২৮শে অক্টোবর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
মার্ক্সীয় ডায়ালেকটিক ও ধর্ম – পর্ব ৩

মার্ক্সীয় দ্বন্দ্বমূলক বোঝাপড়া। প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis.

মার্ক্সীয় ডায়ালেকটিক ও ধর্ম – পর্ব ৩

calender icon 2 ১০ই অক্টোবর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

বিশ্বসাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও এই প্রতিক্রিয়াশীল উত্থান বিচ্ছিন্ন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের
সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিপর্যয়ের পর বিশ্বব্যাপী যে মতাদর্শগত শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সাম্রাজ্যবাদ
সচেতনভাবে সেখানে জাতিগত বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় মৌলবাদকে মদত দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ
যেমন সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধর্মীয় রাজতন্ত্রগুলোর হাত ধরেছে, তেমনি ভারতেও ঠান্ডা যুদ্ধের যুগ থেকেই
চরম দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে সমাজতন্ত্র ও জোটনিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে তাদের স্বাভাবিক মিত্র
হিসেবে গণ্য করেছে। দেশের ভেতরের এই সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ কেবল দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্রকেই
ধ্বংস করে না, বরং দেশের অর্থনীতিকে আন্তর্জাতিক বহুজাতিক পুঁজির পদানত করার কাজটিও মসৃণ করে
দেয়।

ধর্ম প্রসঙ্গে মার্ক্সবাদের দ্বান্দ্বিক বোঝাপড়া

এই ভয়াবহ দক্ষিণপন্থী সাম্প্রদায়িক আগ্রাসনের মুখে দাঁড়িয়ে প্রগতিশীল শক্তিগুলির অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হল
ধর্ম সম্পর্কিত মার্ক্সীয় তত্ত্বের একটি স্থূল ও যান্ত্রিক পাঠকে আঁকড়ে ধরে থাকা। বছরের পর বছর ধরে একটি
বিচ্ছিন্ন উদ্ধৃতি বারবার বাজারি তর্কে ব্যবহৃত হয়েছে—"ধর্ম হল জনগণের আফিম"। কিন্তু মার্ক্স ঠিক কী
পরিপ্রেক্ষিতে এই কথাটি লিখেছিলেন, তা সমগ্র পাঠটি না পড়লে বোঝা অসম্ভব। ১৮৪৪ সালে হেগেলের
অধিকার দর্শনের সমালোচনার ভূমিকায় কার্ল মার্ক্স লিখেছিলেন:

"ধর্মীয় দুর্দশা একই সাথে বাস্তব দুর্দশার প্রকাশ এবং সেই বাস্তব দুর্দশার বিরুদ্ধে এক ধরনের প্রতিবাদ। ধর্ম
হল নিপীড়িত জীবের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন পৃথিবীর হৃদয়, ঠিক যেমন তা আত্মাহীন পরিস্থিতির আত্মা। এটি
জনগণের আফিম।"

যান্ত্রিক বস্তুবাদ বনাম দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ

মার্ক্সীয় দ্বান্দ্বিক চিন্তায় ধর্ম মানুষের শত্রু নয়, বরং এমন এক সামাজিক পরিস্থিতির ফল যেখানে মানুষ
প্রতিনিয়ত শোষিত ও পরাভূত হয়। মানুষ যখন প্রকৃতির অন্ধ শক্তি কিংবা পুঁজিবাদের নৃশংস অর্থনৈতিক
নিয়মাবলির সামনে নিজেকে সম্পূর্ণ অসহায় দেখে, তখন সে পরলোকে এমন এক কাল্পনিক জগতের সন্ধান
করে যেখানে সে শান্তি ও ন্যায়বিচার পাবে। ধর্ম হল সেই আফিম যা সাময়িকভাবে তাকে এই নির্মম বাস্তবের
তীব্র যন্ত্রণা ভুলে থাকতে সাহায্য করে।

ফেডারিক এঙ্গেলস তাঁর 'অ্যান্টি-ডুরিং' গ্রন্থে দেখিয়েছিলেন যে আদিম যুগে মানুষ যখন প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণহীন
শক্তিগুলোকে বুঝতে অক্ষম ছিল, তখন সেই শক্তিগুলোই দেবতার রূপ নেয়। পরবর্তীকালে সমাজবিকাশের
ধারায় সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তিগুলো মানুষের জীবনে অন্ধ নিয়তির মতো চেপে বসে, যা একেশ্বরবাদী
ঈশ্বরের ধারণার জন্ম দেয়। পুঁজিবাদী সমাজে মানুষ নিজের তৈরি উৎপাদনের উপায় ও অর্থনৈতিক কাঠামোর
কাছেই বন্দি। অতএব, ধর্মের মূল মানুষের সচেতনতার বিভ্রান্তিতে নয়, বরং তার সামাজিক বাস্তবতার মধ্যেই
প্রোথিত।

লেনিন ১৯০৫ সালে তাঁর 'সমাজতন্ত্র ও ধর্ম' প্রবন্ধে অত্যন্ত কঠোরভাবে মনে করিয়ে দিয়েছিলেন: "বুর্জোয়া
সংস্কারক বা সংকীর্ণ জ্ঞানালোকপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা মনে করেন অজ্ঞতাই ধর্মের মূল, তাই তাঁদের স্লোগান হল—'ধর্ম
নিপাত যাক, নাস্তিকতা দীর্ঘজীবী হোক!' কিন্তু মার্ক্সবাদী জানেন এই দৃষ্টিভঙ্গি চরম ভাসা-ভাসা এবং
ভাববাদী। আধুনিক সমাজে ধর্মের মূল শেকড় হল শ্রমিক শ্রেণির সামাজিক নিপীড়ন এবং পুঁজির অন্ধ
ধ্বংসাত্মক শক্তির সামনে মানুষের দৈনিক অসহায়তা।"

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী
সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য