

কেয়া বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি - Google
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
সাফল্যের মুকুটের মধ্যেই কাঁটাও থাকে। সাফল্য পেতে গেলে সেই কাঁটাও খেতে হবে। আবার কেউ আচমকা জনপ্রিয় হয়ে গেলে তাঁর নামে অপবাদও জোটে। সেটাই বর্তমান সময়ে বুঝতে পারছেন জলপাইগুড়ি রায়কতপাড়ার মেয়ে কেয়া বন্দ্যোপাধ্যায়। ২১ বছরের মেয়েটি পাওয়ার লিফটিংয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে একটি অসাধ্যসাধন করেছেন। এই সুন্দরী তরুণীর ওজন মাত্র ৪৫.৭ কেজি। আর সেই তিনিই কিনা দক্ষিণ আফ্রিকার সানসিটিতে আইপিএফ বিশ্ব জুনিয়র পাওয়ার লিফটিংয়ে ১৪৬কেজি ওজন তুলে সকলকে চমকে দিয়েছেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় এই সাফল্যের পর থেকেই শুরু হয়েছে কেয়াকে ঘিরে নানা কুৎসা ও নোংরা আক্রমণ। কেউ বলছেন, তাঁর রূপে মুগ্ধ হয়ে বিচারকরা ওজনের মাপদণ্ডে ভুল করেছেন! আবার কেউ আরও কুৎসিত যৌনগন্ধী কথাবার্তায় তাঁর এই অনন্য কীর্তিকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টায় মত্ত।
জুনিয়র ক্লাসিক পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপসে তাঁর এই লিফট নিয়ে এখন ব্যাপক আলোচনা চলছে। কেয়া তাঁর ওজনের থেকে তিনগুণ বেশি ওজন তুলে আলোড়ন ফেলে দিয়েছেন। এটা শারীর বিজ্ঞানকেও হার মানিয়েছে। তাঁর এই ১৪৬ কেজি ওজনে ভারত পেয়েছে রুপোর পদক। সোনা পান ফ্রান্সের ইনেস হারবক্স, তিনি শেষ লিফটে ১৬৫ কেজি ওজন তুলেছিলেন। আয়ারল্যান্ডের ব্লাথনেইড ও'ডায়ারও ১৪৬ কেজি ওজন তুলেছিলেন, কিন্তু বাংলার কেয়া টাইব্রেকে আইরিশ প্রতিপক্ষকে হার মানান।

শুধু ডেডলিফ্ট নয়, তিনটি ইভেন্ট মিলিয়েও নজর কেড়েছেন কেয়া। তিনি স্কোয়াটে ৯০ কেজি, বেঞ্চ-প্রেসে ৫০ কেজি এবং ডেডলিফ্টে ১৪০ কেজি তোলেন। ফলে তাঁর মোট স্কোর দাঁড়ায় ২৮০ কেজি। এই পারফরম্যান্স তাঁকে ৪৭ কেজি বিভাগে সামগ্রিকভাবে পঞ্চম স্থানে পৌঁছে দিয়েছিল। এই বয়সে ভারতের কোনও প্রতিযোগী এমন নজরকাড়া সাফল্য পাননি।
কেয়া অবশ্য হঠাৎ করে এমন সাফল্য পেলেন তা নয়। গত এক বছরে কেয়ার পারফরম্যান্সেও উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। ২০২৫ সালের জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি স্কোয়াটে ৮২.৫ কেজি, বেঞ্চ-প্রেসে ৪৭.৫ কেজি এবং ডেডলিফ্টে ১২৭.৫ কেজি তুলেছিলেন। সব মিলিয়ে তাঁর মোট ছিল ২৫৭.৫ কেজি। এক বছর পরে জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সেই পরিসংখ্যান বেড়ে হয় যথাক্রমে ৯৫, ৫২.৫ এবং ১৪০ কেজি, মোট ২৮৭.৫ কেজি।
২০২৪ সালে পাওয়ার লিফটিং জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপে সোনা জিতেছিলেন কেয়া। খেতাব ধরে রাখেন পরের বছরও। চলতি বছর বেঞ্চ-প্রেস বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হন তিনি। এবার আন্তর্জাতিক মঞ্চে নজর কাড়লেন জলপাইগুড়ির মেয়ে। নিজের ওজনের থেকে তিনগুণ ভার তোলার পাশাপাশি চর্চা চলছে কেয়ার স্টাইলিশ দেহের ভাষা নিয়েও।
কেয়া বন্দ্যোপাধ্যায় পাওয়ার লিফটিংয়ের পাশাপাশি মডেলিংও করেন। তিনি এমবিএ পড়তে বিদেশেও যেতে চান। তাঁর বাবা কুণাল বন্দ্যোপাধ্যায় জলপাইগুড়ি থেকে টেলিফোনে জানিয়েছেন, ‘‘আমার মেয়ে ছোটবেলা থেকেই খুব সাজতে ভালবাসে। আগে ওর পছন্দের গেম ছিল ক্যারাটে। স্কুলে ক্যারাটে শিখত। তবে ১৫ বছর বয়স থেকে যখন থেকে জিমে যায়, সেইসময় থেকেই লিফটিংয়ে আগ্রহ তৈরি হয়, সেই শুরু। তারপর এটাকেই পেশা করে এগিয়েছে।’’
কেয়া যদিও এই মুহূর্তে বাংলার হয়ে নয়, জাতীয় স্তরে হরিয়ানার প্রতিনিধিত্ব করেন। কারণ বাংলায় ক্রীড়াক্ষেত্রে সুযোগ কম, তাই ভিনরাজ্যে চলে যেতে হয়েছে। এতে কেয়া চাকরিও পেয়ে গিয়েছে হরিয়ানা পুলিশে। তাঁর বাবা এও বললেন, ‘‘আমার মেয়ে অবশ্য সবাইকে বাংলার মেয়ে হিসেবেই পরিচয় দিতে ভালবাসে, আমরাও তাই। শুধু কর্মক্ষেত্রের জন্য হরিয়ানা চলে যেতে বাধ্য হয়েছে। সেখানকার কোচদের অধীনেই মেয়ে উন্নতি করেছে।’’
কেয়ার পাশাপাশি তাঁর পাড়ারই আরও এক প্রতিযোগী মধুরা কর সাব-জুনিয়র মহিলা ৫২ কেজি বিভাগে চারটি সোনা জিতেছে। ৪৯.৩৫ কেজি ওজনের মধুরা স্কোয়াটে ১০৭.৫ কেজি, বেঞ্চ প্রেসে ৬০ কেজি এবং ডেডলিফ্টে ১২৫ কেজি তুলে মোট ২৯২.৫ কেজি তোলেন।
দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী মধুরার সাফল্যের তালিকাও দীর্ঘ। ২০২৪ সালে জাতীয় পাওয়ার লিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপ জেতার পরে ২০২৫ সালেও খেতাব ধরে রাখেন তিনি। চলতি বছর ফরিদাবাদে জাতীয় বেঞ্চ প্রেস চ্যাম্পিয়নশিপেও সোনা জেতেন। পাশাপাশি চিনে আয়োজিত ২০২৬ এশিয়ান পাওয়ারলিফটিং চ্যাম্পিয়নশিপে রুপো পেয়েছেন। কিন্তু নিজের ওজনের তুলনায় তিন গুণ বেশি ওজন তুলে সকলের নজরে এসে গিয়েছেন কেয়া। তাঁর ভিডিও এই মুহূর্তে ভাইরাল হয়ে গিয়েছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার সিনিয়র ক্রীড়া সাংবাদিক। দুটি ফুটবল বিশ্বকাপ এবং দুটি ক্রিকেট বিশ্বকাপ কভার করা এই সাংবাদিকের একাধিক আরও আন্তর্জাতিক ইভেন্ট করার অভিজ্ঞতাও রয়েছে। শুভ্র দুটি বইও লিখেছেন, একটা বিশ্বকাপের গল্প যুদ্ধ এবং শেষটি স্বপ্নের নায়ক ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো।
