২৯শে জুলাই, ২০২৬

info@thefourthaxis.in

The Fourth Axis

header-ad

‘বাটা’: অ-ভারতীয় হয়েও ভারতীয়

‘বাটা’: অ-ভারতীয় হয়েও ভারতীয়

বাটা শো-রুম। ছবি - Google.

‘বাটা’: অ-ভারতীয় হয়েও ভারতীয়

স্কুলের জুতো থেকে পুজোর স্যান্ডেল! কীভাবে বিদেশি সংস্থা হয়ে উঠল ভারতের ‘নিজের ব্র্যান্ড’? এখনও বহু মানুষ মনে করেন, বাটা ভারতেরই কোম্পানি।

একটা সময় ছিল, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু মানেই বাটার দোকানে ভিড়। কালো স্কুল-জুতো, সাদা ক্যানভাস, বাবার অফিসের চামড়ার জুতো, মায়ের স্যান্ডেল কিংবা পুজোর নতুন চপ্পল— ভারতীয় মধ্যবিত্তের জীবনের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল 'বাটা', যেন এটি কোনও দেশি সংস্থা।

বাটার জন্ম ভারতবর্ষে নয়, ইউরোপে। অথচ আজ বিশ্বের যে কয়েকটি বিদেশি ব্র্যান্ডকে ভারতীয়রা প্রায় নিজেদের বলে মনে করেন, বাটা তাদের অন্যতম। প্রশ্ন হল, কীভাবে সম্ভব হল এই অসাধ্য সাধন?

গল্পটা শুরু হয় ১৮৯৪ সালে। বর্তমান চেক প্রজাতন্ত্রের ছোট্ট শহর জ়লিনে তিন ভাইবোন— টমাস বাটা, আন্তোনিন বাটা এবং আনা বাটোভা— মিলে একটি ছোট জুতোর কারখানা গড়ে তোলেন। তখন ইউরোপে ভালো জুতো মানেই ছিল ব্যয়বহুল পণ্য। টমাস বাটার স্বপ্ন ছিল একেবারে উল্টো। তিনি চেয়েছিলেন, এমন জুতো তৈরি করতে যা হবে টেকসই, আর যার দাম থাকবে সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে। সেই ভাবনা থেকেই যন্ত্রের সাহায্যে বৃহৎ পরিসরে জুতো উৎপাদন শুরু করে বাটা। অল্প সময়ের মধ্যেই সংস্থাটি ইউরোপের অন্যতম সফল জুতো প্রস্তুতকারক হয়ে ওঠে।

ভারতের প্রতি বাটার আগ্রহ শুরু হয় ব্রিটিশ আমলেই। বিশাল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান শহর এবং সম্ভাবনাময় বাজার দেখে সংস্থা বুঝেছিল, ভবিষ্যতের বড় ব্যবসার ঠিকানা হতে পারে ভারত। ১৯২৬ সালে ভারতে প্রথম বাটার দোকান খোলে। কয়েক বছরের মধ্যেই কলকাতার কাছে কন্নগরে উৎপাদন শুরু হয়। পরে ১৯৩৪ সালে গড়ে ওঠে বাটানগর— শুধু একটি কারখানা নয়, শ্রমিকদের জন্য পরিকল্পিত আবাসন, হাসপাতাল, স্কুল, খেলার মাঠ-সহ একটি পূর্ণাঙ্গ শিল্পনগরী। সেই সময়ের ভারতে এমন আধুনিক শিল্প-পরিকল্পনা ছিল বিরল।

স্বাধীনতার আগে থেকেই বাটা ভারতীয় মাটিতে জুতো তৈরি করতে শুরু করেছিল। ফলে বিদেশ থেকে জুতো আমদানি করার প্রয়োজন কমে যায়। উৎপাদন খরচ কমে, দামও থাকে সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে। এটাই ছিল বাটার সবচেয়ে বড় শক্তি।

কিন্তু শুধু কম দাম হলেই তো কোনও ব্র্যান্ড মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পারে না। বাটা বুঝেছিল, ভারতকে জয় করতে হলে ভারতীয়দের জীবনযাত্রাকে বুঝতে হবে। তাই শহরের বড় শপিং এলাকায় যেমন দোকান খুলেছে, তেমনই মফস্‌সল, জেলা শহর, এমনকি ছোট বাজারেও পৌঁছে গিয়েছে। এমন সময় ছিল, ভারতের এমন কোনও শহর খুঁজে পাওয়া কঠিন ছিল যেখানে বাটার সাইনবোর্ড চোখে পড়ত না।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছিল বিশ্বাস। বাবা যে ব্র্যান্ডের জুতো কিনতেন, ছেলেও সেই ব্র্যান্ডই পরেছে। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মের কাছে পৌঁছে গিয়েছে বাটার নাম। বহু স্কুলে বাটার কালো জুতো প্রায় অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছিল। ফলে শিশুদের প্রথম জুতোর স্মৃতির সঙ্গে জুড়ে যায় বাটা। সেই শিশুরাই বড় হয়ে আবার নিজেদের সন্তানকে নিয়ে একই দোকানে গিয়েছেন। একটি ব্র্যান্ডের জন্য এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে!

স্বাধীনতার পর ভারতীয় বাজারে বহু বিদেশি সংস্থা নানা কারণে ব্যবসা গুটিয়ে নিলেও বাটা থেকে গিয়েছিল। বরং ভারতেই আরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। ১৯৭৩ সালে সংস্থার নাম হয় Bata India Limited। আজ সংস্থাটি ভারতীয় শেয়ার বাজারে তালিকাভুক্ত, হাজার হাজার ভারতীয় কর্মী সেখানে কাজ করেন এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তাদের উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। অর্থাৎ মালিকানার শিকড় বিদেশে হলেও, ব্যবসার প্রাণস্পন্দন বহু দশক ধরেই ভারতের মাটিতে।

বাটার সাফল্যের আরও একটি বড় কারণ ছিল তার ব্যবসায়িক দর্শন। সংস্থাটি কখনও নিজেকে বিলাসবহুল ব্র্যান্ড হিসেবে তুলে ধরেনি। বরং তারা বলেছে— ভালো জুতো মানেই যে আকাশছোঁয়া দাম হতে হবে, এমন নয়। এই দর্শনই মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের আস্থা জিতেছিল।

আজকের দিনে নাইকি, অ্যাডিডাস, পুমা বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেও বাটা নিজের জায়গা ধরে রেখেছে। কারণ, বাটা শুধু জুতো বিক্রি করেনি, বিক্রি করেছে ভরসা। সেই ভরসার উপর দাঁড়িয়েই প্রায় একশো বছর ধরে ভারতীয় বাজারে টিকে রয়েছে সংস্থাটি।

তাই বাটা ভারতীয় নয়— এই তথ্য যেমন সত্যি, তেমনই আর একটি সত্য অস্বীকার করার উপায় নেই। খুব কম বিদেশি সংস্থাই ভারতের সমাজ, সংস্কৃতি এবং মধ্যবিত্ত জীবনের সঙ্গে এত গভীরভাবে মিশে যেতে পেরেছে। জন্ম ইউরোপে হলেও, পরিচয় আজ অনেকটাই ভারতীয়। আর সেই কারণেই, বাটার দোকানে ঢুকলে এখনও অনেকের মনে হয়— এ তো আমাদেরই ব্র্যান্ড!

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অনলাইন বাংলা ম্যাগাজিন।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য