

২০১০ সালের সেমিফাইনালে আলজেরিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিল মিশর। ছবি - Google.
২৩শে জুলাই, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
২০০৮ সালের কাপ জয় মিশরীয়দের চোখ ফিরিয়ে রেখেছিল ২০০৭-০৮ সালের আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মহামন্দা থেকে। আর ২০১০ সালের ট্রফি এসেছিল সুদানীয় শহর ওমদুরমানে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের উত্তেজনাপূর্ণ ও বিতর্কিত ম্যাচের পর। সেবার আলজেরীয় সমর্থকদের সহিংস হামলায় মিশরীয় ভক্ত ও খেলোয়াড়দের বাস ভাঙচুর করা হয়েছিল। মোবারক ও তার ছেলে আলা এই হিংসাত্মক ঘটনার তীব্র নিন্দা করলেও কাজের কাজ বা কূটনৈতিক স্তরে কোনো কঠোর পদক্ষেপ নেননি। কিন্তু ২০১০ সালের সেমিফাইনালে আলজেরিয়াকে ৪-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে যখন মিশর ফাইনালে ট্রফি জিতল, তখন সরকারের সেই দুর্বলতা ও ব্যর্থতা নিমেষেই সবাই ভুলে গেল।
পরপর তিনটি আফ্রিকান ট্রফিকে শাসক দল ‘ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি’ (এনডিপি)-র সাফল্য হিসেবে প্রচার করা হতে থাকে। অথচ মোবারকের শেষ দিনগুলোতে ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান আকাশ ছুঁয়েছিল, দুর্নীতির রথ ছিল লাগামহীন। দারিদ্র্য, মুদ্রাস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের হাঁসফাঁস অবস্থা তৈরি হয়েছিল।
সিরিয়ার হাফেজ আল-আসাদ যেমন তার ছেলে বাশারকে ক্ষমতার জন্য প্রস্তুত করেছিলেন, মোবারকও একইভাবে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও ক্যারিশমাহীন ছোট ছেলে গামালকে পরবর্তী রাষ্ট্রপতি করার ছক কষছিলেন। মিশরীয়দের মধ্যে এই নিয়ে চরম ক্ষোভ ছিল; তারা আর ৩০ বছরের দুর্নীতি ও স্বৈরাচার দেখতে চায়নি। কিন্তু গামালকে গ্রহণযোগ্য করতে এনডিপি সদস্য ও সাবেক গোলকিপার আহমেদ শোবেয়ারের মতো ব্যক্তিত্বদের দিয়ে মিডিয়া জুড়ে ফুটবল টকশো শুরু করা হয়। খেলা শুরুর তিন ঘণ্টা আগে থেকে শুরু করে মধ্যরাত পর্যন্ত চলে আসা এই অগভীর ফুটবল আলোচনার উদ্দেশ্যই ছিল তরুণদের মগজধোলাই করা ও রাজনীতি থেকে দূরে রাখা। এমনকি ২০১১ সালের বিপ্লবের সময় যখন মানুষ রাজপথে নেমে এসেছে, তখনো প্রাক্তন ফুটবল তারকাদের পাঠানো হয়েছিল জনগণকে ঘরে ফেরত যাওয়ার অনুরোধ জানাতে। তবে ততদিনে অনেক দেরি হয়ে গেছে; মিশরের মানুষ বুঝে গিয়েছিল যে এই ফুটবলের আফিম আর কাজ করছে না।
মিশরের ফুটবলের এই রাজনৈতিক ব্যবহার এক ভয়ঙ্কর রক্তাক্ত মোড় নেয় ২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। পোর্ট সাইদ স্টেডিয়ামে স্থানীয় ক্লাব 'আল-মাসরি' এবং কায়রোর বিখ্যাত ক্লাব 'আল-আহলি'র মধ্যে ফুটবল ম্যাচ ছিল। আল-আহলি কেবল মিশর নয়, পুরো আফ্রিকার অন্যতম সফল ক্লাব। আর অন্যদিকে পোর্ট সাইদের মানুষের কাছে 'আল-মাসরি' কেবল একটি ক্লাব নয়, তাদের আঞ্চলিক প্রতিরোধ ও জাতীয়তাবাদের প্রতীক।
ম্যাচটি টিভিতে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সবাইকে অবাক করে দিয়ে হোম টিম 'আল-মাসরি' ৩-১ গোলে ঐতিহাসিক জয় পায়। কিন্তু খেলার বাঁশি বাজার সাথে সাথেই যে দৃশ্য ফুটে উঠল, তা কোনো খেলার মাঠের দৃশ্য ছিল না; তা ছিল এক নরককুণ্ড। লাঠি, রড ও ছুরি হাতে আল-মাসরি সমর্থকরা পিচ আক্রমণ করে। আল-আহলি খেলোয়াড়রা প্রাণ ভয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে দৌড়াতে থাকে। এরপরই শুরু হয় দর্শকা গ্যালারিতে থাকা আল-আহলি সমর্থকদের ওপর নৃশংস হামলা।
হঠাৎ করে স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইটগুলো নিভিয়ে দেওয়া হয়। অন্ধকার ও অন্ধ সহিংসতার মাঝে ৭৪ জন আল-আহলি সমর্থক প্রাণ হারান এবং শত শত মানুষ আহত হন। মাঠের সেই রক্তগঙ্গা ছড়িয়ে পড়েছিল সফরকারী দলের ড্রেসিংরুম পর্যন্ত, যেখানে রক্তাক্ত তরুণরা খেলোয়াড়দের চোখের সামনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে।
(চলবে)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।