১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বডি আর্ট, বিশ্বজোড়া প্রাচীনতা – পর্ব ২

ঘড়ির কাঁটার দিকে- ভাইকিং, সাইবেরিয়ার পাজিরিক সংস্কৃতি, পলিনেশিয়া, আফ্রিকান প্রাচীন বডি আর্টের নিদর্শন। ছবি - AI

বডি আর্ট, বিশ্বজোড়া প্রাচীনতা – পর্ব ২

calender icon 2 ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

অনেকেই ট্যাটুকে আধুনিক পশ্চিমা সংস্কৃতির দান বলে ভেবে থাকেন। কিন্তু মানুষের চামড়ায় আঁকা এই চিরস্থায়ী শিল্পের ইতিহাস মোটেও নতুন নয়, বরং মানব সভ্যতার বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে এরও এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্য আছে। সময়ের সাথে সাথে ট্যাটুর অর্থ বদলেছে, উদ্দেশ্য বদলেছে, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত আবেদন রয়ে গেছে অমলিন।

কীভাবে উদ্ভব হল বডি আর্টের?

প্রাচীনকালে ট্যাটুর উদ্ভব খানিকটা আকস্মিকভাবেই হয়েছিল। হয়ত কেউ তার দেহের ছোট কোনও ক্ষতস্থানে দুর্ঘটনাবশত আগুনের ছাই বা কাঠকয়লা ঘষেছিল। ক্ষত শুকিয়ে যাওয়ার পর সেখানে একটি স্থায়ী দাগ তৈরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে ধারালো হাড়, গাছের কাঁটা বা কাঠের তৈরি চিরুনির মতো যন্ত্র দিয়ে চামড়া ছিদ্র করে তাতে কালি বা প্রাকৃতিক রং প্রবেশ করিয়ে বডি আর্ট বা ট্যাটু করার প্রথা শুরু হয়।

বডি আর্টের সবচেয়ে প্রাচীন ও সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৯১ সালে, ইতালি ও অস্ট্রিয়ার সীমান্তের কাছে আল্পস পর্বতমালার বরফে ঢাকা অঞ্চলে। সেখানে পাওয়া যায় 'ওটজি দ্য আইসম্যান' (Ötzi the Iceman)-এর সন্ধান। প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত মমি। গবেষকরা কার্বন ডেটিং করে দেখেছেন এই মমির বয়স প্রায় ৫,৩০০ বছর (৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ)। সম্পূর্ণ বরফ ঢাকা এলাকায় থাকায় এত বছর পরেও মমিটার দেহ প্রায় অক্ষত ছিল। গবেষকরা এই বরফমানবের শরীরে ৬১টিরও বেশি ট্যাটুর সন্ধান পান! যার মধ্যে ছিল বিন্দু এবং সরলরেখার নানা জ্যামিতিক নকশা। বিস্ময়কর ব্যাপার হল, এই ট্যাটুগুলো ফ্যাশনের জন্য নয়, বরং চিকিৎসা পদ্ধতির অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। গবেষকদের মতে, ওটজি সম্ভবত আর্থ্রাইটিস বা হাড়ের ব্যথায় ভুগছিলেন এবং আকুপাংচারের মতো তাঁর শরীরের ঠিক ব্যথার স্থানগুলোতেই ট্যাটুগুলো করা হয়েছিল।

প্রাচীন মিশরে তান্ত্রিক চর্চা এবং আধ্যাত্মিকতা

প্রাচীন মিশরে ট্যাটুর প্রচলন ছিল মূলত আধ্যাত্মিক এবং তন্ত্র ক্রিয়ার অংশ হিসেবে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ থেকে ২০০০ অব্দের (মানে আজ থেকে প্রায় চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার বছর আগের কথা) মিশরীয় মমির, বিশেষ করে মহিলাদের শরীরে ট্যাটুর প্রমাণ পাওয়া গেছে। দেইর এল-মদিনা থেকে উদ্ধার হওয়া মহিলাদের মমিগুলোর দেহে জটিল সব নকশা দেখা যায়। মিশরীয়রা বিশ্বাস করত, এই বডি আর্ট বা ট্যাটুগুলো তাদের দেবতাদের আশীর্বাদ পেতে সাহায্য করে। দেবী হাথরের সাথে সম্পর্কিত গরুর প্রতীক কিংবা সুরক্ষার জাদুকরী প্রতীক হিসেবে 'আই অফ হোরাস' (Eye of Horus) আঁকা হত। মূলত গর্ভাবস্থায় মায়েদের সুরক্ষা প্রদানে ঈশ্বরের আশীর্বাদ এবং উর্বরতার প্রতীক হিসেবেই এই বডি আর্টগুলো করা হত।

সাইবেরিয়ার পাজিরিক সংস্কৃতিতে মর্যাদা ও রহস্য

সাইবেরিয়ার আলতাই পর্বতমালায় আবিষ্কৃত পাজিরিক সংস্কৃতির মমিগুলোতেও দারুণ দারুণ ট্যাটুর দেখা মেলে, যেগুলোর প্রায় ২,৪০০ বছর পুরনো। এই মমিগুলোর শরীরে গ্রিফিন এবং নানা কাল্পনিক প্রাণীর ছবি খোদাই করা। গবেষকদের মতে, এই ট্যাটুগুলোর সাথে ম্যাজিক বা কালাযাদুর বিশ্বাস জড়িত ছিল। তাছাড়া, সে যুগে পাজিরিক সমাজে একজন ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি কতটা, তা নির্ধারণ করা হত তাঁর শরীরের ট্যাটুর নকশা ও বিস্তৃতি দেখে।

পলিনেশিয়ায় আত্মপরিচয়ের প্রতীক

বডি আর্টের ইতিহাসে পলিনেশীয় সংস্কৃতির অবদান অনস্বীকার্য। বস্তুত ইংরেজি 'Tattoo' শব্দটি এসেইছে সামোয়ান শব্দ 'টাটাও' (Tatau) থেকে, যার অর্থ 'কোন‌ও কিছু চিহ্নিত করা'। পলিনেশিয়া এবং নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠীর কাছে বডি আর্ট ছিল তাদের সামাজিক পরিচয় এবং ঐতিহ্যের সবচেয়ে বড় প্রমাণ। সেই ঐতিহ্য আজও মাওরিদের বহন করে চলতে দেখা যায়। সেখানে খুব অল্প বয়স থেকেই শরীরে ট্যাটু করা শুরু হত এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে তা বিস্তৃত হত। মাওরিদের বিখ্যাত মুখমণ্ডলের ট্যাটু বা 'মোকো' তাদের বংশপরিচয়, জীবনের বিভিন্ন অর্জন এবং যুদ্ধে বীরত্বের গল্প তুলে ধরে।

প্রাচীন চিন ও রোমে ট্যাটু পরিচয় ও শাস্তির চিহ্ন

সব জায়গায় যে বডি আর্টকে সম্মানের চোখে দেখা হত, তা কিন্তু নয়। প্রাচীন চিন, গ্রিস এবং রোমান সাম্রাজ্যে ট্যাটুর ব্যবহার ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। চিনে চুরি, ডাকাতি বা গুরুতর অপরাধের শাস্তি হিসেবে অপরাধীদের মুখে গরম লোহা বা সুচ দিয়ে ট্যাটু করে দেওয়া হত, যাতে বাকিরা সেই অপরাধীকে সহজেই চিনতে পারে। রোমান সাম্রাজ্যেও দাসদের শরীরে ট্যাটু করে মালিকের পরিচয় লিখে রাখার প্রথা ছিল। পরাজিত পক্ষের সৈন্যদের শরীরের এইভাবে ট্যাটু করা হত। অথচ খ্রিস্টান ধর্ম স্বীকৃতি পাওয়ার পর সেখানকার নাগরিকের মর্যাদা পাওয়া মানুষের শরীরে ট্যাটু করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেওয়া হয়। এর একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ভ্যাটিকান ট্যাটু করার সম্পূর্ণ বিপক্ষে। তারা মনে করে, এই দেহ ঈশ্বরের আশীর্বাদ। তাতে বাইরে থেকে কোনরকম কারিকুরি করার অর্থ হল ঈশ্বরের আশীর্বাদের অবমাননা করা।

আফ্রিকায় ট্যাটুর বিকল্পের নিষ্ঠুর প্রথা

বডি আর্ট নিয়ে আলোচনায় আফ্রিকার নাম উল্লেখ না করলে তা অপরাধ হবে। আফ্রিকার বেশিরভাগ আদিম জনগোষ্ঠী যুগের পর যুগ ধরে নিজেদের বংশ পরিচয়, আত্মমর্যাদা, পৌরুষত্বের প্রতীক এবং বীরত্বের চিহ্ন হিসেবে দেহে নানান ধরনের বডি আর্ট করে আসছে। আজকের দিনে আফ্রিকার বহু মানুষ শরীরে ট্যাটু করেন। কিন্তু ওনাদের দেহের গাঢ় রঙের কারণে স্বাভাবিকভাবেই ট্যাটু অতটা উদ্ভাসিত হয় না। বিষয়টি সেই প্রাচীনকালেই আফ্রিকার মানুষ জানত, বুঝত। তাই তারা বিকল্প পদ্ধতি হিসেবে দেহের চামড়া ফুঁড়ে উঁচু করে তুলে ধরে এক বিশেষ ধরনের বডি আর্ট করে থাকেন, যার ফলে দেহকে খানিকটা খোদাই করা মনে হয়। এটি চামড়ার একেবারে উপরের ত্বক ফুঁড়ে কালি ঢুকিয়ে দিয়ে যে ট্যাটু করা হয়, তার থেকে অনেক বেশি যন্ত্রণাদায়ক পদ্ধতি।

এছাড়াও জাপান, থাইল্যান্ড, স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলোর বডি আর্ট ও ট্যাটুর বৈশিষ্ট্য গভীর তাৎপর্য এবং অর্থ বহন করে। এই সকল দেশ ও সমাজে বডি আর্ট নিয়ে যে সুপ্রাচীন চর্চার ঐতিহ্য, যা ধারাবাহিকভাবে আজও চলে আসছে, সেগুলোকে অস্বীকার করা মানে এই আলোচনা অসম্পূর্ণ রাখা। স্ক্যান্ডেনেভিয়ান দেশগুলো অর্থাৎ সুইডেন, নরওয়ের মতো দেশে বডি আর্ট হিসেবে ট্যাটুর প্রচলন মূলত ভাইকিং দস্যুদের হাত ধরে। ফলে এখানে ট্যাটুর মধ্যে এক ধরনের উগ্রতা বা নৃশংসতা দেখা যায়। যদিও আজকের স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নাগরিকরা চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে এই বিশ্বের অন্যতম শান্ত-নম্র প্রকৃতির বলে পরিচিত। অর্থাৎ এক্ষেত্রে ট্যাটুর সঙ্গে ও ট্যাটুর মালিকের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সম্পূর্ণ ফারাক লক্ষ্য করা যায়। অপরদিকে থাইল্যান্ডে কিছুটা বিস্ময়করভাবে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এই বডি আর্ট শিল্পের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেখানে এটি হাল ফ্যাশনের বিষয়ের পাশাপাশি সুপ্রাচীন সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার বিষয়ও বটে।

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

অন্যান্য