

প্রতিবাদের প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis.
১০ই অক্টোবর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
অতএব, মার্ক্সবাদ ধর্মের সঙ্গে কোনো পুলিশি বা প্রশাসনিক যুদ্ধ ঘোষণা করে না। এঙ্গেলস ডুরিংয়ের
মতাদর্শগত ভ্রান্তির তীব্র সমালোচনা করে বলেছিলেন যে যিনি সমাজতান্ত্রিক সমাজে জোর করে ধর্ম নিষিদ্ধ
করতে চান, তিনি আসলে ধর্মকে শহীদের মর্যাদা দিয়ে তার আয়ু আরও বাড়িয়ে দেন। মার্ক্সবাদ কোনো
ধর্মবিশ্বাসীর ব্যক্তিগত বিশ্বাসকে আঘাত করে সমাজ বদলাতে পারে না; বরং যে সামাজিক শোষণ, বিচ্ছিন্নতা
ও অবিচার মানুষকে অলীক সান্ত্বনা খুঁজতে বাধ্য করে, সেই বৈষয়িক ভিত্তিকে ধ্বংস করাই মার্ক্সীয়
রাজনীতির একমাত্র কাজ।
ইতিহাসের যে কোনো পর্বে শাসকশ্রেণি নিজেদের আধিপত্য কায়েম রাখার জন্য প্রাচীন ঐতিহ্য ও ধর্মীয়
সাহিত্যকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছে। কিন্তু সেই একই ঐতিহ্য কি শুধুমাত্র প্রতিক্রিয়াশীলদের
সম্পত্তি? মার্ক্সীয় ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে প্রতিটি ধর্মের ইতিহাস শ্রেণিদ্বন্দ্বেরই এক বিশেষ
ধরনের প্রকাশ।
ইউরোপে প্রোটেস্ট্যান্ট আন্দোলন এবং টমাস মুঞ্জারের কৃষক বিদ্রোহের ইতিহাস প্রমাণ করে যে নিপীড়িত মানুষ
বহুবার ধর্মীয় ভাষাকেই তাদের শ্রেণি সংগ্রামের হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিয়েছিল। ভারতেও সুফি ও ভক্তি
আন্দোলন ছিল মূলত বর্ণাশ্রমের কঠোর ব্রাহ্মণ্যবাদী অচলাবস্থার বিরুদ্ধে নিম্নবর্গের মানুষের এক গভীর
সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিদ্রোহ। কবির, নানক, চৈতন্যদেব কিংবা তুকারামের বাণী কোনো স্থূল ধর্মীয়
আধিপত্যের কথা বলেনি; তা সামন্ততান্ত্রিক স্তরবিন্যাসকে ভেঙে মানুষের সমমর্যাদার দাবি তুলেছিল।
একইভাবে স্বামী বিবেকানন্দের চিন্তা ও কর্মকাণ্ডকে কেবল হিন্দু পুনরুত্থানবাদের ফ্রেমে বাঁধা এক চরম
ঐতিহাসিক ভুল। বিবেকানন্দ যখন বলেন—"যেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ ক্ষুধার্ত ও অজ্ঞ, সেখানে প্রতিটি শিক্ষিত
মানুষ তাদের পয়সায় শিক্ষিত হয়ে যদি তাদের কথা না ভাবে, তবে সে দেশদ্রোহী", কিংবা যখন তিনি
শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের—শূদ্রের—আগামীদিনের শাসন প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যদ্বাণী করেন, তখন তা কোনো গোঁড়া
ধর্মীয় অনুশাসন থাকে না। তা হয়ে ওঠে জাতীয় মুক্তি ও মানবমুক্তির এক তীব্র আর্তি। কমিউনিস্ট
আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত (বিবেকানন্দের অনুজ) তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছিলেন কীভাবে তাঁর
অগ্রজের দর্শনের মধ্যে এক বৈপ্লবিক ও সমাজতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা প্রোথিত ছিল। ইএমএস নাম্বুদ্রিপাদ যখন
শঙ্করাচার্যের দর্শনের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ করেন, কিংবা পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন যখন তুলে ধরেন হিন্দু ও
মুসলমানের শতবর্ষের যুক্ত সাধনার ইতিহাস, তখন তাঁরা প্রতিক্রিয়াশীলদের হাত থেকে সেই সাংস্কৃতিক
ঐতিহ্যকে ছিনিয়ে এনে মেহনতি মানুষের আত্মপরিচয়ের অঙ্গে পরিণত করেন।
আজকের দক্ষিণপন্থীরা যখন ধর্মগ্রন্থকে অন্ধ যুদ্ধোন্মাদনা ও সংকীর্ণ বিভাজনের তূণীরে পরিণত করতে চায়,
তখন প্রগতিশীল শক্তিকে কুরুক্ষেত্রের সেই প্রান্তরে দাঁড়িয়েই প্রশ্ন তুলতে হবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ নিছক কোনো
ধর্মযুদ্ধ ছিল না; তা ছিল এক ক্ষয়িষ্ণু, নীতিভ্রষ্ট শাসনের বিরুদ্ধে ন্যায়ের জন্য সংগ্রাম। যে কৃষ্ণ অর্জুনকে
বিষাদগ্রস্ততা কাটিয়ে কর্মে ঝাঁপিয়ে পড়ার নির্দেশ দেন, সেই কর্ম কোনো স্বার্থপর ব্যক্তিপূজা নয়, তা সমাজের
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আহ্বান। দক্ষিণপন্থীরা যখন রাম কিংবা কৃষ্ণকে দলীয় পতাকার প্রতীকে পরিণত
করে, তখন অন্ধ নাস্তিকতার ছুতোয় সেই সাহিত্য ও মিথোলজিকে বর্জন করা আসলে প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির
হাতে ঐতিহ্যের একচেটিয়া মালিকানা তুলে দেওয়ারই শামিল।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।