

প্রেয়সীকে চিঠি লেখা যতটা আনন্দের ছিল, চিঠি পাঠানো আর তার উত্তর পাওয়ার পথটা ছিল ঠিক ততটাই বুক ধড়ফড়ানির। গ্রাফিক - The Fourth Axis.
২৩শে অক্টোবর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
“আমি তোমাকে ভালবাসি”... আজকের মতো চট করে বলে দেওয়া যেত না সে সময়ে! হায় ভীরু প্রেম, কত ফুল ফুটি ফুটি করেও ঝরে গিয়েছে শুধুমাত্র না বলে উঠতে পারার কারণে। প্রেমে পড়া বারণের সে যুগে প্রেমের প্রকাশও যে ছিল কঠিন! প্রেম কোনও তাত্ক্ষণিক বিজ্ঞপ্তির মতো স্ক্রিনে টুং করে ভেসে উঠত না। তখনও প্রেম ছিল এক দীর্ঘ, নীরব তপস্যা। সত্তরের দশকের শেষ কিংবা আশির দশকের গোড়ার দিকে বাঙালির প্রেম মানেই ছিল রোদ, ছায়া আর গভীর অনুভূতির এক অদ্ভুত বোঝাপড়া। সেই সময়ে প্রেমে পড়ার চেয়েও বড় ছিল ভালোবাসার প্রকাশটুকু আগলে রাখার রোমাঞ্চ। তখন বাঙালির প্রেমের ভাষা ছিল অন্যরকম।
একান্নবর্তী পরিবারের কড়া নজরদারি ছিল প্রতি পদক্ষেপে। পাড়ার রোয়াকে বসে থাকা কড়া মেজাজের জ্যাঠামশাই কিংবা একতলার জানলায় দিদিমার চোখ এড়ানো তখন চাট্টিখানি কথা ছিল না। ফলে, দুটো মনের আদান-প্রদান ছিল এক নিখাদ গোপন বিপ্লবের মতো। সেখানে কোনও চটজলদি স্বীকারোক্তি ছিল না। ছিল স্রেফ নিঃশব্দে এক অচেনা আকুলতাকে বুকের ভেতর পুষে রাখার অভ্যাস। যাকে বলা হত হৃদয়ভার। এখন সে হৃদয় থাকলেও ভার বোধহয় আর নেই।
সেই প্রজন্মের ভরসা ছিল চিঠি। সাদা দিস্তা কাগজের চার ভাঁজ কিংবা ডাকঘরের হালকা নীল রঙের ইনল্যান্ড লেটার। রাতের বেলা পড়ার টেবিলে পাঠ্যবইয়ের নিচে লুকিয়ে পেনসিল দিয়ে তৈরি হতো প্রেমপত্রের প্রথম খসড়া। বানান ভুল কাটাকুটি করে মনের সব উথাল-পাথাল মলাটবন্দি করা হতো।
তারপর পার্কার বা উইং সং ফাউন্টেন পেনের নীল কালিতে সযত্নে ফুটিয়ে তোলা হতো অনুভূতিগুলো। কাটাকুটি থাকলে চলবে না, কারণ হাতের লেখার স্পষ্টতার ওপর নির্ভর করত বহু না-বলা কথা। চিঠির ভাষা ছিল গভীর সাহিত্যের ছোঁয়ায় ভরা। সরাসরি ‘ভালোবাসি’ লেখার স্পর্ধা সবার থাকত না। তার বদলে আশ্রয় নেওয়া হতো রবীন্দ্রসংগীতের পংক্তিতে—‘তোমারে পেয়েছি আমি হৃদয় মাঝে, আর কিছু নাহি চাহি’... অনেক সময় এ ধরনের প্রেমপত্রের ভাঁজে রেখে দেওয়া হতো চ্যাপ্টা হয়ে যাওয়া একটি শুকনো রজনীগন্ধার পাপড়ি কিংবা হালকা আতরের সুবাস। সেই ঘ্রাণই ছিল স্পর্শহীন ভালোবাসার চরম প্রাপ্তি।
প্রেয়সীকে চিঠি লেখা যতটা আনন্দের ছিল, চিঠি পাঠানো আর তার উত্তর পাওয়ার পথটা ছিল ঠিক ততটাই বুক ধড়ফড়ানির। পাড়ার লাল রঙের ডাকবাক্সে চিঠিটা ফেলে বাড়ি ফিরে আসা পর্যন্ত সারা শরীর কাঁপত। চিঠিটা ঠিক ঠিক জায়গায় পৌঁছাবে তো? বাড়ির কড়া মেজাজের বাবার হাতে পড়ে যাবে না তো?
তারপর শুরু হতো এক পক্ষকালের অপেক্ষা। পাড়ার মোড়ে যখন পোস্টম্যানের সাইকেলের টুংটাং ঘণ্টা বাজত, জানলার খড়খড়ির আড়াল থেকে একজোড়া উৎসুক চোখ অপলক তাকিয়ে থাকত। কোনও কোনও দিন কোনও উত্তর আসত না। তখন বুকটা খাঁ খাঁ করত। আবার যেদিন বহু প্রতীক্ষিত সেই নীল খাম হাতে আসত, খোলার আগেই বুকের ভেতর হাজারটা তারার আলো জ্বলে উঠত।
একলা চিলেকোঠায় বসে সেই চিঠি বারবার পড়া হতো। মুখস্থ করা হতো প্রতিটি বাক্য, প্রতিটি দাঁড়ি-কমা। এমনকি চিঠির ভাঁজ খুলতে গিয়ে কাগজের যে পরিচিত খসখস আওয়াজ হতো, তাও সেই বয়সে গানের সুরের মতো শোনাত। তখন তো আর চাইলেই ফোন করে গলার স্বর শোনা যেত না!
তখনকার দিনে দেখা করার সুযোগ ছিল ভীষণই সীমিত। বিকেলে ছাদে কাপড় তোলার অজুহাতে কার্নিশের ধারে গিয়ে দাঁড়ানো ছিল নিত্যদিনের অভিসার। পাশের বাড়ির ছাদের দিকে চোখ পড়তেই যদি একবারের জন্য দৃষ্টি বিনিময় হতো, সেই এক সেকেন্ডের চাহনিই ছিল গোটা সপ্তাহের পরম সঞ্চয়।
কার্নিশের গা ঘেঁষে নামা গোধূলির রোদ তখন সাক্ষী থাকত দুটো অবাধ্য হৃদয়ের। সেখানে কোনও উচ্চবাচ্য ছিল না। দূর থেকে শুধু চোখের ভাষায় কথা বলা হতো। পাশের ছাদ থেকে যদি বাতাসে উড়ন্ত আঁচল সামলানোর ফাঁকে একটু লাজুক হাসি পাওয়া যেত, তবে সেই রাতের ঘুম নিশ্চিতভাবেই উধাও হয়ে যেত।
আজকের মতো সারাক্ষণ মেসেজ চালাচালির কোনও সুযোগ ছিল না। তাই ওই চোখের নীরব চাহনিটুকুই ছিল আগামী কয়েকটা দিন বেঁচে থাকার একমাত্র রসদ।
ছুটির দিনে বন্ধুদের মিথ্যে বলে দেখা করার রোমাঞ্চ ছিল একেবারেই আলাদা। বড়জোর কলেজ স্ট্রিটের লাইব্রেরি, পাড়ার গানের টিউশন কিংবা রবীন্দ্র সদনের সিঁড়িতে মিনিট দশেকের জন্য পাশাপাশি হাঁটা। কিংবা হঠাৎ কোনও মেঘলা দুপুরে ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের দূরবর্তী গাছের ছায়ায় বসে কয়েক মুহূর্তের মৃদু ফিসফাস।
সেখানে কোনও শরীরী নৈকট্য ছিল না। ছিল না অধিকারবোধের কোনও তীব্র দাবি। হাত ধরার সাহসটুকু সঞ্চয় করতেই কেটে যেত মাসের পর মাস। হয়তো ট্রামে ওঠার সময় ভিড়ের ধাক্কায় হঠাৎ আঙুলে আঙুল ছুঁয়ে গেল—আর তাতেই মুহূর্তে বিদ্যুৎ খেলে যেত সারা শরীরে।
হাতে হাত রাখাটাই যেখানে কল্পনাতীত ছিল, সেখানে চুম্বনের কথা ভাবাও ছিল মহাপাপ। এই শারীরিক দূরত্বের কারণেই ভালোবাসার গভীরতা দিন দিন গাঢ় হতো। স্পর্শের চেয়ে অনুভূতির টান ছিল অনেক বেশি খাঁটি।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে যাঁদের বাড়িতে ল্যান্ডলাইন ফোন ছিল, তাঁদের প্রেম আরেকটু রোমাঞ্চকর হয়ে উঠল। কিন্তু সেই ফোনের অবস্থান ছিল সাধারণত বসার ঘরে, পরিবারের সবার সামনে। ফলে সরাসরি কথা বলার কোনও সুযোগই ছিল না।
শুরু হল নতুন সংকেত—‘তিনবার রিং হয়ে কেটে গেলে বুঝবে আমি ছাদে আছি’। ভারী কালো রঙের ডায়াল ঘোরানোর যে ঘড়ঘড় আওয়াজ, তার সাথেই যেন পাল্লা দিয়ে বাড়ত বুকের হৃদস্পন্দন। ওপাশে ভারী গলায় বাবার কণ্ঠস্বর শুনলেই সশব্দে রিসিভার নামিয়ে রাখা হতো। কখনও সখনও কোনও রবিবার দুপুরে পরিবারের সবাই যখন ভাতঘুমে অচেতন, তখন পা টিপে টিপে ড্রয়িংরুমে গিয়ে নিচু গলায় স্রেফ দুটো কথা বলা—‘ভালো আছ?’ ব্যস, ওই দুটো শব্দেই যেন স্বর্গ নেমে আসত।
সেই সময়ের প্রেমগুলোর পরিণতি সবসময় সুখের হতো না। পরিবারের জাতপাতের বিচার, অর্থনৈতিক অসমতা কিংবা অভিভাবকের একরোখা জেদের মুখে পড়ে বহু ভালোবাসাই অকালে ঝরে যেত। চিঠি পুড়িয়ে ফেলা হতো, ডায়রির পাতা ছিঁড়ে ফেলা হতো চোখের জলে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, সম্পর্ক ভেঙে গেলেও সেই প্রেমের স্মৃতিগুলো কোনওদিন নোংরা কাদা-ছোড়াছুঁড়িতে পরিণত হতো না। কেউ কাউকে সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্লক করার সুযোগ পেত না। প্রেম হারিয়ে গেলেও থেকে যেত বুকের বাঁদিকের কোনও এক গোপন কুঠুরিতে।
বছরের পর বছর পার হয়ে গেলেও হঠাৎ কোনও পুরোনো বইয়ের পাতা থেকে সেই শুকনো রজনীগন্ধার পাপড়িটা খসে পড়লে চোখে জল এসে যেত। মনে পড়ে যেত সেই নীল খামের দিনগুলোর কথা। সেই প্রজন্মের কাছে প্রেম ছিল কেবল এক নিখাদ সমর্পণ, অসীম অপেক্ষা আর দূর থেকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবেসে যাওয়ার অপার শান্তি।
(চলবে)
পরের পর্বে
মিলেনিয়াল: ল্যান্ডলাইনের বুকধড়ফড়, ট্রু কলার-হীন নোকিয়া আর এসএমএস বিপ্লব
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
সাংবাদিক, লেখক ও চিত্রনাট্যকার। দক্ষিণ কলকাতায় বেড়ে ওঠা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। কাজ করেছেন নিউজ ১৮ বাংলা, আনন্দবাজার অনলাইন এবং দ্য ওয়াল-র মতো সংবাদমাধ্যমে। এ ছাড়া শিক্ষকতা ও চলচ্চিত্র নির্মাণের সঙ্গেও যুক্ত থেকেছেন। সমকাল, সমাজ ও মানুষের মনস্তত্ত্ব থেকেই তাঁর সাহিত্য ও চিত্রনাট্যের মূল রসদ খুঁজে নেন। দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানো এবং পশু-পাখি, প্রকৃতি ও বিজ্ঞানচর্চা তাঁর আগ্রহের বিষয়। মুদ্রিত গল্প সংকলন এবং উপন্যাস এ পর্যন্ত ৩টি; ডিজিটাল মাধ্যমে প্রকাশিত লেখা অজস্র। বর্তমানে চিত্রনাট্য লেখেন বাংলা ধারাবাহিক, ওয়েব সিরিজ এবং বিদেশি ছবির জন্যও।