

মুম্বইয়ের মাটির নিচেই ডাইনোসর-রহস্য? প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis
৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬
আজকের মুম্বই মানেই ব্যস্ত রাস্তা, আকাশছোঁয়া বাড়ি, লোকাল ট্রেনের ছুটে চলা আর আরব সাগরের ঢেউ। কিন্তু এই শহরের মাটির দিকে এক বার তাকালে যেন খুলে যায় অন্য এক পৃথিবীর দরজা। এমন এক পৃথিবী, যেখানে মানুষ ছিল না। ছিল দৈত্যাকার ডাইনোসর। আর সেই পৃথিবীর শেষ অধ্যায়ের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও পড়ে রয়েছে মুম্বইয়ের কালো পাথর।
প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবীর ইতিহাসে ঘটে গিয়েছিল এক ভয়াবহ ঘটনা। কয়েক কোটি বছর ধরে পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়ানো ডাইনোসরদের অধিকাংশই হঠাৎ হারিয়ে যায়। নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পৃথিবীর প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রজাতি। সেই মহাবিলুপ্তির সঙ্গে সবচেয়ে জোরালো ভাবে জড়িয়ে রয়েছে একটি বিশাল গ্রহাণুর আঘাত।
বর্তমান মেক্সিকোর ইউকাটান উপদ্বীপের কাছে আছড়ে পড়েছিল প্রায় ১০ কিলোমিটার চওড়া একটি গ্রহাণু। তার অভিঘাতে তৈরি হয়েছিল বিশাল চিকশুলুব ক্রেটার। মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল বিপুল ধুলো ও ধোঁয়া। তৈরি হয়েছিল ভয়াবহ পরিবেশগত পরিবর্তন। সূর্যের আলো বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় পৃথিবীর তাপমাত্রা বদলে যায়, বিপর্যস্ত হয় খাদ্যশৃঙ্খল। আর তারই পরিণতিতে ডাইনোসর-সহ অসংখ্য প্রাণী হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে।
সেখানেই শুরু রহস্যের দ্বিতীয় অধ্যায়
মুম্বই-সহ মহারাষ্ট্রের বিস্তীর্ণ অংশে ছড়িয়ে থাকা কালো ব্যাসল্ট আসলে সেই প্রাগৈতিহাসিক সময়ের আগ্নেয়গিরির স্মৃতি। ডেকান ট্র্যাপস—পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম বৃহৎ আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের ফলে তৈরি হয়েছিল এই বিশাল শিলাস্তর। একের পর এক লাভার স্রোত বেরিয়ে এসে জমাট বেঁধে তৈরি করেছিল হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এই আগ্নেয় শিলা। আজ মুম্বইয়ের যে কালো পাথরকে আমরা নিছক পাহাড় বা শিলাস্তর বলে দেখি, তার বয়স সেই সময়ের কাছাকাছি। আর আশ্চর্য হল, গ্রহাণুর আঘাত এবং ডেকান ট্র্যাপসের ভয়াবহ অগ্ন্যুৎপাত ঘটেছিল প্রায় একই ভূতাত্ত্বিক সময়ে।
একটি তত্ত্ব বলছে, চিকশুলুব গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি হওয়া বিপুল ভূকম্পীয় শক্তি পৃথিবীর গভীরে পৌঁছে ডেকান অঞ্চলের আগ্নেয় কার্যকলাপকে কোনও ভাবে প্রভাবিত করে থাকতে পারে। অর্থাৎ, মেক্সিকোয় আছড়ে পড়া সেই মহাজাগতিক বস্তুটির অভিঘাত কি হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের ভারতীয় ভূখণ্ডের আগ্নেয়গিরিকেও নাড়িয়ে দিয়েছিল? তবে বিজ্ঞানীরা এখনও এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।
কারণ গুরুত্বপূর্ণ একটি তথ্য রয়েছে। ডেকান ট্র্যাপসের আগ্নেয় কার্যকলাপ গ্রহাণুর আঘাতের আগেই শুরু হয়েছিল। ফলে গ্রহাণুর আঘাতই যে অগ্ন্যুৎপাত শুরু করেছিল, এমন সরল সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না।
তবে ডাইনোসরদের শেষ অধ্যায়ে ডেকান ট্র্যাপসের ভূমিকা একেবারে উড়িয়েও দেওয়া যাচ্ছে না। বিপুল পরিমাণ লাভার সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়েছিল বিভিন্ন গ্যাস। তার প্রভাব পড়েছিল পৃথিবীর জলবায়ুতে। ফলে গ্রহাণুর আঘাতে তৈরি হওয়া বিপর্যয়ের সঙ্গে আগ্নেয়গিরির দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মিলে পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছিল কি না, তা নিয়ে গবেষণা চলছে। মুম্বইয়ের এলিফ্যান্টা গুহা থেকে সঞ্জয় গান্ধী ন্যাশনাল পার্ক, শহরের নানা প্রান্তের পাথরে তাই লুকিয়ে রয়েছে সেই প্রাগৈতিহাসিক আগুনের স্মৃতি।
যে মাটির উপর আজ কোটি মানুষের শহর দাঁড়িয়ে, সেই মাটিই এক দিন ছিল ফুটন্ত লাভার রাজ্য। সেই সময় পৃথিবীর আকাশে উড়ত ডাইনোসর। আর পৃথিবীর অন্য প্রান্তে ছুটে আসছিল এক মহাজাগতিক পাথর—যার অভিঘাতে বদলে যেতে চলেছিল পৃথিবীর ভবিষ্যৎ। তাই মুম্বইয়ের সেই কালো পাথর কোনও সাধারণ পাথর নয়। তার গায়ে লেখা রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রশ্নগুলির একটির ইতিহাস, ডাইনোসররা কেন হারিয়ে গেল? উত্তর এখনও পুরোপুরি জানা নেই। তবে মুম্বইয়ের পাথর বিজ্ঞানীদের মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রায় ৬ কোটি ৬০ লক্ষ বছর আগে পৃথিবী জুড়ে যে ভয়ঙ্কর পরিবর্তন ঘটেছিল, তার গল্পে ভারতও ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
