২৮শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
স্মৃতির বোর্ডিং হাউস থেকে স্বাদের পাইস হোটেল! পর্ব – ৩

কলকাতার পাইস হোটেলের ইতিহাস শুধু সস্তা খাবারের গল্প নয়। ছবি - Google.

স্মৃতির বোর্ডিং হাউস থেকে স্বাদের পাইস হোটেল! পর্ব – ৩

calender icon 2 ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

কাঠের বেঞ্চ, কলাপাতা! পাইস হোটেলের অন্দরমহল

কলকাতার পাইস হোটেলের ইতিহাস শুধু সস্তা খাবারের গল্প নয়, তা আসলে এক অদ্ভুত ও নিখুঁত অর্থনীতির দলিল। উনিশ শতকের শেষভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত যে সমস্ত মানুষ গ্রাম থেকে কলকাতায় ভাগ্য অন্বেষণে এসেছিলেন, তাদের পকেটের জোর ছিল অত্যন্ত সীমিত। এই সীমিত পুঁজিকে সম্মান জানিয়েই জন্ম নিয়েছিল পাইস হোটেলের নিজস্ব বিপণন নীতি। আজকের কর্পোরেট দুনিয়া যাকে 'আ লা কার্তে' (À la carte) বলে বুক ফুলায়, কলকাতার পাইস হোটেলগুলো তা শতাব্দীরও বেশি সময় আগে থেকে নিখুঁতভাবে করে আসছে।

যতটুকু খাবেন, ততটুকুরই দাম দেবেন

পাইস হোটেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, "আপনি যতটুকু খাবেন, ঠিক ততটুকুরই দাম দেবেন।" এখানে কোনো সাজানো 'থালি' বা 'কম্বো' ছিল না। প্রতিটি জিনিসের আলাদা মূল্য নির্ধারিত থাকত। খেতে বসলে প্রথমে পাত পেড়ার জন্য দিতে হতো এক পয়সা। তারপর ভাতের দাম দুই পয়সা, ডালের দাম এক পয়সা, তরকারি এক পয়সা। এমনকি আপনি যদি অতিরিক্ত একটি গন্ধরাজ লেবু, কাঁচা লঙ্কা বা এক টুকরো নুনও নেন, তবে তার জন্যও আলাদা এক পাই বা পয়সা গুনতে হতো!

কৃপণতা নয়, বরং চরম সামাজিক সততা

এই নিয়মের পেছনে কোনো কৃপণতা ছিল না, বরং ছিল এক চরম সামাজিক সততা। একজন চটকলের মজুর বা ট্রামের খালাসি যার হয়তো সেদিন পকেটে মাত্র ৪ পয়সা আছে, সেও এসে পেট ভরে শুধু ভাত, ডাল আর লঙ্কা-নুন দিয়ে তৃপ্তির আহার করতে পারত। তাকে জোর করে পুরো থালির টাকা দিতে হতো না।এই হোটেলগুলোর অন্দরমহলের পরিবেশ ছিল অত্যন্ত চেনা এবং ঘরোয়া।

মেঝেতে মাদুর পেতে বসার চলও ছিল

কোনো জাঁকজমক ছিল না। সার দিয়ে পাতা থাকত কাঠের চওড়া বেঞ্চ আর টেবিল। কোনো কোনো পুরনো হোটেলে আবার মেঝেতে মাদুর পেতে বসার চল ছিল। রান্না হতো এক্কেবারে সাবেকি বাঙালি ঘরানায়, খাস কয়লার উনুনে।

বাসি খাবারের প্রশ্নই ছিল না

পাইস হোটেলের আরেকটি নিয়ম ছিল, এখানে কোনো ফ্রিজ থাকত না। প্রতিদিন ভোরবেলা হোটেলের ম্যানেজার বা স্বত্বাধিকারী নিজে কোলে মার্কেট বা বাবুঘাটের বাজারে গিয়ে টাটকা মাছ, আনাজ কিনে আনতেন। সকালের রান্না দুপুরে শেষ, আবার দুপুরের পর নতুন করে বাজার করে রাতের রান্না। বাসি খাবারের কোনো ধারণাই ছিল না এই হোটেলগুলোতে।দুপুরের ব্যস্ত সময়ে পাইস হোটেলের দৃশ্যটা দেখার মতো হতো।

মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের পরম আশ্রয়

সেখানে কোনো টেবিল বুকিংয়ের বালাই ছিল না। একটা বড় কাঠের বেঞ্চে পিঠেপিঠি বসে খাচ্ছেন একজন জাঁদরেল অফিসের বড়বাবু, তার পাশেই বসে খাচ্ছেন কলেজ স্ট্রিটের কোনো দরিদ্র ছাত্র, আর তার ঠিক উল্টোদিকে বসে দ্রুত হাত চালাচ্ছেন একজন ট্রাম কন্ডাক্টর বা রাজমিস্ত্রি। জাতপাত বা শ্রেণির কোনো প্রাচীর এই কাঠের বেঞ্চগুলো ভাঙতে পারেনি। অন্নপূর্ণার এই অবারিত দ্বারে সবাই ছিল সমান। এক থালা গরম ভাতের সুবাস আর ডালের ধোঁয়া এসে মুছে দিত কলকাতার সমস্ত অর্থনৈতিক ভেদাভেদ। এই অনাড়ম্বর আন্তরিকতাই পাইস হোটেলকে কলকাতার মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী মানুষের এক পরম আশ্রয় করে তুলেছিল।

(চলবে)

পরের পর্বে

বিপ্লবের আঁতুড়ঘর থেকে আড্ডার ‘মহল’
মেস বাড়ির অলিখিত ইতিহাস

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌমালী চক্রবর্তী
সৌমালী চক্রবর্তী

2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।

অন্যান্য