২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

‘জুলাই বিপ্লব’ থেকে ককরোচ আন্দোলন – ফারাক কোথায়?

‘জুলাই বিপ্লব’ থেকে ককরোচ আন্দোলন – ফারাক কোথায়?

রাজপথের ইতিহাস বনাম কাঠামোগত বাস্তব: ঢাকা থেকে দিল্লি। ছবি - AI

‘জুলাই বিপ্লব’ থেকে ককরোচ আন্দোলন – ফারাক কোথায়?

বাংলাদেশ আজ অতিক্রম করছে এক ঐতিহাসিক পথচলা—যা স্মৃতির ক্যানভাসে পরিচিতি পেয়েছে ‘দীর্ঘ জুলাই’ নামে। স্বাভাবিক ক্যালেন্ডারের ৩১ দিনের গণ্ডি পেরিয়ে যে সময়সীমা প্রসারিত হয়েছে ৩৬ দিন পর্যন্ত। ২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে ৫ আগস্ট—এই আগুনঝরা দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের কোটা সংস্কার আন্দোলন রূপান্তরিত হয়েছিল এক গণবিপ্লবে। যার চূড়ান্ত পরিণতিতে পতন ঘটে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে চেপে বসা শেখ হাসিনার একচ্ছত্র শাসনের।

ঠিক এই ঐতিহাসিক পরিবর্তনের বর্ষপূর্তির মাহেন্দ্রক্ষণে, সীমান্তের ওপারে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন এক অস্থিরতার চিত্র। পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস, লাগামহীন বেকারত্ব এবং প্রশাসনিক স্থবিরতার প্রতিবাদে হাজার হাজার বিক্ষোভকারী মিছিল নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন  সংসদ ভবনের দিকে। লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস ও গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে আন্দোলন দমনের চেষ্টা চালাচ্ছে পুলিশ। সাময়িকভাবে আটক করা হয়েছে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ একাধিক শীর্ষ রাজনেতাকে। জলবায়ু কর্মী সোনাম ওয়াংচুক, যিনি এই আন্দোলনের নৈতিক ভিত্তি গড়ে তুলেছিলেন, তাঁকে রাখা হয়েছিল পুলিশি নজরদারিতে। একই সঙ্গে, পুঞ্জীভূত ক্ষোভের প্রতিফলন হিসেবে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ নামে এক অদ্ভুত রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের উত্থান নজর কাড়ছে সবার।

ঢাকা থেকে দিল্লির এই দৃশ্যপট দেখলে এক চরম চেনা অনুভূতি জেগে ওঠা স্বাভাবিক। মিছিলে উত্তাল রাজপথ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ, আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া স্লোগান—সবকিছুই দুই বছর আগের ঢাকার স্মৃতিকে উসকে দিচ্ছে। শ্রীলঙ্কার ‘আরাগালিয়া’ যেমন ২০২২ সালে এক রাষ্ট্রপতিকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, কিংবা নেপালের রাজপথের আন্দোলন যেভাবে বারবার সংবিধান পুনর্লিখনের কারণ হয়েছে—দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাস সেভাবেই সাধারণ আন্দোলনকে এক লহমায় বৈপ্লবিক রূপ নিতে শিখিয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, দিল্লির এই রাজপথের প্রতিবাদ কি ভারতকে অন্য এক শ্রীলঙ্কা বা বাংলাদেশের দিকে নিয়ে যাচ্ছে?

প্রতিবাদ বনাম 'বিপ্লব': ফারাক কোথায়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে, দেখতে এক মনে হলেও 'প্রতিবাদ' (Protest) এবং 'বিপ্লব' (Revolution)-এর মধ্যে বিশাল মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। কোনো আন্দোলন যখন একটি নির্দিষ্ট সরকারের নীতি বা সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের দাবি জানায়, তাকে বলে প্রতিবাদ। অন্যদিকে, একটি বিপ্লব পুরো শাসনব্যবস্থা ও রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোর সমূল পরিবর্তন ঘটায়।

একটি রাজপথের বিক্ষোভকে রাষ্ট্রকে কাঁপিয়ে দেওয়া বিপ্লবে রূপ নিতে হলে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট উপাদানের সংমিশ্রণ প্রয়োজন—

 বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিকে একসূত্রে বাঁধার মতো সর্বজনীন ক্ষোভ।
 সবাইকে এক ছাতার তলায় আনার উপযোগী একটি শক্তিশালী আখ্যান (Narrative)।
 একটানা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার মতো সাংগঠনিক শক্তি।
 শাসকগোষ্ঠী ও এলিটদের মধ্যে বিভাজন।
 রাষ্ট্রের পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর আনুগত্যে ফাটল ধরা।

২০২৪ সালের বাংলাদেশে এই সবকটি উপাদানের এক বিস্ফোরক সংমিশ্রণ ঘটেছিল। শিক্ষার্থীদের কোটা আন্দোলনের ওপর তৎকালীন সরকারের নির্মম দমনপীড়ন এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অসংবেদনশীল ‘রাজাকার’ মন্তব্য সাধারণ মানুষকে ক্ষোভের অগ্নিগর্ভে ঠেলে দিয়েছিল। সেই একটি শব্দই বহুদিনের চেপে রাখা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অসন্তোষকে সরকার পতনের একদফা দাবিতে রূপ দিয়েছিল।

ভারতের বৈচিত্র্য ও ফেডারেল কাঠামোর ‘সেফটি ভালভ’

বাংলাদেশের এই দৃশ্যপট দিল্লিকে কৌতূহলী করলেও, ভারতের নিজস্ব রাষ্ট্রীয় স্থাপত্য ও ভৌগোলিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। ভারতে গণআন্দোলন কোনো নতুন বিষয় নয়। ১৯৭০-এর দশকের জরুরি অবস্থা বিরোধী আন্দোলন, আন্না হাজারের দুর্নীতিবিরোধী ইন্ডিয়া এগেইনস্ট করাপশন, কিংবা অতি সম্প্রতি সিএএ (CAA) বিরোধী আন্দোলন ও দীর্ঘ এক বছর ধরে চলা ঐতিহাসিক কৃষক আন্দোলন—প্রতিটি ক্ষেত্রেই লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন।

এসব আন্দোলন দেশটির রাজনৈতিক গতিপথ বদলেছে, সরকারের নীতি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছে, কিন্তু কখনোই ভারতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়িয়ে দিতে পারেনি। এর পেছনে কাজ করে ভারতের নিজস্ব কিছু রাজনৈতিক ব্যবস্থা:

১. সামাজিক বিভাজন ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি: ভারত তার বৈচিত্র্যের কারণেই একচেটিয়া বিপ্লব প্রতিরোধে সক্ষম। জাতপাত, ধর্ম, ভাষা ও অঞ্চলভিত্তিক বিভাজন সেখানে এতটাই গভীর যে, দিল্লির রাজপথে শিক্ষার্থীদের উত্তাল আন্দোলন হয়তো পাঞ্জাবের কৃষক বা তামিলনাড়ুর শিল্পশ্রমিকদের মনে কোনো নাড়া দেয় না। ফলে জাতীয় ক্ষোভ প্রায়শই আঞ্চলিক লড়াইয়ে খণ্ডিত হয়ে যায়।

২. যুক্তরাষ্ট্রীয় (Federal) কাঠামো: এককেন্দ্রিক রাষ্ট্রের মতো পুরো দেশের ক্ষোভ গিয়ে সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর পড়ে না। ভারতের ২৮টি রাজ্যে ক্ষমতার কেন্দ্র আলাদা। ভোটাররা রাজ্য সরকারের প্রতি ক্ষুব্ধ হলে কেন্দ্রীয় নির্বাচনে বা রাজ্য নির্বাচনে তার ভিন্ন প্রতিফলন ঘটায়। ফলে রাজপথের উত্তাপ কোনো এক জায়গায় পুঞ্জীভূত হতে পারে না।

৩. অবিরাম নির্বাচনের ক্যালেন্ডার: ভারতে প্রায় বারো মাসই কোনো না কোনো পঞ্চায়েত, পৌরসভা, বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচন লেগে থাকে। এই নিরবচ্ছিন্ন গণতান্ত্রিক চর্চা জনগণের জন্য একটি ‘প্রেসার রিলিজ ভালভ’ হিসেবে কাজ করে। সাধারণ মানুষ জানে, রাজপথে বিশৃঙ্খলা না করেও ব্যালট বাক্সে ক্ষোভ উগরে দিয়ে সরকার বদলে দেওয়া সম্ভব।

প্রাতিষ্ঠানিক দীর্ঘসূত্রতা ও বেসামরিক সামরিক সম্পর্ক

মোদী সরকারের আমলে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থা ও সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা মনে করেন ‘গণতন্ত্রের অবনমন’ আর ‘বিপ্লবের মুখে পড়া’ দুটি ভিন্ন ঘটনা। ভারতে আদালতের আইনি প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন ও সংসদের অস্তিত্ব পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি, যা আন্দোলনকে শেষ পর্যন্ত আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক লড়াইয়ের দিকেই ঠেলে দেয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল ভারতের বেসামরিক-সামরিক সম্পর্ক (Civil-Military Relations)। স্বাধীনতার পর থেকে ভারত তার সশস্ত্র বাহিনীকে রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণ দূরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। প্রতিবেশী দেশগুলোতে সংকটকালে সামরিক বাহিনীর আনুগত্য পরিবর্তন বিপ্লবকে ত্বরান্বিত করলেও, ভারতে সে সম্ভাবনা একেবারেই নেই। এছাড়া ১৪০ কোটি মানুষের বিশাল রাষ্ট্রব্যবস্থায় কেবল দিল্লিতে অচলাবস্থা তৈরি করে পুরো মহাদেশসম দেশকে অচল করা অসম্ভব।

শেষ কথা

দিল্লির রাজপথে নামা তরুণদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ একেবারেই বাস্তব। প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিঃসন্দেহে একটি সুস্থ সমাজের জন্য উদ্বেগের। কিন্তু বাংলাদেশে যে তথাকথিত বিপ্লব রাজনীতির মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, দিল্লির রাজপথের কোলাহল হয়তো সেই একই পরিণতি ডেকে আনবে না।

দক্ষিণ এশিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে বিপ্লব কোনো পূর্বসংকেত ছাড়াই হঠাৎ হাজির হতে পারে। তবে ভারতের বিশাল ভৌগোলিক পরিধি, বৈচিত্র্যময় সমাজ, নিরন্তর নির্বাচনের সুযোগ এবং সেনা কাঠামোর রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে যে, দিল্লির এই ছাত্র বিক্ষোভ ভারতের রাজনীতিতে বড় আঘাত হানা বা নতুন মোড় আনার ক্ষেত্রে শক্তিশালী অনুঘটক হলেও—তা কোনো সরকার পতনের বিপ্লবে পরিণত হবে না।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য