১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
বিধবার প্রেমে পাগল রাজার ভুলে মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে রাজদরবার!

রাজা রানা বাহাদুর শাহ'র তৈলচিত্র। ছবি - Google

বিধবার প্রেমে পাগল রাজার ভুলে মৃত্যুপুরী হয়ে ওঠে রাজদরবার!

calender icon 2 ১১ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

মূল বিষয়

ইতিহাস মানে শুধু সাম্রাজ্য বিস্তারের কাহিনী আর যুদ্ধ নয়। বরং তার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জড়িয়ে আছে অন্ধ প্রেমের ভয়ঙ্কর সব পরিণতির কাহিনী। সিংহাসনের মোহ আর প্রেমের নেশা বহু পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যের‌ও পতন ডেকে এনেছে। ঠিক এমনই এক রক্তক্ষয়ী অধ্যায়ের ইতিহাস বুকে করে নিয়ে বেড়াচ্ছে হিমালয়ের কোলে থাকা নেপালের শাহ রাজবংশের ইতিহাস।

গোর্খা সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা পৃথ্বীনারায়ণ শাহের নাতি রানা বাহাদুর শাহ তখন নেপালের সিংহাসনে। তিনি এক সুবিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি। তাঁর অঙ্গুলিহেলনে গোটা রাজদরবার নিয়ন্ত্রিত হয়। কিন্তু সেই পরাক্রমশালী রাজা হঠাৎ করেই এমন এক সিদ্ধান্ত নেন, যা গোটা নেপালের ইতিহাসকে এক অন্ধকার মৃত্যুপুরীতে পরিণত করেছিল। আর এই সবকিছুর নেপথ্যে ছিল এক বিধবা নারীর প্রতি রাজার অন্ধ প্রেম।

পশুপতিনাথ মন্দিরে শুরু

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষভাগের কথা। তৎকালীন নেপালি হিন্দু সমাজ ছিল অত্যন্ত রক্ষণশীল। সেখানে একজন রাজপুত বা ঠাকুরি বংশের রাজার পক্ষে এক ব্রাহ্মণ বিধবাকে বিয়ে করা ছিল ঘোরতর পাপ, কার্যত ধর্ম বিরোধী আচরণ। পুরোহিতদের মতে এটি ছিল চরম অসামাজিক কাজ। কিন্তু প্রেমে পাগল রাজার কাছে নিয়মকানুনের কোনও মূল্য ছিল না।

এই অন্ধ প্রেম পর্বের সূচনা হয়েছিল বিখ্যাত পশুপতিনাথ মন্দিরে। শিবরাত্রি উপলক্ষে মহা ধুমধাম করে অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় কাঠমান্ডুর পশুপতিনাথ মন্দিরে। সেই সময়‌ই সেখানে তীর্থ করতে এসেছিলেন মৈথিলি ব্রাহ্মণ বিধবা কান্তাবতী ঝা। তাঁকে দেখেই রাজা প্রেমে, কামনায় আত্মহারা হয়ে পড়েন। ঐতিহাসিকদের মতে, কান্তাবতী প্রথমে রাজার প্রেম প্রস্তাব সরাসরি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি খুব ভালো করেই জানতেন এই অসম সম্পর্কের পরিণতি কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

সিংহাসনের বিনিময়ে প্রেমের অদ্ভুত শর্ত

কিন্তু রাজা রানা বাহাদুর শাহ ছিলেন নাছোড়বান্দা। শেষপর্যন্ত বিয়ের ক্ষেত্রে কান্তাবতী এক অদ্ভুত শর্ত জুড়ে দেন। তিনি রাজাকে বলেন, তাঁদের মিলনের ফলে যদি পুত্র সন্তান হয়, তবে তাকেই নেপালের পরবর্তী রাজা করতে হবে। এদিকে ততদিনে দ্বিতীয় রানির গর্ভে রাজার জ্যেষ্ঠ পুত্র রণোদ্যোত শাহ জন্ম নিয়ে নিয়েছে। যিনি ছিলেন সিংহাসনের বৈধ উত্তরাধিকারী। ফলে কান্তাবতীর এই শর্ত মেনে নেওয়া মানে হল রাষ্ট্রের প্রচলিত নিয়ম এবং শাহ রাজ বংশের বংশানুক্রমিক উত্তরাধিকারের অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখানো।

কিন্তু রানা বাহাদুর শাহ তখন বোধহয় নিজের মধ্যে ছিলেন না। প্রেম ও কামনার তদনায় হয়ে পড়েন। তিনি রাজদরবারের সমস্ত মন্ত্রী এবং অভিজাতদের প্রবল আপত্তিকে তুচ্ছ করে যাবতীয় শর্ত মেনে নিয়ে কান্তাবতীকে বিয়ে করেন। ১৭৯৭ সালে কান্তাবতীর গর্ভে জন্ম হয় পুত্র গির্ভাণ যুদ্ধ বিক্রম শাহের। ঠিক এখান থেকেই শাহ পরিবারে প্রবল বিবাদ ও বিভেদের সূচনা হয়।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে নেপালের শাহ রাজপরিবার দুটি শিবিরে আড়াআড়ি ভাগ হয়ে যায়। প্রাসাদের আনাচেকানাচে শুরু হয় একে অপরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের বীজ বপন।

রানির মৃত্যু ও উন্মাদ রাজার ক্রোধ

পুত্র গির্ভাণ যুদ্ধ বিক্রম শাহের জন্মের আনন্দ রাজপরিবারে বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। এর কিছুদিনের মধ্যেই কান্তাবতী যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। প্রিয় রানিকে সুস্থ করে তোলার জন্য রাজা রানা বাহাদুর শাহ রাজকোষ উজাড় করে দেন। নেপালের সমস্ত মন্দিরে বিপুল অর্থ খরচ করে রানির সুস্থতা কামনায় শুরু হয় বিশেষ স্তোত্রপাঠ ও পুজো। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই তাতে লাভের লাভ কিছু হয়নি। সন্তান জন্ম দেওয়ার বছর দু'য়েকের মধ্যে যক্ষায় আক্রান্ত হয়ে রানি কান্তাবতীর মৃত্যু হয়।

আরও পড়ুন
সেক্সের নেশায় রানি থেকে সিরিয়াল কিলার!
বিয়ে নিয়ে প্রতারণা করে ধ্বংস হয়েছিল গৌতম বুদ্ধর পরিবার!
বৌদ্ধ না হলে মানুষ নয়! বুদ্ধের নামে শ্রীলঙ্কায় মৌলবাদীদের তাণ্ডব
একই মণ্ডপে চার বোনের গলায় মালা! ভুটানরাজের সাড়া ফেলা বিয়ে

প্রিয় রানির এই অকালমৃত্যু রাজা রানা বাহাদুর শাহ'কে সম্পূর্ণ উন্মাদ করে তোলে। তিনি হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। যাবতীয় ক্ষোভ গিয়ে পড়ে মন্দির, সেখানকার দেবমূর্তি এবং পুরোহিতদের উপর। তাঁর নির্দেশে মন্দিরের পবিত্র দেবমূর্তি ভাঙচুর করা হয়। চরম শাস্তি দেওয়া হয় রাজবৈদ্যদের। স্বাভাবিকভাবেই এই ঘটনা নেপালের অভিজাতদের পাশাপাশি ধর্মভীরু সাধারণ প্রজাদের‌ও রাজার প্রতি ব্যাপক ক্ষুব্ধ করে তুলেছিল।

এদিকে কান্তাবতীকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রাখতে রাজা নিজের বৈধ জ্যেষ্ঠ পুত্র রণোদ্যোতকে উত্তরাধিকারের অধিকার থেকে বঞ্চিত করেন। উল্টে মাত্র দেড় বছর বয়সী শিশু গির্ভাণকে রাজা ঘোষণা করেন তিনি। এরপর শোকে, বিরহে রাজকার্য ত্যাগ করে বারাণসীতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যান।

রানা বাহাদুর শাহের প্রত্যাবর্তনে রক্তক্ষয়ী পরিণতি

বারাণসীতে প্রায় বছর দেড়েক কাটানোর পর আবার কাঠমান্ডু প্রত্যাবর্ত নিয়ে সিদ্ধান্ত নেন সিংহাসন ত্যাগী রানা বাহাদুর শাহ। ফিরে এসে তিনি নিজের সন্তানের অর্থ শিশু রাজার "মুখতিয়ার" বা রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসনভার হাতে তুলে নেন। এটি কার্যত প্রধানমন্ত্রীর পদ ছিল।

এরপরই নেপাল রাজদরবার আক্ষরিক অর্থেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠতে শুরু করে। রাজার খামখেয়ালি ও স্বৈরাচারী সিদ্ধান্তে দামোদর পাণ্ডের মতো দক্ষ মন্ত্রী থেকে শুরু করে একের পর এক সেনাপতি প্রাণ হারাতে থাকেন। গোটা দরবারে তৈরি হয় এক চরম ভয়ের রাজত্ব।

এক রাতেই মৃত্যুপুরী হয়ে উঠল রাজদরবার

১৮০৬ সালের ২৫ এপ্রিল। সেই রাতের মর্মান্তিক ঘটনা নেপালের ইতিহাসকে চিরতরে কলঙ্কিত করে দেয়। রাজদরবারে এক ভয়াবহ বাদানুবাদের সময় রাজা তাঁর সৎ ভাই শের বাহাদুর শাহকে অন্ধ করে দেওয়ার বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আদেশ দেন (ঠিক কোন নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ আছে)। এদিকে জীবন সংশয় দেখে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন শের বাহাদুর। নিজের তলোয়ার বের করেন। সবার চোখের সামনে তিনি প্রবল প্রতাপশালী প্রাক্তন রাজা তথা তৎকালীন শিশু রাজার রাজপ্রতিনিধি রানা বাহাদুর শাকে কুপিয়ে হত্যা করেন। মাত্র ৩১ বছর বয়সে এই মহা বিতর্কিত রাজার মৃত্যু হয়। তাই দেখে চোখের নিমেষে রাজার দেহরক্ষী বাল নরসিং কুনওয়ার শের বাহাদুরকে হত্যা করেন।

এই চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগ নিয়ে অতি প্রভাবশালী মন্ত্রী ভীমসেন থাপা রাজদরবারের সমস্ত বিরোধীদের নির্মমভাবে হত্যা করেন। শুরু হয় এক নতুন স্বৈরাচারের রক্তক্ষয়ী যুগ।

ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

ইতিহাস যেন কোন‌ও এক অমোঘ নিয়মে বারবার ফিরে ফিরে আসে। রানা বাহাদুর শাহের সেই অন্ধ প্রেম এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ম ভাঙার বিপুল খেসারত শাহ রাজবংশকে দীর্ঘদিন চোকাতে হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা ও গৃহবিবাদ শুরু হয় তারই পথ ধরে কয়েক দশক পর ১৮৪৬ সালে ঘটে কুখ্যাত কোট হত্যাকাণ্ড। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল, রানা বাহাদুর শাহের সেই অন্ধ প্রেমের অভিশাপ যেন দীর্ঘ সময় পর একুশ শতকেও শাহ পরিবারকে তাড়া করে বেরিয়েছে।

২০০১ সালে নেপালের রাজপরিবারে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যেও ছিল সেই প্রেম এবং সিংহাসনের দ্বন্দ্ব। যুবরাজ দীপেন্দ্র এবং দেবযানী রানার প্রেমকে কেন্দ্র করে রাজপরিবারে যে কলহ শুরু হয়েছিল, তার পরিণতিতে রাজা বীরেন্দ্র সহ গোটা রাজপরিবার নিমেষে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ঠিক যেমনটা ঘটেছিল রানা বাহাদুর শাহের আমলে।

দেখা গিয়েছে, প্রেমের কাছে সামাজিক নিয়মের পরাজয় এবং তার পরিণতিতে বারবার নেপালের রাজসিংহাসন ঘিরে রক্তের হোলি খেলা হয়েছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
কৌস্তভ ভৌমিক
কৌস্তভ ভৌমিক

কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য