

মিজোদের হেড হান্টিং প্রথার প্রতীকী ছবি - AI
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজকের মিজোরাম অনেক শান্ত। সবুজে মোড়া পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি দেখতে সেখানে পর্যটকরা ভিড় করে। চারপাশের এই স্নিগ্ধতা দেখে বোঝার উপায় নেই যে একসময় এখানকার প্রতিটি কোণায় লুকিয়ে ছিল চরম আতঙ্ক। দুশো-আড়াইশো বছর আগেও এই দুর্গম অরণ্যে বেঁচে থাকার একমাত্র শর্ত ছিল পেশিশক্তি। আর সেই শক্তি প্রমাণের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর প্রথা ছিল মানুষের কাটা মাথা! মিজোদের ইতিহাসে এই প্রথা 'হেড হান্টিং' নামে পরিচিত।
ইতিহাস বলে মিজোরা আদতে মঙ্গোলয়েড জাতিগোষ্ঠীর অংশ। এই ভূখণ্ড তাদের উৎসভূমি নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে এদের আদিভূমি আজকের চিন। খ্রিস্টিয় পঞ্চম থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে তারা সেখান থেকে বর্তমান মায়ানমারে চলে আসে। মিজোরামে আসার বহু আগে থেকে তারা বসবাস করত মায়ানমারের চিন পাহাড় বা তার আশেপাশের অঞ্চলে। সেখানেই হেড হান্টিং প্রথার প্রচলন। তবে ঠিক কবে এই প্রথার জন্ম হয়েছিল তার কোনও নির্দিষ্ট তথ্য নেই।
তবে ঐতিহাসিকদের মতে, কয়েক হাজার বছর আগে থেকেই চিন ও কুকি উপজাতিদের মধ্যে (বৃহত্তর মঙ্গলয়েড জনগোষ্ঠীর একটি বৃহৎ অংশ) শত্রুর মাথা কেটে আনার চল ছিল। এর পেছনে কাজ করত গভীর এক ধর্মীয় বিশ্বাস।
প্রাচীন মিজোরা ছিল সর্বপ্রাণবাদী। তারা মনে করত মৃত্যুর পর আত্মারা সাধারণ আত্মাদের গ্রাম বা মিথিখুয়া অথবা অনন্ত শান্তির স্বর্গ বা পিয়ালরাল-এ যায়। এবার পিয়ালরাল বা স্বর্গে যেতে হলে তাদের বিশ্বাস মতে শত্রুর মাথা কাটাটা ছিল আবশ্যক করণীয় কাজ। মিজো সমাজে শত্রুর মাথা কাটার অর্থ হল বীরত্বের প্রতীক। আর বীরত্ব না থাকলে স্বর্গে যাওয়া যাবে না।
পৃথিবীতে যে যোদ্ধা যত বেশি শত্রুর মাথা কেটে আনবে, স্বর্গে সেই শত্রুরা তার সেবাদাস হিসেবে কাজ করবে বলে মিজোরা বিশ্বাস করত। অর্থাৎ পরকালের আরাম আয়েস নিশ্চিত করতে তারা মাথা শিকারে করত। তাছাড়া তাদের সমাজে মাথা কেটে আনাকে বীরত্বের চরম প্রতীক মানা হত। যে যুবকের কাছে যত বেশি কাটা মুণ্ডু থাকত সমাজে এবং নারীদের কাছে তার কদর ছিল তত বেশি! কোন বড় সর্দার মারা গেলে তার শেষকৃত্যের জন্যও অন্য গ্রামের মানুষের মাথা কেটে আনা বাধ্যতামূলক ছিল। কারণ যার মাথা কাটা হয়েছে, সে স্বর্গে সর্দারের সেবা করবে এটাই ছিল বিশ্বাস।
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে মিজোরা খাদ্যের অভাব ও অন্যান্য গোষ্ঠীর আক্রমণে মায়ানমার (তখনকার ব্রহ্মদেশ) ছেড়ে বর্তমান মিজোরাম ভূখণ্ডে ঢুকতে শুরু করে। নতুন এই পরিবেশে টিকে থাকার লড়াই ছিল আরও কঠিন। ভালো জুম চাষের জমি ও শিকারের জায়গা দখল করতে গিয়ে প্রায় রোজই বিভিন্ন গ্রাম ও উপজাতির মধ্যে লড়াই চলত। এই সময় মিজোদের লুসাই উপজাতির পরাক্রমশালী শৈলো বংশের সর্দাররা এখানে নিজেদের একাধিপত্য কায়েম করতে শুরু করেন। তাদের আধিপত্য বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে এই হেড হান্টিং। শত্রুদের মনে ত্রাস সৃষ্টি করতে এর চেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর হয় না।
এই আক্রমণ কখনওই সামনাসামনি যুদ্ধ ছিল না। শিকারিরা রাতের অন্ধকারে বা ভোরের আলো ফোটার আগে অন্য গ্রামে অতর্কিতে হামলা চালাত। সেখানকার পুরুষদের হত্যা করে মাথা কেটে নেওয়া হত নিমেষে। অনেক সময় জঙ্গল বা দূরের পথ পেরিয়ে আস্ত মাথা বয়ে আনা সম্ভব হত না। তখন নিহত ব্যক্তির মাথার চামড়ার একটা বড় অংশ বা স্কাল্প কেটে নিত। সেই মুণ্ডু নিয়ে গ্রামে ফেরার পর শুরু হতবিজয়োৎসব। গ্রামের সর্দারের বাড়ির সামনে বা যুবকদের আস্তানা 'জলবুক'-এর বাইরে বাঁশের খুঁটিতে সেই মাথাগুলো গেঁথে সাজিয়ে রাখা হত। এটি ছিল তাদের চরম ক্ষমতার আস্ফালন।
উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে এই মিজোদের এই হিংস্র উৎপাত চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। পাহাড়ের গণ্ডি ছাড়িয়ে লুসাই সর্দারদের নজর পড়ে সমতলের উপর। বিশেষ করে অসমের কাছাড়, সিলেট এবং ত্রিপুরার ব্রিটিশ চা বাগানগুলো তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে। সম্পদের লোভে তারা প্রায়ই চা বাগানে হানা দিয়ে নিরীহ শ্রমিকদের মাথা কেটে নেওয়ার পাশাপাশি সম্পদ লুঠ করে ফিরে যেত। এইভাবে তাদের লোভ ও মাথার নেশা বাড়তে থাকে।
হেড হান্টিং প্রথার সবচেয়ে ভয়াবহ ও চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটে ১৮৭১ সালে। লুসাই যোদ্ধারা কাছাড়ের আলেকজান্দ্রাপুর চা বাগানে এক ভয়াবহ আক্রমণ করে। তারা বাগানের ব্রিটিশ মালিক জেমস উইনচেস্টারকে হত্যা করে তার মাথা কেটে নেয়। এরপর তার ছোট্ট মেয়ে মেরি উইনচেস্টারকে অপহরণ করে পাহাড়ে নিয়ে যায়। এই একটি ঘটনা ব্রিটিশ প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।
চা বাগানে ক্রমাগত হামলা এবং মেরি উইনচেস্টারের অপহরণ ব্রিটিশ সরকারকে কঠোর হতে বাধ্য করে। লুসাইদের দমন করতে তারা ১৮৮৯ এবং ১৮৯০ সালে 'লুসাই এক্সপিডিশন' নামে এক বিশাল সামরিক অভিযান চালায় আজকের মিজোরামে। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্রের সামনে লুসাইদের সাবেকি প্রতিরোধ টিকতে পারেনি। ব্রিটিশরা মিজোরাম দখল করে কড়া আইন জারি করে। জানিয়ে দেয়, কোনও সর্দার মাথা কাটার সাথে যুক্ত থাকলে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে এবং তার পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হবে।
প্রথমদিকে মিজোরা ব্রিটিশদের এই নির্দেশ কিছুতেই মানতে চায়নি। কারণ তাদের কাছে এটি শুধু খুন বা অপরাধ ছিল না, এটি ছিল তাদের ধর্ম ও সামাজিক পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ। পরকালে দাসের অভাব হবে ভেবে অনেক সর্দার ও যোদ্ধা তীব্র মানসিক সঙ্কটে পড়ে যান। তাদের মনে ব্রিটিশদের প্রতি প্রবল ক্ষোভ জন্মায়।
তবে সময়ের সাথে সাথে এই ক্ষোভ প্রশমিত হতে শুরু করে। রেভারেন্ড উইলিয়াম উইলিয়ামস ও জে. এইচ. লরেইনের মতো ওয়েলশের খ্রিশ্চান মিশনারিরা সেখানে গিয়ে বাইবেল অনুবাদ করেন এবং আধুনিক শিক্ষার প্রসার ঘটান। ধীরে ধীরে খ্রিশ্চান ধর্মে মিজোদের ধর্মান্তরিত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়। খ্রিস্টধর্মের সংস্পর্শে এসে মিজোরা বুঝতে পারে, পরকালে দাসের কোনও প্রয়োজন নেই। এভাবেই কালের নিয়মে হেড হান্টিং প্রথার অবসান ঘটে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
