ। যেখানে পুরনো দিনের মেসবাড়ি, সাহিত্য, শহুরে জীবন আর বাঙালির খাবারের সংস্কৃতি সব একসঙ্গে মিশে আছে একটি থালায়।
(চলবে)
পরের পর্বে
শুধু ভাতের হোটেল নয় ! পাইস’-এর মধ্যে লুকিয়ে আছে ইতিহাসও
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।