

যেখানে ক্ষমতা, সেখানেই প্রতিরোধ। প্রতীকী ছবি -AI.
২৫শে জুলাই, ২০২৬
একটি ঐতিহাসিক বিক্ষোভের সূচনা প্রায়শই ঘটে গভীর ক্ষোভ ও অপমানের গর্ভ থেকে। ভারতে সাম্প্রতিক তরুণ ও শিক্ষার্থীদের এই অভূতপূর্ব গণজাগরণের শুরুটাও হয়েছিল ঠিক তেমনই এক ঘটনায়। দেশের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি যখন একটি বিচারপ্রক্রিয়ার পর্যবেক্ষণে বেকার যুবক ও আন্দোলনকারীদের ‘পরজীবী’ ও ‘আরশোলা’ (ককরোচ)-র সঙ্গে তুলনা করেন, তখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে ভারতের তরুণসমাজ। সেই অপমানকেই নিজেদের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ও পরিচয়ে রূপ দেয় জেন-জি (Gen Z) প্রজন্ম। বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অভিজিৎ দীপকের হাত ধরে জন্ম নেয় ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (CJP)—যা শুরুতে ছিল কেবলই অনলাইন রাজনৈতিক ব্যঙ্গ বা সোশ্যাল মিডিয়া স্যাটায়ার।
কিন্তু এই উপহাসের নেপথ্যে জমা হচ্ছিল বছরের পর বছর ধরে জমে থাকা ভয় ও ক্ষোভ। ভারতের লাখ লাখ তরুণ-তরুণীর জীবনের ভবিষ্যৎ যে পরীক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে, সেই কেন্দ্রীয় পরীক্ষাগুলির প্রশ্নপত্র যদি বারবার ফাঁস হয়ে যায়, তবে আর কিসের ওপর ভরসা রাখবে দেশের যুবসমাজ? বিশেষ করে মে মাসে নিট (NEET) পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং পরবর্তীকালে তা বাতিল হওয়ার ফলে লাখ লাখ স্বপ্ন চুরমার হয়ে যায়। সেখান থেকেই রাজপথের আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে।
অনলাইনের ডিজিটাল ক্ষোভ দেখতে দেখতেই শহরের রাস্তায় উপচে পড়া হাজার হাজার তরুণের এক অদম্য শক্তিতে পরিণত হয়। ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ সোশ্যাল মিডিয়ায় দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে মিলিয়ন মিলিয়ন অনুগামী জোগাড় করে ফেলে। জেন-জি তরুণদের কাছে সোশ্যাল মিডিয়া কেবল প্রচারের মাধ্যম নয়, বরং তাদের লড়াইয়ের প্ল্যাটফর্ম। ২৪ ঘণ্টা ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে চলতে থাকা বিক্ষোভের প্রতিটি মুহূর্ত স্মার্টফোনে রেকর্ড হতে থাকে। রিলস, মিম, পপ-কালচারের রেফারেন্স আর আইরনিই হয়ে ওঠে এই আন্দোলনের প্রধান ভাষা। জাপানি অ্যানিমে 'ওয়ান পিস' কিংবা মার্ভেলের অ্যাভেঞ্জার্স-এর স্পাইডারম্যান ও হাল্কের পোশাক পরে ব্যারিকেডে বসে প্রতিবাদ জানাতে থাকে তরুণরা।
আন্দোলনের প্রথম পর্বে সিজেপি-র অন্যতম বড় অনুপ্রেরণা হয়ে দাঁড়ান বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক। একটানা ২৬ দিন অনশন পালন করে তিনি নিজেকে এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেন। আন্দোলনকারীদের প্রধান দাবি স্পষ্ট—কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ, আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা সমস্ত মামলা প্রত্যাহার এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান। ২০ জুলাই সংসদ অধিবেশনের শুরুর দিনে যখন হাজার হাজার শিক্ষার্থী 'চলো সংসদ' অভিযানের ডাক দিয়ে ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যায়, তখন পুলিশ কঠোর হাতে দমননীতি গ্রহণ করে। টিয়ার গ্যাস, লাঠিচার্জ এবং পেলেট বন্দুকের ব্যবহারে রক্তাক্ত হয় দিল্লির রাজপথ, যা আরও দাবানলের মতো ছড়িয়ে দেয় সাধারণ মানুষের মধ্যে থাকা ক্ষোভ।
দিল্লির যন্তর মন্তরের এই উত্তাপ কেবল দেশের রাজধানী শহরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। দেখতে দেখতে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে ছাত্র আন্দোলনের আগুন—মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, পাটনা, লখনউ এবং উত্তর-পূর্বের আইজল পর্যন্ত প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ে। মুম্বাইয়ের এক বৃষ্টিভেজা দিনে ২৭ বছরের তরুণী মডেল রিয়া আহির পুলিশের প্রিজন ভ্যানের সামনে একা দাঁড়িয়ে যান। ভিতরে আটক থাকা সহ-আন্দোলনকারীদের না ছাড়া পর্যন্ত তিনি প্রিজন ভ্যানের হুড চেপে ধরে গাড়িটি আটকে রাখেন। প্রায় ১৫ মিনিটের সেই মুখোমুখি লড়াইয়ের দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি হয়ে নেটপাড়ায় ছড়িয়ে পড়তেই তা এক অদম্য প্রতীকে পরিণত হয়।
একই উত্তাপ এসে পৌঁছায় পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতাতেও। কলকাতার ধর্মতলার ডোরিনা ক্রসিং অবরুদ্ধ করে বিক্ষোভ দেখায় সিজেপি এবং বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলি। পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও কাঁদানে গ্যাসের হামলায় কাজের দিনে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে শহরের প্রাণকেন্দ্র। কলকাতার আইনজীবীরাও এই পুলিশি বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ মিছিল বের করেন। হাইকোর্টের বি গেট থেকে সিটি সিভিল কোর্ট পর্যন্ত আয়োজিত মিছিল থেকে প্রবীণ আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য তোপ দাগেন সরকারের একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে। শুধু তাই নয়, প্রবীণ এই আইনজীবী আন্দোলনকে কালিমালিপ্ত করার চক্রান্ত হিসেবে ‘এজেন্ট প্রোভোকেটর’ বা চক্রান্তকারীদের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সতর্ক থাকারও বার্তা দেন।
অনেকে এই আন্দোলনকে আবার অরাজনৈতিক বা কেবলই একটি সাময়িক সামাজিক ক্ষোভ বলে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছেন। তবে গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, এই আন্দোলনের ব্যাকরণ একটু আলাদা। এর আগে ভারতে যেকোনো বড় রাজনৈতিক আন্দোলন কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম, গোষ্ঠী বা ভাবধারার ওপর ভিত্তি করে তৈরি হতো। কিন্তু শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতার এই সংকট জাত, পাত, শ্রেণি কিংবা লিঙ্গভেদ ভুলে ভারতের সমস্ত তরুণ ও তাদের পরিবারের সরাসরি সামাজিক নিরাপত্তার ওপর আঘাত হেনেছে। এটি কেবল কোনো নীতির বিরোধ নয়, বরং রাষ্ট্রের পরিচালন ক্ষমতার (governance) ওপর তৈরি হওয়া এক চরম অবিশ্বাস।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে তাকালে বোঝা যায়, স্বৈরাচার কিংবা অতি-প্রশাসনিক কেন্দ্রিকতা কীভাবে রাষ্ট্রকে নাগরিক স্বাধীনতার বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। ইতালিতে মুসোলিনির ‘লেগি ফ্যাসিস্টিসম’ কিংবা জার্মানির রাইখস্ট্যাগ অগ্নিকাণ্ডের পর হিটলারের জরুরি ডিক্রির মাধ্যমে পুলিশ ও প্রশাসনিক বিভাগের হাতে অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা তুলে দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ও নিরাপত্তার নামে নাগরিকের মুখ বন্ধ করার সেই কৌশল ইতিহাস জুড়ে বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে। কিন্তু এই তরুণ শিক্ষার্থীরা রাষ্ট্রকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে—গণতন্ত্রের ক্ষমতা অনিয়ন্ত্রিত পুলিশি দমনপীড়নে থাকে না, বরং তা থাকে প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা ও সংযমে।
‘ককরোচ জনতা পার্টি’র নাম নিয়ে শুরু হওয়া এই তরুণ বিপ্লব শেষ পর্যন্ত ভারতের রাজনৈতিক মানচিত্রকে কীভাবে বদলে দেবে, তা সময়ই বলবে। একদিকে প্রধান বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী নিট কাণ্ডে সরকারের জালিয়াতি ও পেলেট গান ব্যবহারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছেন, অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রথমবার বিষয়টিতে মুখ খুলে ফাস্ট ট্র্যাক কোর্ট তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু তরুণ প্রজন্ম রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির চেয়ে দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট জবাবদিহিতা চায়।
রাষ্ট্র যখন ভয়ের পরিবেশ তৈরি করে বা তরুণদের আন্দোলনকে কেবল 'আইন-শৃঙ্খলা সমস্যা' হিসেবে দেখে দমন করতে চায়, তখন শাসনব্যবস্থা তার মূল আত্মাকে হারায়। তবে ভারতের সাধারণ ও প্রান্তিক যুবসমাজ রাস্তায় নেমে দেখিয়ে দিয়েছে—নির্বাচনী লড়াইয়ের বাইরেও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতা আদায় করার ক্ষমতা তারা রাখে। ইতিহাস সাক্ষী, কোনো সরকারই চিরকাল ভয়ের রাজত্ব চালিয়ে কিংবা তরুণদের স্বপ্ন চুরমার করে টিকে থাকতে পারে না। 'আরশোলা' ভেবে যাদের পদদলিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল, তারাই আজ পুরো ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়ে ভারতের গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করছে।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।
