

কলকাতা টানা চার বছর দেশের নিরাপদতম মহানগর। প্রতীকী ছবি। গ্রাফিক্স- The Fourth Axis.
৮ই আগস্ট, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
রাত বারোটায় কলকাতার পার্ক স্ট্রিটে একা হাঁটা কোনও তরুণী, মুর্শিদাবাদের সীমান্তে জাল নথি নিয়ে ধৃত অনুপ্রবেশকারী, নদিয়ায় সাইবার প্রতারণার শিকার অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক, অথবা উত্তর ২৪ পরগনায় মাদক পাচার চক্রের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান— এই ঘটনাগুলির মধ্যে বাহ্যিক মিল নেই। কিন্তু প্রশাসনের কাছে এগুলি একই ছবির আলাদা আলাদা ফ্রেম। সেই ছবির নাম, বাংলার অপরাধচিত্র।
প্রতি বছর জাতীয় অপরাধ নথি ব্যুরো (NCRB) যে রিপোর্ট প্রকাশ করে, তা শুধু অপরাধের হিসাব নয়; আইনশৃঙ্খলা, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সমাজের পরিবর্তিত বাস্তবতারও এক আয়না। সেই আয়নায় পশ্চিমবঙ্গকে দেখলে এক অদ্ভুত দ্বৈততা ধরা পড়ে।
একদিকে কলকাতা টানা চার বছর দেশের নিরাপদতম মহানগর। ২০ লক্ষের বেশি জনসংখ্যার শহরগুলির মধ্যে প্রতি লক্ষে নথিভুক্ত অপরাধের হার মাত্র ৮৩.৯, যা দেশের মধ্যে সর্বনিম্ন! অন্যদিকে, একই সময়ে পশ্চিমবঙ্গ বিদেশি নাগরিকদের জড়িত অপরাধের সংখ্যায় দেশের শীর্ষে। ২০২৪ সালের তথ্য অনুযায়ী, এই ধরনের ৯৯২টি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। তদন্তকারীদের মতে, এর বড় অংশ সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধ, জাল নথি এবং অবৈধ অনুপ্রবেশের সঙ্গে যুক্ত। তাহলে কোন ছবিটা সত্যি? বাংলা কি নিরাপদ, নাকি উদ্বেগজনক? নাকি দুটোই সত্যি?
বাংলার আইনশৃঙ্খলা নিয়ে রাজনৈতিক সংঘাত নতুন নয়। বিধানসভা থেকে লোকসভা— প্রায় প্রতিটি নির্বাচনে এই ইস্যু ফিরে এসেছে।শাসকদলের বক্তব্য, রাজ্যে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কলকাতা পুলিশের সাফল্য, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, সিসিটিভি, মহিলা পুলিশ, সেফ সিটি প্রকল্প— এগুলিই তার প্রমাণ। বিরোধীদের বক্তব্য সম্পূর্ণ উল্টো। তাঁদের দাবি, নথিভুক্ত অপরাধ কম হওয়া মানেই অপরাধ কম হওয়া নয়। অনেক ক্ষেত্রেই অভিযোগ নথিভুক্ত হয় না, রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করে, অথবা ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করতেই সাহস পান না।
অপরাধবিদদের মতে, দু'পক্ষের দাবির মধ্যেই আংশিক সত্য রয়েছে। মনে রাখতে হবে, NCRB কোনও তদন্তকারী সংস্থা নয়। তারা গোটা দেশের পুলিশ বাহিনীর নথিভুক্ত মামলার তথ্য সংগ্রহ করে একটি জাতীয় রিপোর্ট তৈরি করে। অর্থাৎ যে অপরাধের FIR হয়েছে, সেটাই রিপোর্টে থাকবে।
FIR না হলে সেই ঘটনা পরিসংখ্যানে আসবে না। ফলে রিপোর্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটি 'Reported Crime', অর্থাৎ নথিভুক্ত অপরাধের ছবি। বাস্তবের সব অপরাধের নয়।
এই কারণেই অপরাধবিজ্ঞানীরা সব সময় দুটি সূচক একসঙ্গে দেখেন, Crime Rate এবং Reporting Behaviour। যে সমাজে অভিযোগ করার প্রবণতা বেশি, সেখানে অপরাধের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি দেখা যেতে পারে। আবার যেখানে অভিযোগই কম হয়, সেখানে অপরাধের হার কম দেখালেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন হতে পারে।
কলকাতা বহু বছর ধরেই দেশের অন্যতম কম অপরাধপ্রবণ মহানগর। কেন?
প্রাক্তন পুলিশকর্তাদের মতে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, শহরের ভৌগোলিক আয়তন তুলনামূলক ছোট। দ্বিতীয়ত, সিসিটিভি নজরদারিতে দেশের অন্যতম বিস্তৃত এলাকা। তৃতীয়ত, পুলিশের প্রতিক্রিয়ার সময় তুলনামূলক কম। চতুর্থত, গোয়েন্দা নজরদারি ও ডিজিটাল মনিটরিং আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। এই কারণেই কলকাতা ধারাবাহিকভাবে কম অপরাধের শহর হিসেবে উঠে এসেছে।
কিন্তু এখানেই আরেকটি প্রশ্ন ওঠে। যদি কলকাতা এতটাই নিরাপদ হয়, তাহলে আরজি কর কাণ্ডের মতো ঘটনা, কিংবা নারী নিরাপত্তা নিয়ে বিতর্ক কেন বারবার সামনে আসে? বিশেষজ্ঞদের মতে, এর সবচেয়ে বড় কারণ, অপরাধের চরিত্র বদলেছে ৷ বাংলায় অপরাধ মানেই একসময় ছিল—খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, রাহাজানি- আজ সেই তালিকা সম্পূর্ণ বদলে গেছে।
এখন পুলিশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ—সাইবার প্রতারণা, অনলাইন ব্যাঙ্ক জালিয়াতি, OTP প্রতারণা, ডিজিটাল অ্যারেস্ট প্রতারণা, ক্রিপ্টো প্রতারণা, ডার্ক ওয়েবের মাধ্যমে মাদক ব্যবসা, আন্তর্জাতিক প্রতারণা চক্র, জাল পরিচয়পত্র তৈরি, সীমান্ত ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ অপরাধ ! অর্থাৎ অপরাধ এখন আর শুধু বন্দুক বা ছুরি নিয়ে হয় না। একটি মোবাইল ফোনও এখন অপরাধের অস্ত্র।
পশ্চিমবঙ্গের ভৌগোলিক অবস্থান দেশের অন্য অনেক রাজ্যের থেকে আলাদা। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রায় ২,২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক সীমান্ত। এই সীমান্তই একদিকে ব্যবসা ও যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে।
অন্যদিকে—অবৈধ অনুপ্রবেশ, জাল নথি, মানবপাচার, মাদক, জাল নোট, আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র এসবের ঝুঁকিও বাড়ায়। NCRB-র তথ্য অনুযায়ী বিদেশি নাগরিকদের জড়িত অপরাধে পশ্চিমবঙ্গের অবস্থান সেই কারণেই তদন্তকারী সংস্থাগুলির কাছে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
একসময় অপরাধের মানচিত্রে কলকাতা ছিল কেন্দ্র। আজ পরিস্থিতি বদলেছে। সীমান্তবর্তী জেলা, শিল্পাঞ্চল, দ্রুত নগরায়ণ হওয়া এলাকা এবং ডিজিটাল প্রতারণার কেন্দ্রগুলি এখন পুলিশের নতুন মাথাব্যথা। অপরাধও আর জেলা বা রাজ্যের সীমানা মানে না। একটি গ্যাং বিহারে অপরাধ করে কলকাতায় আত্মগোপন করছে, আবার বাংলায় বসে অন্য রাজ্যের মানুষকে সাইবার প্রতারণার শিকার করছে— এই প্রবণতা বাড়ছে।
(চলবে)
আগামী পর্বে:
গুন্ডাদমন আইন কেন? আইনের ধারা, MCOCA-র সঙ্গে তুলনা, সুফল-কুফল, রাজনৈতিক বিতর্ক এবং পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলার ভবিষ্যৎ।
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
