

দেবী সিংয়ের অত্যাচারের প্রতীকী ছবি - AI
৯ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সময়টা অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ। বাংলার বুকে তখনও ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের দগদগে ঘা শুকোয়নি। কিন্তু সেই ক্ষতের চেয়েও ভয়াবহ হয়ে উঠেছিল ইজারাদার দেবী সিংয়ের আতঙ্ক। তার বাহিনীর বিকৃত যৌন লালসায় ট্রাই ট্রাই রব পড়ে গিয়েছিল বঙ্গের এক বিপুল অংশের পুরুষ থেকে মহিলা সকলের মধ্যে।
কর আদায়ের নামে উত্তরবঙ্গের কৃষক রমণীদের উপর এমন পৈশাচিক যৌন সহিংসতা করা হত যা সভ্য সমাজের কল্পনারও অতীত। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের ওয়েস্টমিনস্টার হলে দাঁড়িয়ে প্রখ্যাত বাগ্মী ব্রিটিশ এমপি এডমন্ড বার্ক যখন সেই অত্যাচারের পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন গ্যালারিতে বসা অভিজাত মহিলারা শিউরে উঠেছিলেন। ব্রিটিশ নাট্যকার শেরিডানের স্ত্রী সভাকক্ষেই জ্ঞান হারিয়ে লুটিয়ে পড়েন। আরও অনেকেই বমির উদ্রেক হওয়ায় রুমাল মুখে চেপে ছুটে বেরিয়ে যান।
বাংলার ইতিহাসের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের মূল খলনায়ক ছিলেন মুর্শিদাবাদের দেবী সিং।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ সুপ্রকাশ রায় তাঁর 'ভারতের কৃষক বিদ্রোহ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম' গ্রন্থে এবং ইংরেজ আধিকারিক জে ডি প্যাটারসনের রিপোর্টে দেবী সিং ও তার বাহিনীর গা শিউরে ওঠা পৈশাচিকতার বিস্তারিত বিবরণ মেলে।
রাজস্ব দিতে না পারলে শুধু পুরুষদের নয়, বাড়ির মহিলাদেরও প্রকাশ্য দিবালোকে টেনে হিঁচড়ে বাইরে আনা হত। তারপর সবার সামনে তাদের সম্পূর্ণ বিবস্ত্র করত! এরপর দেবী সিংয়ের পেয়াদারা নারীদের যৌনাঙ্গে লঙ্কার গুঁড়ো বা জ্বলন্ত ছাই ঢুকিয়ে দিত। অনেক ক্ষেত্রে ধারালো অস্ত্র দিয়ে স্তন কেটে নেওয়ার মতো বীভৎস কাজ করত তারা। এদিকে কর দিতে না পারলে পুরুষ কৃষকদের আঙুলের মধ্যে চামড়ার দড়ি পেঁচিয়ে এমনভাবে টানত, যে আঙুলটাই হাত থেকে কেটে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত!
সম্ভ্রম আর সম্মান বাঁচাতে তৎকালীন দিনাজপুর, রংপুর এলাকার বহু কৃষক পরিবারের কর্তারা নিজেদের স্ত্রী ও শিশুকন্যাদের সামান্য কয়েক টাকায় দাসী হিসেবে বিক্রি করে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কর আদায়ের নামে এই বিকৃত যৌন উল্লাস আদতে ছিল এক চরম স্যাডিস্টিক বা মানসিক বিকারগ্রস্ত মানুষের ক্ষমতার আস্ফালন।
কিন্তু কে ছিল এই দেবী সিং? কীভাবে তিনি এত ক্ষমতার অধিকারী হলেন? দেবী সিংয়ের পৈতৃক ভিটে ছিল পানিপথে। সেখান থেকে ভাগ্যান্বেষণে তিনি মুর্শিদাবাদে এসে পৌঁছান। অত্যন্ত ধূর্ত এই মানুষটি শুরুতে রেজা খানের অধীনে কাজ করতেন। ধীরে ধীরে তিনি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের সুনজরে পড়েন।
সেই সময় গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস যে কোনও মূল্যে কোম্পানির কোষাগার ভরাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন। সেই সুযোগটাই ষোলো আনা কাজে লাগায় দেবী সিং। কোম্পানির কর্তাদের বিপুল অঙ্কের ঘুষ আর উপঢৌকন দিয়ে তিনি ১৭৮১ সালে রংপুর, দিনাজপুর এবং এদ্রাকপুরের ইজারাদারি বা কর আদায়ের একচেটিয়া অধিকার আদায় করেন। হেস্টিংসের প্রচ্ছন্ন মদত থাকায় দেবী সিং কার্যত ওই বিস্তীর্ণ অঞ্চলের একচ্ছত্র অধিপতি হয়ে ওঠেন। তার নির্দেশেই গোটা উত্তরবঙ্গ জুড়ে শুরু হয় ইতিহাসের জঘন্যতম নারী নির্যাতন ও লুঠতরাজ।
দেবী সিংয়ের এই অত্যাচারে দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল এখানকার সাধারণ কৃষকদের। তারই পরিণামে ১৭৮৩ সালে উত্তরবঙ্গের মাটিতে জ্বলে ওঠে এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহের আগুন। যা রংপুর বিদ্রোহ নামে পরিচিত।
প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নরহরি কবিরাজ এবং রণজিৎ গুহ তাঁদের গবেষণায় দেখিয়েছেন, এই বিদ্রোহ শুধু কৃষকদের বেঁচে থাকার লড়াই ছিল না। এটি ছিল হিন্দু ও মুসলমানের এক অভূতপূর্ব ঐক্যের দলিল। স্থানীয় মুসলমান নেতা নুরুলুদ্দিনকে কৃষকরা একজোট হয়ে নিজেদের 'নবাব' বলে ঘোষণা করেছিলেন। আর তাঁর প্রধান সহযোগী হিসেবে নিযুক্ত হয়েছিলেন দয়ারাম শীল নামে এক হিন্দু নেতা। নুরুলুদ্দিনের সেই বিখ্যাত ডাক "জাগো বাহে, কোনঠে সবায়" গোটা উত্তরবঙ্গের ধমনীতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল।
দেবী সিং নিজে হিন্দু হওয়া সত্ত্বেও হিন্দু কৃষকরা তাকে বিন্দুমাত্র রেয়াত করেনি। আবার দেবী সিংয়ের মুসলমান পেয়াদাদের উপর আক্রমণ শানাতে মুসলমান কৃষকদেরও বুক কাঁপেনি। জমিদার কেনারাম থেকে শুরু করে সাধারণ প্রজা, সবাই একজোট হয়ে কোম্পানির বাহিনী ও দেবী সিংয়ের লোকজনের বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
বিদ্রোহের আগুন সামলাতে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাধ্য হয় দেবী সিংকে ইজারাদারের পদ থেকে সাময়িক বরখাস্ত করতে। সেইসঙ্গে জে ডি প্যাটারসনের হাতে গোটা ঘটনার তদন্তভার তুলে দেয়। তদন্তে নেমে দেবী সিংয়ের যাবতীয় নারকীয় কুকীর্তির প্রমাণ তুলে ধরেন তিনি। কিন্তু বাস্তবে বিচারের নামে এক চূড়ান্ত প্রহসনের সাক্ষী থেকেছিল ইতিহাস।
দেবী সিং ছিলেন সেযুগের অন্যতম শীর্ষ ধনী। ইজারাদারি করে কৃষকদের উপর নির্লজ্জ অত্যাচারের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পত্তি করেছিলেন। খুব ভালো করেই জানতেন, টাকার জোরে ব্রিটিশদেরও কিনে নেওয়া যায়। জলের মতো টাকা খরচ করে তিনি ভুয়ো প্রমাণ সাজান ও মিথ্যে সাক্ষী জোগাড় করেন। অন্যদিকে ওয়ারেন হেস্টিংস ব্রিটিশ পার্লামেন্টে গোটা ঘটনায় নিজের দায় এড়িয়ে যান। তিনি সুকৌশলে প্রমাণ করার চেষ্টা করেন, এত দূরের এক ইজারাদার কী করছে তা কলকাতায় বসে তার পক্ষে জানা সম্ভব ছিল না। প্যাটারসনের রিপোর্টকে মিথ্যে প্রমাণের জন্য হেস্টিংস আরেকটা কমিশন বসান। শেষ পর্যন্ত প্রমাণের অভাব এবং প্রশাসনিক কারচুপির যুক্তিতে দেবী সিংকে সসম্মানে রেহাই দেওয়া হয়।
যে মানুষটার লালসা আর অত্যাচারে বাংলার হাজার হাজার নারীর জীবন ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল, সেই তিনি শুধু মুক্তিই পেলেন না, বরং পেলেন রাজকীয় সম্মান! বাজেয়াপ্ত হওয়া বিপুল সম্পত্তি দেবী সিং হাসতে হাসতে ব্রিটিশদের থেকে ফিরে পেয়েছিলেন।
এরপর তিনি মুর্শিদাবাদের নশিপুরে সুবিশাল নশিপুর রাজ এস্টেট প্রতিষ্ঠা করেন। ব্রিটিশ সরকার এই পিশাচকে খুশি রাখতে 'মহারাজা' উপাধিতেও ভূষিত করে! অবশেষে ১৮০৫ সালে কোনরকম শাস্তি ছাড়াই নিজের প্রাসাদে চূড়ান্ত বিলাসবহুল জীবন কাটিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন দেবী সিং।
দেবী সিংয়ের নিজের কোনও পুত্রসন্তান ছিল না। তাই তিনি ভাইপো বলবন্ত সিংয়ের পুত্র রাজা উদবন্ত সিংকে দত্তক নিয়েছিলেন। এই উদবন্ত সিং এবং তার পরবর্তী বংশধররাই নশিপুর রাজপরিবারের ঐতিহ্য বহন করে চলে। দেবী সিংয়ের সেই রক্তমাখা টাকার উপর ভিত্তি করে পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদে তৈরি হয় সুবিশাল নশিপুর রাজবাড়ি বা আখড়া। তার বংশধররা ব্রিটিশদের ঘনিষ্ঠ হয়ে অত্যন্ত আড়ম্বরপূর্ণ জীবন কাটিয়েছে। রাজা উদবন্ত সিং থেকে শুরু করে রাজা রণজিৎ সিংহ, সবাই মুর্শিদাবাদের অভিজাত সমাজে দাপটের সঙ্গে রাজ করেছে।
আজ মুর্শিদাবাদের নশিপুর রাজবাড়ির জৌলুস দেখতে ভিড় করেন হাজার হাজার পর্যটক। গাইডরা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান রাজকীয় বৈভব। কিন্তু সেই প্রাসাদের ইটের খাঁজে খাঁজে যে আজও রংপুর আর দিনাজপুরের হাজার হাজার ধর্ষিতা ও নিপীড়িতা নারীর হাহাকার লুকিয়ে আছে!
ইতিহাস বড়ই ট্র্যাজিক।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
