

'দাসী কন্যা' বাসভখত্তিয়ার বিয়ে নিয়ে শাক্য রাজ দরবারের কাল্পনিক ছবি - AI
৮ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬
প্রাচীন ভারতের ইতিহাস নানা চমকপ্রদ রাজনৈতিক ওঠাপড়া আর রাজকীয় কূটকৌশলের সাক্ষী। প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ মহাবংশ ও জাতকে বর্ণিত ঘটনা থেকে ঠিক তেমনই একটি চাঞ্চল্যকর বিষয় জানা যায়। যেখানে এক বিশাল প্রতারণা করার দায়ে অভিযুক্ত খোদ গৌতম বুদ্ধর পিতৃকূল শাক্যরা। এই ঘটনার জেরেই শাক্য রাজবংশ বুদ্ধ বেঁচে থাকাকালীনই কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল।
গৌতম বুদ্ধের পিতা রাজা শুদ্ধোদন ছিলেন শাক্য বংশের প্রধান। তবে শাক্যদের শাসনব্যবস্থা সাধারণ রাজতন্ত্র ছিল না। তারা মূলত 'গণসংঘ' বা প্রজাতান্ত্রিক শাসন মেনে চলত। শাক্য বংশের প্রবীণ এবং অভিজাত সদস্যদের নিয়ে গঠিত হত পরিষদ। তার সদস্যরাই ভোটের মাধ্যমে একজন প্রধান নির্বাচন করতেন। শুদ্ধোদন ছিলেন তেমনই একজন নির্বাচিত প্রধান বা রাজা।
রাজা শুদ্ধোদনের মৃত্যুর পর কপিলাবস্তুর সিংহাসন বা প্রধানের পদ নিয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। এমনিতেই বুদ্ধ সন্ন্যাস নিয়েছেন। তাঁর পথ অনুসরণ করে মাতৃগর্ভজাত ও বৈমাত্রেয় ভাইরাও সন্ন্যাস নেন। তাঁর পুত্র রাহুল'ও অনেক আগেই বৌদ্ধ সংঘে যোগদান করেন। ফলে রাজা শুদ্ধোধনের ছেলে বা নাতি কারোরই প্রধান হওয়ার সম্ভাবনা ছিল না।
এই অবস্থায় শুদ্ধোদনের পর শাক্যদের নতুন নেতা হিসেবে নির্বাচিত হন তাঁর ভাই অমিতোদনের পুত্র মহানাম। সম্পর্কে তিনি ছিলেন গৌতম বুদ্ধের খুড়তুতো ভাই। মহানামের হাতেই যায় কপিলাবস্তুর শাসনভার এবং শাক্যদের সমস্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা।
শাক্যরা নিজেদের ইক্ষ্বাকু বা সূর্যবংশীয় বলে দাবি করত। মহাভারতে উল্লেখিত বিখ্যাত রাজা ইক্ষ্বাকু-এর বংশধর বলে নিজেদের পরিচয় দিত শাক্যরা। এই সূত্র ধরেই নিজেদের বংশ বা রক্তের বিশুদ্ধতা নিয়ে তাদের অহঙ্কার ছিল আকাশছোঁয়া। রক্তের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে নিজেদের গোত্রের বাইরে তারা বিয়ে পর্যন্ত করত না। অবশ্য এই মাত্রাছাড়া রক্তাভিমানই শেষ পর্যন্ত তাদের কাল ডেকে আনে।
শাক্যরাজ মহানাম ছিলেন অত্যন্ত প্রতাপশালী। কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একটি অধ্যায় কপিলাবস্তুর রাজপরিবারের অন্দরে সযত্নে গোপন রাখা হয়েছিল। মহানামের প্রাসাদে নাগমুণ্ডা নামে এক দাসী ছিলেন। এই দাসীর রূপ এবং যৌবনে মুগ্ধ হয়ে মহানাম তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। যা শাক্য বংশে কার্যত বিরল ঘটনা।
কালক্রমে নাগমুণ্ডার গর্ভে মহানামের একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। মেয়েটির নাম রাখা হয় বাসভখত্তিয়া। দাসীর গর্ভে জন্ম নেওয়া বাসভখত্তিয়া ছিল অপরূপ সুন্দরী। কিন্তু তার পিতা স্বয়ং রাজা হওয়া সত্ত্বেও শাক্যদের কট্টর সমাজব্যবস্থার জন্য সে কখনও রাজকন্যার স্বীকৃতি পায়নি। রাজপ্রাসাদের চার দেওয়ালের ভেতরেই একপ্রকার দাসী হিসেবেই তার জীবন কাটত। যদিও তাকে কেন্দ্র করেই ওই এলাকায় ঘটে যায় মহাপ্রলয়!
সেই সময় উত্তর ভারতের অন্যতম শক্তিশালী মহাজনপদ ছিল কোশল। সেখানকার রাজা ছিলেন প্রসেনজিৎ। তিনি ছিলেন রাজা মহাকোশলের পুত্র। প্রসেনজিৎ তাঁর পরাক্রম এবং কূটনীতির জোরে প্রতিবেশী কাশী রাজ্যকেও নিজের অধীনে নিয়ে এসেছিলেন। মগধের রাজা বিম্বিসার ছিলেন তাঁর ভগ্নীপতি। সব মিলিয়ে প্রসেনজিৎ তখন অসীম ক্ষমতার অধিকারী। এদিকে
গৌতম বুদ্ধের প্রতি রাজা প্রসেনজিতের ছিল অগাধ শ্রদ্ধা। সেই সূত্র ধরে তিনি শাক্যদেরও সম্মান করতেন। এই বিষয়টিকে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তায় রূপ দিতে চান প্রসেনজিৎ। তাই কপিলাবস্তুতে দূত পাঠিয়ে সরাসরি একজন শাক্য রাজকন্যার পাণিপ্রার্থনা করেন।
কোশল রাজের এই প্রস্তাব শুনে শাক্যদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। তারা কোনওভাবেই নিজেদের গোত্রের বাইরের কারোর সঙ্গে নিজেদের বিশুদ্ধ রাজকন্যার বিয়ে দিতে রাজি ছিল না। সে রাজা প্রসেনজিৎ যত বড়ই সম্রাট হোন না কেন, শাক্যদের চোখে তিনি তাদের সমকক্ষ নন। আবার সরাসরি এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার সহসও ছিল না শাক্যদের। কারণ তারা জানত, কোশলের বিশাল সেনাবাহিনীর সামনে একটুও টিকতে পারবে না।
প্রাচীন বৌদ্ধ গ্রন্থ অনুযায়ী, রাজা মহানাম তখন এক ভয়ঙ্কর কূটকৌশলের আশ্রয় নেন। তিনি ঠিক করেন, কোশলরাজের হাতে আসল রাজকন্যার বদলে তাঁর দাসী-কন্যা বাসভখত্তিয়াকে তুলে দেবেন।
পরিকল্পনা মতো কোশলের দূতদের সামনে এক নাটক সাজানো হয়। দূতেরা যাতে সন্দেহ না করে, তাই মহানাম বাসভখত্তিয়ার সঙ্গে একই পাত্রে খেতে বসেন। তৎকালীন যুগে কোনও দাসীর সঙ্গে এক পাত্রে রাজার আহার করার বিষয়টি কল্পনারও অতীত ছিল। ফলে দূতেরা পুরোপুরি নিশ্চিত হয় যে এই মেয়েটিই আসল শাক্য রাজকন্যা। এরপর তারা পরম আড়ম্বরে বাসভখত্তিয়াকে কোশলে নিয়ে যান। গোটা বিষয়ে শাক্যদের প্রতারণা একদম পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।
প্রসেনজিৎ বাসভখত্তিয়ার রূপে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে তাঁকে নিজের প্রধান রানির মর্যাদা দেন। কিছুদিন পর তাঁদের এক পুত্রসন্তান হয়। তার নাম রাখা হয় বিড়ুডভ।
বিড়ুডভ ধীরে ধীরে বড় হয়ে ওঠেন। তরুণ বয়স হলে তিনি তাঁর মামাবাড়ি অর্থাৎ কপিলাবস্তুতে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। মা বাসভখত্তিয়া অনেক বারণ করেন। কিন্তু বিড়ুডভ তাঁর জেদে অনড় ছিলেন। এরপর বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে তিনি কপিলাবস্তু পৌঁছান।
শাক্যরা বিড়ুডভকে আতিথেয়তা করলেও দাসী পুত্র হওয়ার কারণে অন্তর থেকে তাঁকে প্রচণ্ড ঘৃণা করত। তারা কিছুতেই এক দাসী-পুত্রের সামনে মাথা নোয়াতে রাজি ছিল না। তাই ছলনা করে বিড়ুডভের থেকে ছোট সব রাজকুমারদের আগেই গ্রামের বাইরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
কয়েকদিন পর বিড়ুডভ যখন কোশলে ফিরে যাচ্ছেন, তখন তাঁর এক সৈন্য ভুলে অস্ত্র ফেলে এসেছিলেন। সেই অস্ত্র নেওয়ার জন্য সে শাক্যদের সভাগৃহে ফিরে যায়। সেখানে গিয়ে এক অবাক করা দৃশ্যের সাক্ষী হয়। দেখে, এক দাসী দুধ ও জল দিয়ে বিড়ুডভের বসার আসন ধুচ্ছে আর তাঁকে 'দাসী-পুত্র' বলে গালি দিচ্ছে। সৈন্যটি ফিরে গিয়ে বিড়ুডভকে সব কথা খুলে বলে।
নিজের আসল পরিচয় জানতে পেরে রাগে উন্মাদ হয়ে যান তরুণ রাজকুমার। তিনি শপথ নেন, আজ শাক্যরা দুধ ও জল দিয়ে তাঁর বসার আসন ধুচ্ছে। যেদিন তিনি সিংহাসনে বসবেন, সেদিন শাক্যদের রক্ত দিয়ে তিনি নিজের রাজ সিংহাসন ধোবেন।
সত্যিটা জানতে পেরে রাজা প্রসেনজিৎ প্রথমে বাসভখত্তিয়া এবং বিড়ুডভকেই রাজপ্রাসাদ থেকে বের করে দেন। যদিও গৌতম বুদ্ধের হস্তক্ষেপে তারা পরে সম্মান ফিরে পান। কিন্তু বিড়ুডভের মনে প্রতিশোধের আগুন নেভেনি।
বৃদ্ধ বয়সে রাজা প্রসেনজিৎ যখন সেনাপতি দীর্ঘচারায়ণের বিশ্বাসঘাতকতায় সিংহাসন হারান, তখন সেই সুযোগে বিড়ুডভ কোশলের রাজা হন। ক্ষমতায় বসেই তিনি তাঁর পুরোনো শপথ পূরণের জন্য বিশাল বাহিনী নিয়ে কপিলাবস্তু আক্রমণ করেন। যদিও তাঁর প্রথম তিন আক্রমণ ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন গৌতম বুদ্ধ। শাক্যদের ঘৃণা করলেও বুদ্ধকে পরম শ্রদ্ধা করতেন বিড়ুডভ।
তবে চতুর্থবার আর বিড়ুডভকে আটকাননি বুদ্ধ। কারণ তিনি বুঝেছিলেন, কর্মফলের কারণেই শাক্যদের শাস্তি পাওয়া দরকার। এরপর শাক্যদের উপর নেমে আসে ইতিহাসের এক নির্মম হত্যাযজ্ঞ। নারী, শিশু, বৃদ্ধ কাউকে রেয়াত করেনি কোশল সেনা। রক্তের বন্যায় ভেসে যায় বুদ্ধের কপিলাবস্তু।
এইসময় নিজের লোকেদের বাঁচাতে রাজা মহানাম চরম আত্মত্যাগের নজির গড়েন। তিনি বিড়ুডভ-কে বলেছিলেন আমি যতক্ষণ জলে ডুবে থাকবো তার মধ্যে যতজন শাক্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হবে তাদের কিছু বলতে পারবে না। সেই শর্ত মেনে নিয়েছিলেন বিড়ুডভ। এরপর নিজের লোকেদের বাঁচাতে জলের নিচে একটি গাছের সঙ্গে নিজের মাথার চুল বেঁধে আত্মত্যাগ করেন মহানাম।
যে কজন শাক্য পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন, তাঁরা আর কখনও বংশ পরিচয় নিয়ে প্রকাশ্যে আসেননি। ভারতের নানান প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে আত্মগোপন করে সাধারণের মতো বেঁচে টিকে থাকার চেষ্টা করেন বলে ঐতিহাসিকদের মত।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
কলকাতার দক্ষিণ শহরতলি বজবজে জন্ম, সেখানকার নদীর জল হাওয়ায় বেড়ে ওঠা। পড়াশোনা অর্থনীতি ও ইতিহাস নিয়ে। দীর্ঘদিন নাট্যচর্চার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘ নাট্য যাপনে গড়ে ওঠা। বাংলা সাহিত্যের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ ও অর্থসামাজিক বিষয় নিয়ে চর্চা এবং লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। সাংবাদিকতার পাশাপাশি বাংলা ভাষা বিশেষজ্ঞ হিসাবে কাজ করেন। অবসরে চুটিয়ে আড্ডা, ভ্রমণ, অজানা-অচেনা খাবারের স্বাদ চেখে দেখা।
