১৩ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বিবর্তিত বডি আর্টের আধুনিক যুগ, ভারতীয় ধারা – পর্ব ৪ (শেষ)

বডি আর্টে ভারতীয় ধারা। ছবি - AI

বিবর্তিত বডি আর্টের আধুনিক যুগ, ভারতীয় ধারা – পর্ব ৪ (শেষ)

calender icon 2 ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

হাল আমলে ট্যাটু অনেক বেশি ফ্যাশন বা সৌন্দর্য প্রকাশের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ গোটা বিষয়টাই কিন্তু সেই বৃত্তসম্পন্ন হওয়ার মতো। প্রথম পর্বে আমরা শুরুই করেছিলাম নিজের দেহকে আকর্ষণের আধারে পরিণত করার আকুলতার কথা বলে। তার জন্য বিদ্যাপতির এক বিশেষ পদ উল্লেখ করা হয়েছিল।

আমরা আজ যেটাকে আমরা হাল ফ্যাশন বলছি সেটা কিন্তু অতীতেও প্রচলিত ছিল। নিশ্চয়ই অতীতে বডি আর্ট শুধুই নিজের দেহকে আকর্ষণীয় করতে বা সৌন্দর্যে প্রকাশ হিসেবে ব্যবহৃত হত না। তা সংস্কৃতি, ঐতিহ্য, ধর্মীয় বা কখনও শাস্তি মূলক কারনেও হত। কিন্তু একই সঙ্গে সেটি নিজেকে সাজিয়ে তোলার অংশ‌ও যে ছিল এই সত্যিটা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে আজকের দিনে এক শ্রেণির মানুষ ট্যাটু নিয়ে বেশি বিরূপ। তার কারণ কতগুলো সহজ হিসেব হঠাৎ করেই যেন গুলিয়ে গেছে। ভ্যাটিকান আজও ট্যাটুর তীব্র বিরোধী হলেও সময়ের জোয়ারে সেই নিষেধাজ্ঞাকে ভাসিয়ে দিয়ে অনেক ধর্মপ্রাণ কট্টর খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মানুষও নিজের দেহে ট্যাটু করছেন।

বিষয়টি কমবেশি সব ধর্মের ক্ষেত্রেই খাটে। এযাবৎকাল পর্যন্ত কোন‌ও ধর্মই মানব দেহে 'খোদার উপর খোদগারি' করাকে অনুমতি দেয় না। কিন্তু তবু দেখুন, ধর্মীয় শাখা-উপশাখার নামে সেই সুপ্রাচীনকাল থেকেই নানান ফর্মে বডি আর্ট প্রচলিত। আসলে কোন‌ও কিছু যখন ব্যক্তি বা জাতির অস্তিত্বের জানান দেওয়া এবং তার সত্ত্বার সঙ্গে মিশে যায়, তখন তার থেকে বড় কিছু আর হয় না। সেখানে ধর্মীয় নিয়ম, সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি তুচ্ছ হয়ে যায়।

শরীরের ট্যাটু করার বিপদ সম্পর্কে চিকিৎসকরা অনেক সময় কথা বলেছেন। অবশ্য বর্তমানে অনেক আধুনিক পদ্ধতি বেরিয়েছে। এই কলকাতা শহরেই শুধু নয়, জেলায় জেলায় আধুনিক ট্যাটু পার্লার খুলেছে। এটা একটা আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠেছে। তবু এই নিয়ে দুটি ভিন্ন মেরূ বা বিভাজন আজ বড় প্রকট। লিওনেল মেসি না ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, এই নিয়ে ফুটবল ভক্তরা পুরো আড়াড়ি বিভাজিত। কিন্তু আরও একটা বিরাট পার্থক্য এই দু'জনের মধ্যে দেখা যায়। লিওনেল মেসির গোটা দেহ জুড়ে ট্যাটু আছে। নিজের জীবনের প্রতিটি অর্জনের পর শরীরে একটি বিশেষ ট্যাটু করেন মেসি। এর মধ্যে সেই সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের স্পষ্ট ধারাবাহিকতা দেখতে পাবেন। অপরদিকে ফিটনেস এবং সুস্বাস্থ্যের বিশ্বজনীন ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হয়ে ওঠা ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর শরীরে ট্যাটুর একটি বিন্দু দেখা যাবে না।

সুস্বাস্থ্যের পক্ষে প্রচার চালানো লোকজন তাই রোনাল্ডোর ঔদ্ধত্য মেনে নিয়েও তাঁকেই উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। কারণ, রোনাল্ডো ট্যাটু নামক ক্ষতিকারক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে নিজের দেহকে নিয়ে যাননি। আসলে হয় কি, লিওনেল মেসির মতো বিশ্বজনীন আইকনরা যা করেন সেটাকে তাঁদের ভক্তদের এক বিরাট অংশ অনুসরণ করে। তবে এটাও ঠিক, ট্যাটুর যতই ক্ষতিকারক দিক থাক না কেন, তা আবহমানকাল ধরে হয়ে আসছে। হয়ত এর সঙ্গে লড়াই করতে মানবদেহ প্রস্তুত!

পরিশেষে ভারতীয় জনসমাজের সঙ্কীর্ণতার বেদনা

গড়পড়তা ভারতীয় পরিবারগুলোয় বডি আর্টের বিভিন্ন ধরনের যথেষ্ট মাত্রায় প্রচলন আছে। পরিবারের নারীদের নাক-কান ফোটানো, বিয়ে বা উৎসব অনুষ্ঠানের সময় মেহেন্দি করা, বিয়ের সময় দেহে কল্কা করা ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এগুলি যে বডি আর্টের অঙ্গ ও অংশ সেটা তাঁরা মানতেই চান না। উল্টে এনাদের একটা বড় অংশ আজও ট্যাটুকে চরম বিতৃষ্ণার দৃষ্টিতে দেখেন, তা নিয়ে চরিত্র কাটাছেঁড়া করার আসর বসান। এমনকি আদিবাসী সমাজের ঐতিহ্যবাহী ট্যাটুকেও এনারা ভালো চোখে দেখেন না। বরং এই ট্যাটুর মাধ্যমে কাউকে প্রান্তিক শ্রেণির বলে দেগে দেওয়ার প্রবণতা ব্যাপকভাবে দেখা যায়।

অবশ্য এর বিপ্রতীপে তরুণ ভারতীয় সমাজ ব্যাপকভাবে ট্যাটুর নেশায় মেতে উঠেছে। নিষ্পেষণ থাকলে একসময় তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধও কাজ করবে। আসলে ভারতীয় সমাজে বডি আর্টের এখন স্বীকৃতি ও ও অস্বীকৃতির আড়াআড়ি বিভাজন রেখায় ভেঙে গিয়েছে।

(শেষ)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

অন্যান্য