

পাসপোর্ট। ছবি - Google.
৯ই জুলাই, ২০২৬
সম্প্রতি ভারতের একটি সরকারি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে নতুন এক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে—পাসপোর্ট কি কেবলই বিদেশ ভ্রমণের একটি আইনি নথি, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো সাংবিধানিক তাৎপর্য লুকিয়ে আছে? ভারতের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব নিরুপমা রাও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, ভারতের নাগরিকত্ব নির্ধারিত হয় ১৯৫৫ সালের 'সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট' বা নাগরিকত্ব আইন দ্বারা, ১৯৬৭ সালের 'পাসপোর্ট অ্যাক্ট' দ্বারা নয়। এই আইনি যুক্তিটি শতভাগ সত্যি হলেও, আসল প্রশ্নটির উত্তর এতে মেলে না। কারণ, ভারতে কোনো সার্বজনীন 'নাগরিকত্ব সংশাপত্র' বা ইউনিভার্সাল সার্টিফিকেট দেওয়ার চল নেই। এই শূন্যতার মাঝে দাঁড়িয়ে আমাদের পাসপোর্টের আসল আইনি গুরুত্বটা বোঝা দরকার।
১৯৬৭ সালের পাসপোর্ট আইনের প্রস্তাবনা (Preamble) লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সংসদ অত্যন্ত সচেতনভাবে দুটি আলাদা শব্দ ব্যবহার করেছে—'পাসপোর্ট' এবং 'ভ্রমণ নথি' (Travel Document)। রিফিউজি বা রাষ্ট্রহীন ব্যক্তিদের জন্য আইডেন্টিটি সার্টিফিকেট বা ভ্রমণ নথি ইস্যু করা হতে পারে, কিন্তু পাসপোর্ট কেবল দেশের নাগরিকদের জন্যই নির্দিষ্ট। অন্যান্য সরকারি নথি, যেমন—ভোটার কার্ড বা জন্ম সার্টিফিকেটের তুলনায় একটি পাসপোর্ট তৈরির প্রক্রিয়া অনেক বেশি কঠোর। এর পেছনে থাকে পুঙ্খানুপুঙ্খ পুলিশ ভেরিফিকেশন ও প্রশাসনিক স্ক্রুটিনি। রাষ্ট্র যখন সবদিক খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হয় যে আবেদনকারী ভারতেরই নাগরিক, তখনই কেবল তার হাতে পাসপোর্ট তুলে দেওয়া হয়।
আন্তর্জাতিক আঙিনায় পাসপোর্ট হল ভারতের প্রজাতন্ত্রের একটি আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিত্ব। যখন একজন ভারতীয় নাগরিক বিদেশে গিয়ে তাঁর পাসপোর্টটি অভিবাসন কর্মকর্তার কাছে পেশ করেন, তখন ভারত সরকার পরোক্ষভাবে সেই দেশের কাছে এই মর্মে নিশ্চয়তা দেয় যে—বাহক ভারতেরই একজন নাগরিক এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা পাওয়ার যোগ্য। বিদেশী সরকারগুলো প্রতিটি যাত্রীর নাগরিকত্ব আলাদা করে খতিয়ে দেখে না, তারা ভারতের সিলমোহরের ওপর ভরসা রাখে। সুপ্রিম কোর্টও 'সাতওয়ান্ত সিং' (১৯৬৭) এবং 'মানেকা গান্ধী' (১৯৭৮) মামলায় স্পষ্ট করেছে যে, পাসপোর্ট কেবল একটি প্রশাসনিক কাগজ নয়, এটি সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ব্যক্তির মৌলিক স্বাধীনতার সাথে যুক্ত।
পাসপোর্ট নিজে কোনো নাগরিকত্ব তৈরি করে না; জালিয়াতি প্রমাণিত হলে এটি বাতিলও করা যেতে পারে। কিন্তু জালিয়াতির আশঙ্কায় এর গুরুত্বকে খাটো করা যায় না। এটিকে শতভাগ 'নাগরিকত্বের সংশাপত্র' বলা যেমন আইনি পরিভাষায় ভুল, ঠিক তেমনই একে 'শুধু একটি ভ্রমণ নথি' বলে উড়িয়ে দেওয়াও মারাত্মক ভুল। সত্যিটা এই দুয়ের মাঝখানে। এটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তির ভারতীয় নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য রাষ্ট্রের দেওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য নথি। দেশের মন্ত্রী, রাষ্ট্রদূত বা প্রধান বিচারপতির কূটনৈতিক পাসপোর্ট কি কেবলই রঙের ফারাক? তা তো নয়। তাই যখন রাষ্ট্র পাসপোর্টে তার সিলমোহর বসায়, তখন সে কেবল বিদেশ ভ্রমণের অনুমতি দেয় না, বরং বিশ্বের দরবারে নিজের দেশের একজন নাগরিকের সততার সাক্ষ্য দেয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
