৩০শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

রাজনৈতিক থিয়েটার (পর্ব ২)

রাজনৈতিক থিয়েটার (পর্ব ২)

মুসোলিনি। ছবি - Google. গ্রাফিক্স - দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস।

রাজনৈতিক থিয়েটার (পর্ব ২)

calender icon 2 ৪ঠা জুলাই, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

প্রোপাগান্ডা ও পরিকাঠামো

বিশ্বকাপের সবুজ মাঠকে মুসোলিনি রূপান্তর করলেন এক বিশাল রাজনৈতিক থিয়েটারে। ফুটবল যেখানে মানুষের হৃদয়ের আবেগ প্রকাশ করার মাধ্যম, সেখানে ইতালির প্রতিটি স্টেডিয়াম হয়ে উঠল ফ্যাসিবাদের ড্রাম পিটানোর মঞ্চ। তিন লক্ষাধিক পোস্টার ছেপে দেওয়ালে দেওয়ালে সেঁটে দেওয়া হল। সেই পোস্টারে কোনো সাধারণ ফুটবলারের ছবি ছিল না; ছিল এক পেশিবহুল হারকিউলিসের প্রতিমূর্তি, যার চোখ জোড়া ছিল ক্রূর এবং শরীরী ভাষা ছিল আগ্রাসী।

ফুটবলপ্রেমী মানুষ যখন ম্যাচ দেখতে আসত, তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হতো 'কাম্পিওনাতো দেল মোন্দো' (Campionato del Mondo) নামের এক বিশেষ ব্রান্ডের সিগারেট, যা কেবল এই টুর্নামেন্টের জন্যই বাজারে এনেছিল মুসোলিনির সরকার। দশ লক্ষেরও বেশি ডাকটিকিট প্রকাশ করা হল, যেখানে ফুটবলের চেয়ে বেশি ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল ফ্যাসিবাদের প্রতীক।

স্টেডিয়ামগুলোর দিকে তাকালে চোখ জুড়িয়ে যাওয়ার বদলে এক ধরণের ভয় কাজ করত। তুরিন, মিলান কিংবা রোমের স্টেডিয়ামগুলো পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল সরাসরি ফ্যাসিবাদী স্থাপত্যশৈলীতে—সোজা, ধারালো লাইন এবং বিশাল আকৃতির সব স্তম্ভ, যা মানুষকে মনে করিয়ে দিত রাষ্ট্র কত বড় আর ব্যক্তি কত ক্ষুদ্র। তুরিনের স্টেডিয়ামের নামই বদলে রেখে দেওয়া হল 'স্তাদিও বেনিতো মুসোলিনি'। ম্যাচের দিনগুলোতে গ্যালারি ভরে থাকত 'ব্ল্যাকশার্টস' বা মুসোলিনির নিজস্ব আধাসামরিক বাহিনীর সদস্যদের দ্বারা। খেলা শুরুর আগে দর্শনার্থী থেকে শুরু করে রেফারি—সবাইকে বাধ্য করা হতো মাঠের মাঝখানে দাঁড়িয়ে হাত তুলে ফ্যাসিস্ট স্যালুট বা কুর্নিশ জানাতে।

 'জিতো নয়তো মরো'

কিন্তু এই পুরো নাটকের সবচেয়ে ট্রাজিক বা করুণ চরিত্রগুলো কারা ছিল জানেন? তারা হলেন ইতালির জাতীয় দলের খেলোয়াড়রা, যার ফুটবলবিশ্ব 'আজ্জুরি' নামে চেনে। তাদের কাছে এই বিশ্বকাপ কোনো আনন্দের উৎসব ছিল না, ছিল এক মৃত্যুফাঁদ। ইতালির কিংবদন্তি কোচ ভিত্তোরিও পোজোকে এক প্রকার সামরিক কমান্ডারের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। খেলোয়াড়দের সাধারণ ক্রীড়াবিদ নয়, বরং ইতালির 'ফ্যাসিস্ট সৈনিক' হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশ ছিল তাঁর ওপর।

স্কোয়াডের শক্তি বাড়াতে মুসোলিনির সরকার এক অদ্ভুত চাল চালল। তারা নাগরিকত্ব আইনের ফাঁকফোকর গলে লাতিন আমেরিকার তথাকথিত 'ওরিউন্দি' (Oriundi)—অর্থাৎ ইতালীয় বংশোদ্ভূত দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবলারদের দলে ভেড়ানো শুরু করল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় নাম ছিল লুইস মন্টি। ১৯৩০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ফাইনালে খেলা এই তারকা ফুটবলারকে রাতারাতি ইতালির সামরিক বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে গায়ে চাপিয়ে দেওয়া হলো নীল জার্সি। লুইস মন্টির মনের ভেতর তখন কী ঝড় চলছিল, তা ভাবলে আজও শিউরে উঠতে হয়। চার বছর আগে উরুগুয়ের মাটিতে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার সময় গ্যালারি থেকে মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন, আর এবার ইতালির মাটিতে খোদ রাষ্ট্রপ্রধানের কাছ থেকেই পাচ্ছিলেন অদৃশ্য খাঁড়ার ভয়।

টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে মুসোলিনি ড্রেসিংরুমে খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু হাড়হিম করা বার্তা পাঠিয়েছিলেন: "ভিনচেরে ও মোরিরে" (Vincere o morire)—যার অর্থ 'জিতো নয়তো মরো'।

অনেক ইতিহাসবিদ বলেন, এটি হয়তো ইতালীয় ভাষার একটি অতিপ্রচলিত রূপক ছিল, যার মানে 'সর্বোচ্চ চেষ্টা করো'। কিন্তু একজন নিষ্ঠুর একনায়কের মুখ থেকে যখন এই শব্দগুলো বের হয়, তখন তার রূপক অর্থ আর রূপক থাকে না। খেলোয়াড়দের মনে হয়েছিল, ফাইনালে হেরে যাওয়ার অর্থ কেবল ট্রফি হারানো নয়, হয়তো পরদিনই তাদের কোনো গোপন বন্দিশালায় বা ফায়ারিং স্কোয়াডের সামনে গিয়ে দাঁড়াতে হবে। প্রতিটি পাসের পেছনে, প্রতিটি শটের পেছনে লুকিয়ে ছিল বেঁচে থাকার এক আদিম ও চরম আকুতি।

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী

সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য