

ওটজি দ্য আইসম্যান- ৫,৩০০ বছরের পুরনো এই মমি এখনও অব্দি পাওয়া সবচেয়ে পুরনো বডি আর্টের নিদর্শন। ছবি - AI
৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
খনে খনে নয়ন কোন অনুসরই।
খনে খনে বসন ধূলি তনু ভরই॥
বয়ঃসন্ধির রাধাকে স্পর্শ করায় কৃষ্ণের এই ব্যাকুলতা, দেহের চাঞ্চল্য আমাদের প্রেমের, কামনার পাঠ দেয়। তা সে মধ্যবিত্ত বাঙালি ভেকধারি ভদ্র সমাজ যতই নাক সিঁটকোক, ছি ছি করুক না কেন, দেহের টান না থাকলে সে আর কীসের প্রেম! সেই দেহকেই আরও আকর্ষণীয় করে তোলার অন্যতম মাধ্যম বডি আর্ট।
লোকায়ত আচার, ধর্ম থেকে শুরু করে আজকের প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মমতগুলো, সকল ক্ষেত্রেই দেহকে খুবই পবিত্র ও ঈশ্বরের দান বা আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সেই পবিত্রতার যাপন ও উদযাপন জাতি, দেশ, কাল ভেদে সম্পূর্ণ ভিন্ন মেরুতে অবস্থান করছে। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপের এক আদিম জনগোষ্ঠী তাই মৃত্যুর পর ঈশ্বরের আশীর্বাদ মনে করা প্রিয়জের দেহ নিজেরাই খেত। যাতে সেই পবিত্র আত্মার ছোঁয়াচ তারাও পেতে পারে! তার উল্টোদিকে দাঁড়িয়ে পার্সিরা টাওয়ার অফ সাইলেন্সে মৃতদেহ রেখে দিত এবং শকুনে সেটা খেত বা আজও খায়, এই ঘটনা আমরা অনেকেই জানি।
উল্কি বা আজকের ট্যাটু, বডি পেইন্ট, মেহেন্দি, পিয়ার্সিং ইত্যাদি শরীরকে সাজানো বা ভিন্নভাবে তুলে ধরার বডি আর্টের এই বিভিন্ন মাধ্যম আসলে ঈশ্বর প্রদত্ত সেই শরীরেরই এক ধরনের যাপন-উদযাপন।
বডি আর্টের মাধ্যমে মানব দেহের যাপন ও উদযাপনের এই ইতিহাস সাম্প্রতিক অতীতের নয়, বরং তা বহু যুগের। ইতিহাসবিদরা এখনও পর্যন্ত যা প্রমাণ পেয়েছেন, তার ভিত্তিতে বলাই যায়, আজ থেকে অন্তত ৫,৩০০ বছর আগে থেকে বডি আর্টের প্রচলন ছিল। প্যালোলিথিক বা প্রাচীন প্রস্তর যুগে দেখা যায় প্রথম ট্যাটু।
বিভিন্ন সময়ে দেখা গিয়েছে উচ্চ শ্রেণির মানুষরা বা শাসকরা যাদের ঘেন্না করেছে, যাদের অপাংক্তেয় মনে করেছে, যাদের মানুষ হিসেবে অবহেলা করেছে তাদের শরীরে বিভিন্ন বডি আর্টের মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট চিহ্ন, রেখা এঁকে দিতে। বা আরও ভালো করে বললে, গেঁথে দিতে দিতে পছন্দ করেছে।
রোমান শাসকরা খ্রিস্টিয় ধর্মকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর সেখানে নাগরিকদের দেহে উল্কি বা ট্যাটু করা নিষিদ্ধ হয়ে যায়। কারণ তারা মনে করতেন, এই দেহ ঈশ্বরের দান। ট্যাটু বা কোনও কিছুর মাধ্যমে তাকে বিকৃত করার অধিকার কারোর নেই। এভাবে বিকৃত করার অর্থ ঈশ্বরকে অবহেলা করা। কিন্তু রোমান সাম্রাজ্য থেকে সেই সময় ট্যাটু করা চিরতরে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বা বিষয়টি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল এমনটা মোটেও নয়। বরং শাসকদের মদতে, নির্দেশে এক শ্রেণির মানুষকে তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যে বা পৃথিবীর আরও নানান শাসকদের অধীনেই দেখা গেছে ট্যাটু করতেই হত। বিষয়টি বাধ্যতামূলক ছিল। কারণ তারা তো আসলে শাসকদের চোখে মানুষ ছিল না। ছিল দাস, ছিল মানুষের মতো হাত-পা ওয়ালা নরকের কীট। প্রান্তিকদের প্রতি শাসকদের যে মনোভাব হয় আরকি। ফলে রোমান সাম্রাজ্যে যাদের নাগরিকের অধিকার ছিল না, তাদের মধ্যেও যারা আরও নিম্ন শ্রেণির ছিলেন তাদেরকে আবার শরীরে বিশেষ ধরনের ট্যাটু করতে বাধ্য করা হত। কারণ সেটাই তাদের পরিচয়ের চিহ্ন ছিল এবং সেই পরিচয়ের মধ্য দিয়ে বাকিরা সহজে বুঝতে পারত- ওরা আসলে কে। এতে ঘৃণা করতে সুবিধা হত আরকি!
বর্তমানে যে যেভাবেই দেখুন না কেন, একটা বিষয় এতদিনে পরিষ্কার হয়ে গিয়েছে, বডি আর্টের মধ্যে উল্কি বা ট্যাটুর প্রচলনই সম্ভবত প্রথম হয়েছিল। সে হতে পারে চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও কারণে। তাছাড়া সেই সুপ্রাচীনকালে, যখন সভ্যতার বিকাশ সেভাবে শুরু হয়নি, সেই তখন থেকে বহু জাতি ট্যাটুর মাধ্যমে নিজেদের আত্মপরিচয় তুলে ধরত। এটা গর্বের বিষয় ছিল। সেই ধারাবাহিকতা আজও দেখা যায়। আজও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভিন্ন দ্বীপপুঞ্জ, লাতিন আমেরিকা, ইন্দোনেশিয়া বা এই ভারতীয় উপমহাদেশের বেশ কিছু আদিম জনগোষ্ঠী নিজস্ব পদ্ধতিতে ট্যাটু করার মাধ্যমে আত্মপরিচয়ের জানান দেয়। এটা এই জাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে এক ধরনের বাধ্যতামূলক রীতি।
আবার ফ্যারাও আমলের মিশরের এক বিশেষ গোষ্ঠীর মহিলা পুরোহিতদের দেহে বিশেষ ধরনের ট্যাটু করার প্রথা ছিল। এটা তাদের পেশাগত অহঙ্কারের চিহ্ন ছিল বলাই যায়। আবার ইনকা সভ্যতায় যে দেবতার আরাধনা করা হত, তার ভয়াল প্রতিকৃতি চরম কষ্ট সহ্য করে নিজেদের দেহে ইনকারা ট্যাটুর মাধ্যমে ধারণ করত। বোঝাই যাচ্ছে এটা ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে হত। যদিও জবরদখলকারী স্প্যানিসরা প্রথম এই দৃশ্য দেখে, সেই ভয়াল ট্যাটু দেখে তাদেরকে শয়তানের উপাসক বলে মনে করেছিল। আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশে একই রকমভাবে সেই সুপ্রাচীনকালে, খ্রিস্ট জন্মেরও সহস্রাব্দেরও বেশি সময় আগে থেকে বিভিন্ন আদিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ট্যাটুর প্রচলন শুরু হয়েছিল। যা আজও গোন্ড, সাঁওতাল সহ বেশ কিছু জনগোষ্ঠীর মানুষ নিজেদের মতো করে বজায় রেখে চলেছেন।
মূলত যে কারণগুলিতে বা উপলক্ষে বডি আর্টের (মূলত ট্যাটু) প্রচলন দেখা গিয়েছে সেগুলি হল- শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে, বিবাহ, যুদ্ধ বা শিকারের প্রস্তুতি, শিশুর জন্ম, আধ্যাত্মিক আচার-অনুষ্ঠান, মৃত্যু, গোষ্ঠী বা জাতিগত পরিচয় তুলে ধরা, পেশাগত অহঙ্কার প্রকাশে, পরাজিত ও নিম্ন শ্রেণির মানুষদের অপমান ও চিহ্নিত করতে, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে ব্যক্তির অবস্থান তুলে ধরতে।
এর থেকে একটা বিষয় খুব পরিষ্কার, কারণ ভিন্ন ভিন্ন হলেও বডি আর্ট বিষয়টি এই পৃথিবীর কোনও একটি অঞ্চল কেন্দ্রিক নয়। বরং তা প্রতিটি মহাদেশের প্রতিটি এলাকায় নিজের নিজের মতো করে, নিজের নিজের কারণে, যুক্তিতে শুরু হয়েছিল। এই প্রসঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, বডি আর্টের বহু রকম ফের আছে- ট্যাটু, পিয়ার্সিং, বডি পেন্ট, মেহেন্দি, দেহের চামড়া পুড়িয়ে বিশেষ আকৃতি ও নকশা তৈরি করা, ক্ষতচিহ্ন ইত্যাদি। এরমধ্যে কোনটা চিরস্থায়ী, আবার কোনটা সপ্তাহখানেকের মধ্যেই দেহ থেকে উঠে যায়। এর মধ্যে অবশ্যই সবচেয়ে বেশি অবদান বা ভূমিকা উল্কি বা ট্যাটুর।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
