

১৯৩৪-এর বিশ্বকাপ উঠল ইতালির ঘরে। ছবি - Google.
৫ই জুলাই, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
মুসোলিনির চোখের সামনে নিজের মাটিতে ইতালি পিছিয়ে পড়েছে—এই দৃশ্য দেখে পুরো স্টেডিয়ামে যেন এক শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। গ্যালারিতে বসা ব্ল্যাকশার্টসদের হাতের মুঠো শক্ত হয়ে উঠল। ইতালির খেলোয়াড়রা একে অপরের মুখের দিকে তাকাচ্ছিলেন। তাদের চোখে তখন ভেসে উঠছিল সেই চিলিং বার্তা—"ভিনচেরে ও মোরিরে"। হারলে তাদের জীবনে কী নেমে আসবে, সেই ভয়ে তাদের পা কাঁপছিল।
কিন্তু মানুষের পিঠ যখন দেওয়ালে ঠেকে যায়, তখন সে তার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করে। গোল খাওয়ার পর ইতালির খেলোয়াড়দের মধ্যে এক পৈশাচিক হিংস্রতা আর উন্মাদনা দেখা দিল। তারা মরিয়া হয়ে আক্রমণ করতে লাগল। খেলার আর মাত্র ১০ মিনিট বাকি, ঠিক এমন সময় ইতালির রাইমোন্দো ওরসি এক অবিশ্বাস্য শটে গোল করে সমতা ফিরিয়ে আনলেন। পুরো স্টেডিয়াম যেন এক আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে পড়ল।
নির্ধারিত ৯০ মিনিটে খেলা ১-১ গোলে শেষ হলে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। দর্শকদের পায়ের দাপাদাপিতে মনে হচ্ছিল স্টেডিয়ামের কংক্রিটের গ্যালারিগুলো এখনই ভেঙে পড়বে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে মাঠের চারপাশে পুলিশের কর্ডন তৈরি করতে হয়েছিল। অতিরিক্ত সময়ের ঠিক শুরুর দিকে ইতালির স্ট্রাইকার অ্যাঞ্জেলো স্কিয়াভিও চেকোস্লোভাকিয়ার বক্সের মধ্যে বল পেয়ে ডান পায়ের এক প্রচণ্ড শট নিলেন। বলটি এত জোরে জালের ভেতরে ঢুকেছিল যে, চেকোস্লোভাক গোলরক্ষক প্লানিচকা ধাক্কা খেয়ে মাটিতে পড়ে যান।
২-১! ইতালি এগিয়ে গেল। বাকি সময়টুকু বুক দিয়ে বল ঠেকিয়ে রাখলেন ইতালির ডিফেন্ডাররা। যখন রেফারির শেষ বাঁশি বাজল, তখন মাঠের খেলোয়াড়রা আনন্দে কাঁদার চেয়ে যেন স্বস্তির এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারা বেঁচে গেছেন। তারা মুসোলিনির দেওয়া মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই পেয়েছেন।
খেলা শেষে পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানটি ছিল দেখার মতো। ফিফার অফিশিয়াল ট্রফি 'জুল রিমে'-র পাশাপাশি মুসোলিনি মঞ্চে নিয়ে এলেন নিজের তৈরি এক বিশেষ ট্রফি—'কোপ্পা দেল দুচে' (Coppa del Duce)। ব্রোঞ্জ আর সোনার তৈরি সেই ট্রফিটি আকারে অফিশিয়াল বিশ্বকাপের চেয়ে অন্তত চারগুণ বড় ছিল। এতটাই বড় যে, চারজন মানুষকে ধরাধরি করে সেটি মাঠে নিয়ে আসতে হয়েছিল।
ইতালির অধিনায়ক যখন সেই ট্রফিটি নিচ্ছেন, তখন আজ্জুরিদের বাধ্য করা হয়েছিল পোডিয়ামে দাঁড়িয়ে দর্শকদের দিকে হাত তুলে ফ্যাসিস্ট স্যালুট জানাতে। পরদিনের ইতালীয় সংবাদপত্রগুলো ফুটবলের চেয়ে বেশি প্রশংসা করল মুসোলিনির 'দূরদর্শিতা' আর 'ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির শ্রেষ্ঠত্ব'-র। ফুটবলাররা যে রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে মাঠে জিতেছেন, সেই কৃতিত্বকে এক নিমেষে গ্রাস করে নিল একনায়কের অহংকার।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যখন আমরা ১৯৩৪ সালের সেই বিশ্বকাপের দিকে তাকাই, তখন ফুটবল খেলার চেয়ে এক রাজকীয় ট্র্যাজেডির কথাই বেশি মনে পড়ে। ইতালি দল হিসেবে দুর্দান্ত ছিল, তাদের কোচ পোজো একজন ট্যাকটিক্যাল জিনিয়াস ছিলেন—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু তাদের সেই জয়কে চিরকালের জন্য কলঙ্কিত করে রেখে গেছে ফ্যাসিবাদের কালো হাত।
ক্রীড়াজগতকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রাখার যে আপ্তবাক্য আমরা প্রতিনিয়ত শুনি, ১৯৩৪ সালের ১০ই জুনের রোমের সেই বিকেল প্রমাণ করেছিল—একনায়কদের কাছে মানুষের আবেগ, ভালোবাসা আর সততা কতটা সস্তা হতে পারে। ফুটবলাররা সেদিন জিতেছিলেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের সেই সবুজ ঘাসের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল স্পোর্টসম্যানশিপের মূল চেতনা। ইতিহাসের পাতায় ১৯৩৪ সালের বিশ্বকাপ তাই কেবল ইতালির প্রথম বিজয়ের গল্প নয়, এটি একটি চিরন্তন সতর্কবার্তা—খেলা যখন স্বৈরাচারের দাসত্ব করতে বাধ্য হয়, তখন ট্রফির চকমকে আলোর চেয়ে তার পেছনের অন্ধকারটাই বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
(শেষ)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।