

বর্ষার এই ভাইরাস রাজ্যের সীমানা মানে না। ছবি - Google, গ্রাফিক্স - The Fourth Axis.
৪ঠা আগস্ট, ২০২৬
গুজরাটে ২২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাস্থল পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রায় দু'হাজার কিলোমিটার দূরে। তাহলে এই খবর বাংলার মানুষ পড়বেন কেন? কারণ, সংক্রামক রোগ কখনও রাজ্যের সীমানা মেনে চলে না। ২০২০ সালের কোভিড মহামারি থেকে শুরু করে নিপা, জিকা কিংবা সাম্প্রতিক বিভিন্ন ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব- প্রতিটি ঘটনাই শিখিয়েছে, একটি রাজ্যের স্বাস্থ্য-সঙ্কট খুব দ্রুত জাতীয় উদ্বেগে পরিণত হতে পারে। তাই গুজরাটে চণ্ডীপুরা ভাইরাসের থাবা কেবল একটি রাজ্যের খবর নয়, বরং গোটা দেশের জন্য একটি 'পাবলিক হেলথ অ্যালার্ট'।
বর্ষার মরশুমে যখন ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের আশঙ্কা বাড়ে, তখন নীরবে মাথাচাড়া দেয় আরও এক বিরল কিন্তু মারাত্মক ভাইরাস - চণ্ডীপুরা ভাইরাস (Chandipura Virus বা CHPV)। শিশুদের ক্ষেত্রে এই ভাইরাস এতটাই দ্রুত আঘাত হানতে পারে যে, অনেক সময় জ্বর শুরু হওয়ার ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক হয়ে ওঠে।
গুজরাট সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বর্ষায় অন্তত ২২ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে এই ভাইরাসে। সংক্রমণের সন্দেহভাজন সংখ্যা ১৮৪। আক্রান্তদের প্রত্যেকের বয়স ১৫ বছরের কম। সাতজন এখনও সংকটজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আরও ১১ জনের পরীক্ষার রিপোর্ট আসা বাকি।
এই পরিসংখ্যানই স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। কারণ, আক্রান্তদের প্রায় সকলেই শিশু এবং রোগটির বিরুদ্ধে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা অনুমোদিত ভ্যাকসিন নেই।
অনেকেরই প্রশ্ন হতে পারে, গুজরাটের ভাইরাস নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ কেন চিন্তা করবেন? উত্তরটা লুকিয়ে রয়েছে জলবায়ু এবং সংক্রামক রোগের প্রকৃতিতে।
চণ্ডীপুরা ভাইরাস মূলত বর্ষাকালে সক্রিয় হয়। পশ্চিমবঙ্গেও এই সময় আর্দ্রতা বাড়ে, বিভিন্ন ধরনের পতঙ্গের বংশবৃদ্ধি হয়, গ্রামীণ এলাকায় কাঁচা বাড়ি, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ এবং অপর্যাপ্ত নিকাশি ব্যবস্থা বহু জায়গায় এখনও বাস্তবতা। ফলে ভাইরাসের বাহক পতঙ্গের বংশবিস্তার হওয়ার পরিবেশ অনেক ক্ষেত্রেই অনুকূল হতে পারে।
অবশ্যই এর অর্থ এই নয় যে পশ্চিমবঙ্গে বড়সড় সংক্রমণ শুরু হয়েছে বা হবেই। এমন কোনও তথ্য বর্তমানে নেই। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এক রাজ্যে এমন প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে অন্য রাজ্যগুলিরও নজরদারি, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ এবং জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে প্রস্তুতিই সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা।
চণ্ডীপুরা ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৬৫ সালে মহারাষ্ট্রের নাগপুর জেলার চণ্ডীপুরা গ্রামে। সেই গ্রামের নাম থেকেই ভাইরাসটির নামকরণ। এটি র্যাবডোভিরিডি (Rhabdoviridae) পরিবারের একটি ভাইরাস।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হল, এটি শরীরে প্রবেশ করার পর অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে প্রদাহ (Acute Encephalitis Syndrome) সৃষ্টি করতে পারে। তাই সাধারণ ভাইরাল জ্বর ভেবে অবহেলা করলে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
এই ভাইরাসের প্রধান বাহক বেলেমাছি (Sandfly)। কিছু গবেষণায় মশা ও অন্যান্য পতঙ্গের ভূমিকাও উল্লেখ করা হয়েছে, তবে প্রধান সংক্রমণকারী হিসেবে বেলেমাছিকেই ধরা হয়। বর্ষার সময় জমে থাকা নোংরা পরিবেশ, কাঁচা বাড়ির ফাটল, পশুপালনের আশপাশ এবং স্যাঁতসেঁতে এলাকা বেলেমাছির বংশবিস্তারের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এখনও সম্পূর্ণ পরিণত হয় না। তার উপর এই ভাইরাস অত্যন্ত দ্রুত স্নায়ুতন্ত্রে আঘাত হানতে পারে। ফলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খিঁচুনি, অচেতন হয়ে যাওয়া বা মস্তিষ্কের জটিলতা দেখা দিতে পারে। তাই চিকিৎসকদের পরামর্শ, শিশুদের জ্বরের সঙ্গে বমি, তীব্র মাথাব্যথা বা খিঁচুনি দেখা দিলে সেটিকে কখনও সাধারণ ভাইরাল জ্বর বলে ধরে নেওয়া উচিত নয়।
হঠাৎ ১০২-১০৪ ডিগ্রি জ্বর, তীব্র মাথাব্যথা, বারবার বমি, খিঁচুনি, ঘুমঘুম ভাব, অস্বাভাবিক আচরণ, জ্ঞান হারিয়ে ফেলা৷ এই লক্ষণগুলির এক বা একাধিক দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, চণ্ডীপুরা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও কোনও নির্দিষ্ট ওষুধ বা ভ্যাকসিন নেই। চিকিৎসকরা মূলত রোগীর শ্বাসপ্রশ্বাস সচল রাখা, খিঁচুনি নিয়ন্ত্রণ, মস্তিষ্কের জটিলতা কমানো এবং আইসিইউ-তে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে চিকিৎসা করেন।
এই কারণেই গুজরাট সরকার সব সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালকে নির্দেশ দিয়েছে, সন্দেহভাজন রোগীদের দ্রুত অক্সিজেন ও ভেন্টিলেশন-সমৃদ্ধ আইসিইউ-তে ভর্তি করতে হবে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে প্রতিরোধই একমাত্র উপায়। শিশুদের পূর্ণহাতা জামা পরান। সন্ধ্যার পর বাইরে খেলাধুলা কম করুন।
মশারি ব্যবহার করুন। বাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখুন। কীটনাশক স্প্রে করুন। কাঁচা বাড়ির ফাটল মেরামত করুন। জ্বরকে অবহেলা করবেন না।
কোভিড আমাদের শিখিয়েছে, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে দূরত্ব কোনও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। তাই গুজরাটের চণ্ডীপুরা ভাইরাসের এই প্রাদুর্ভাবকে শুধুমাত্র একটি রাজ্যের সমস্যা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে ভারতের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার সামনে নতুন সতর্কবার্তা, বিরল ভাইরাসগুলিকেও আর হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আজ গুজরাটের হাসপাতালগুলিতে যে লড়াই চলছে, তা পশ্চিমবঙ্গ-সহ গোটা দেশের জন্য একটি শিক্ষা- সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার পর নয়, তার আগেই সতর্ক হওয়াই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
