

বারবার তিনি হন প্রতিবাদের মুখ। সোনাম ওয়াংচুক। ছবি - Google.
১৫ই জুলাই, ২০২৬
একসময় তাঁকে চিনত দেশ একজন উদ্ভাবক হিসেবে। তারপর শিক্ষাবিদ। পরে পরিবেশ আন্দোলনের মুখ। আর এখন তিনি প্রতিবাদের এক নতুন প্রতীক। সোনম ওয়াংচুককে কোনও একটি পরিচয়ে আটকে রাখা কঠিন। কারণ, গত এক দশকে তিনি এমন এক জনপরিসর তৈরি করেছেন, যেখানে বিজ্ঞান, শিক্ষা, পরিবেশ এবং রাজনীতি একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়েছে।
২০২৬ সালের জুলাই মাসে ফের জাতীয় শিরোনামে ওয়াংচুক। এবার লাদাখ নয়, তাঁর লড়াই দেশের পরীক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে। প্রশ্নফাঁস, নিয়োগে অনিয়ম এবং শিক্ষাব্যবস্থার জবাবদিহির দাবিতে অনশন শুরু করেছেন তিনি। দিন গড়িয়েছে, স্বাস্থ্য ভেঙেছে, চিকিৎসকদের উদ্বেগ বেড়েছে। কিন্তু তাঁর অবস্থান বদলায়নি।
ভারতের অধিকাংশ মানুষ প্রথম সোনম ওয়াংচুকের নাম শোনেন পরোক্ষভাবে। ২০০৯ সালে মুক্তি পাওয়া 'থ্রি ইডিয়টস' ছবির 'ফুনসুখ ওয়াংড়ু' চরিত্রটি আংশিকভাবে তাঁর জীবন থেকেই অনুপ্রাণিত। কিন্তু সিনেমার জনপ্রিয়তা তাঁকে তারকা বানালেও, বাস্তবের ওয়াংচুক কখনও সেই জনপ্রিয়তাকে ব্যক্তিগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি।
বরং তিনি প্রশ্ন তুলেছেন এমন সব বিষয়ে, যেগুলি রাষ্ট্রের কাছে অস্বস্তিকর। শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতা, জলবায়ু পরিবর্তন, হিমালয়ের ভঙ্গুর পরিবেশ কিংবা লাদাখের রাজনৈতিক অধিকার— প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাঁর অবস্থান স্পষ্ট।
২০১৯ সালে জম্মু-কাশ্মীর পুনর্গঠনের পর লাদাখ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হলেও বিধানসভা পায়নি। স্থানীয়দের বড় অংশের দাবি, উন্নয়নের নামে পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে, অথচ সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার নেই মানুষের। সেখানেই সামনে আসেন ওয়াংচুক। তাঁর দাবি ছিল চারটি— সংবিধানের ষষ্ঠ তফসিলের সুরক্ষা, নির্বাচিত বিধানসভা, সরকারি চাকরিতে স্থানীয়দের অধিকার এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়ন। তিনি বুঝেছিলেন, লাদাখের প্রশ্ন শুধু পাহাড়ের মানুষের নয়; এটি ভারতের পরিবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের প্রশ্নও।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রশ্নফাঁস, অনিয়ম, স্বচ্ছতার অভাব— এই অভিযোগে ক্ষুব্ধ লক্ষ লক্ষ পরীক্ষার্থী। ওয়াংচুকের বক্তব্য, শিক্ষা শুধু চাকরির সিঁড়ি নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থার ভিত্তি। যদি পরীক্ষাই বিশ্বাসযোগ্য না থাকে, তবে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাও দুর্বল হবে। এই কারণেই তিনি শিক্ষামন্ত্রীর জবাবদিহি দাবি করছেন। তাঁর মতে, সমস্যা শুধু একটি পরীক্ষার নয়; গোটা ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার।
ওয়াংচুক কোনও রাজনৈতিক দলের নেতা নন। কোনও নির্বাচনে লড়েন না। তাঁর পিছনে বিশাল দলীয় সংগঠনও নেই।
কিন্তু তাঁর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তিনি বিজ্ঞানী, শিক্ষাবিদ এবং পরিবেশকর্মী— এই পরিচয় তাঁকে রাজনৈতিক বিভাজনের ঊর্ধ্বে একটি নৈতিক অবস্থান দেয়। ফলে তাঁর সমালোচনা সরাসরি রাজনৈতিক আক্রমণ বলে উড়িয়ে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
ভারতের প্রতিবাদের ভাষা বদলাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে এখন অনেক সময় ব্যক্তি হয়ে উঠছেন আন্দোলনের মুখ। আন্না হাজারে যেমন দুর্নীতির বিরুদ্ধে এক সময় জাতীয় প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন, তেমনই আজ পরিবেশ, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকারের প্রশ্নে সোনম ওয়াংচুক এক নতুন প্রতীকে পরিণত হয়েছেন।
তাঁর সঙ্গে সবাই একমত হবেন, এমন নয়। কিন্তু তাঁকে উপেক্ষা করাও সহজ নয়।
সোনম ওয়াংচুকের লড়াইয়ের সাফল্য বা ব্যর্থতা সময় বলবে। হয়তো তাঁর সব দাবি মানা হবে না। হয়তো আন্দোলনও শেষ হবে কোনও আপসে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট— তিনি এমন কিছু প্রশ্ন সামনে আনছেন, যেগুলি এড়িয়ে যাওয়া সরকারের পক্ষেও কঠিন।
এই কারণেই সোনম ওয়াংচুক কেবল একজন আন্দোলনকারী নন। তিনি এমন এক নাগরিক কণ্ঠস্বর, যিনি বারবার মনে করিয়ে দেন— গণতন্ত্রে প্রতিবাদ কেবল বিরোধিতা নয়, রাষ্ট্রকে আরও দায়বদ্ধ করে তোলারও একটি পথ।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
