

ককরোচ ক্যাফে। ছবি - Google
৩রা আগস্ট, ২০২৬
বিহারের ‘ককরোচ ক্যাফে’ ঘিরে কৌতূহল। কিন্তু অদ্ভুত নামের এই ক্যাফে নতুন কিছু নয়। বিশ্বের নানা প্রান্তে বিপ্লব, আন্দোলন, স্বাধীনতার ইতিহাস কিংবা রাজনৈতিক দর্শনের নামেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য ক্যাফে। কখনও প্রতিবাদের ভাষা, কখনও বিপণনের কৌশল- নামই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
একটি নাম কি শুধুই পরিচয়? নাকি সেই নামের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে ইতিহাস, প্রতিবাদ, রাজনৈতিক দর্শন, সামাজিক বার্তা কিংবা নিছক কৌতূহলের বীজ? বিহারের নালন্দায় সম্প্রতি খোলা ‘ককরোচ ক্যাফে’ সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
ক্যাফের নাম শুনেই প্রথমে চমকে উঠছেন অনেকে। কেউ ভ্রূ কুঁচকোচ্ছেন, কেউ আবার মোবাইল হাতে ছুটছেন ছবি তুলতে। কিন্তু সেই বিস্ময়ই যেন এই ক্যাফের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ, মানুষ প্রথমে নামের টানে ঢুকছেন, তারপর খাবারের স্বাদ নিয়ে বেরোচ্ছেন। আধুনিক বিপণনের ভাষায় একেই বলা হয় ‘Curiosity Marketing’, কৌতূহলই যেখানে সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন।
‘ককরোচ ক্যাফে’-র নাম সামনে আসতেই অনেকের মনে পড়ে যাচ্ছে আর একটি পরিচিত নাম- ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। গত কয়েক মাসে প্রশ্নপত্র ফাঁস, প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অনিয়ম এবং নিয়োগ দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশজুড়ে যে ছাত্র আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেখানে এই ছাত্র-যুব সংগঠনটি অন্যতম মুখ হয়ে ওঠে।
বিশেষ করে NEET-UG, কেন্দ্রীয় নিয়োগ পরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ সামনে আসার পর দিল্লি-সহ দেশের বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ, অবস্থান, মিছিল ও সামাজিক মাধ্যমে প্রচারের মাধ্যমে পরীক্ষা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি তোলে সংগঠনটি। সেই আন্দোলনের জেরে প্রশ্নফাঁস নিয়ে জাতীয় স্তরে তীব্র বিতর্ক তৈরি হয়। ফলে ‘ককরোচ’ শব্দটি অনেকের কাছেই আজ আর শুধুমাত্র একটি পোকামাকড়ের নাম নয়; তা ছাত্র আন্দোলনেরও এক পরিচিত প্রতীক।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। বিহারের ‘ককরোচ ক্যাফে’-র সঙ্গে ওই ছাত্র সংগঠনের কোনও সম্পর্ক নেই। ক্যাফের মালিক স্পষ্ট জানিয়েছেন, মানুষের নজর কাড়তেই ইচ্ছাকৃতভাবে এমন একটি অদ্ভুত নাম বেছে নেওয়া হয়েছে। তাঁর বিশ্বাস, নাম মানুষকে একবার টেনে আনবে, আর খাবারের গুণমান বারবার ফিরিয়ে আনবে।
আসলে রাজনৈতিক ইতিহাস বা আন্দোলনের নামে ক্যাফে তৈরির রেওয়াজ নতুন নয়। লাতিন আমেরিকার নানা দেশে ‘Café Che’, ‘Che Guevara Café’, ‘Casa Che’- এমন অসংখ্য ক্যাফে রয়েছে। কিউবার বিপ্লবী আর্নেস্তো ‘চে’ গুয়েভারা শুধু একটি ঐতিহাসিক চরিত্র নন, বিশ্বজুড়ে প্রতিবাদ ও বিদ্রোহের প্রতীকও। সেই কারণে তাঁর নামে তৈরি ক্যাফেগুলিতে শুধু কফি পরিবেশন করা হয় না; দেওয়ালজুড়ে থাকে তাঁর বিখ্যাত প্রতিকৃতি, উদ্ধৃতি, কিউবান বিপ্লবের ছবি এবং লাতিন আমেরিকার রাজনৈতিক ইতিহাস। অনেক পর্যটকের কাছে এগুলি যেন এক একটি জীবন্ত জাদুঘর।
দক্ষিণ আফ্রিকাতেও একই ছবি। জোহানেসবার্গ, সোয়েটো কিংবা কেপটাউনে ‘Mandela Café’, ‘Madiba Restaurant’ বা ‘Mandela Restaurant’ নামে একাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। সেখানে স্থানীয় আফ্রিকান খাবারের পাশাপাশি তুলে ধরা হয় বর্ণবিদ্বেষ-বিরোধী আন্দোলনের ইতিহাস। নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবাস এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই সেই রেস্তোরাঁগুলির পরিবেশেই মিশে থাকে। ফলে সেগুলি শুধুই খাওয়ার জায়গা নয়, ইতিহাস জানারও এক অনন্য ঠিকানা।
ভারতের বিভিন্ন শহরেও স্বাধীনতা সংগ্রামী ও সমাজসংস্কারকদের নামে ক্যাফে তৈরির প্রবণতা কম নয়। দিল্লি, পুনে, বেঙ্গালুরু, মুম্বই, জয়পুর সহ একাধিক শহরে রয়েছে ‘Bhagat Singh Café’, ‘Azad Café’, ‘Ambedkar Café’, ‘Gandhi Café’। কোথাও দেওয়ালে লেখা সংবিধানের প্রস্তাবনা, কোথাও স্বাধীনতা সংগ্রামের বিরল ছবি, কোথাও আবার বই পড়ার নিরিবিলি কোণ। অর্থাৎ শুধু খাবার নয়, পরিবেশন করা হয় ভাবনা, ইতিহাস এবং মতাদর্শও।
ক্যাফে সংস্কৃতির সঙ্গে আন্দোলনের সম্পর্ক আজকের নয়, কয়েকশো বছরের পুরনো। সপ্তদশ শতকের লন্ডনের কফি হাউসগুলিকে বলা হতো ‘Penny Universities’। মাত্র এক পেনি দিয়ে কফি কিনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা রাজনীতি, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও সাহিত্য নিয়ে আলোচনা চলত সেখানে।
আবার ফরাসি বিপ্লবের আগে প্যারিসের ঐতিহাসিক Café Procope-এ নিয়মিত যেতেন ভলতেয়ার, রুশো, দিদরো-র মতো চিন্তাবিদেরা। বিপ্লবের আগে বহু রাজনৈতিক বিতর্ক, পরিকল্পনা এবং মতবিনিময়ের সাক্ষী থেকেছে সেই ক্যাফে। ভিয়েনার কফিহাউস সংস্কৃতিও জন্ম দিয়েছে অসংখ্য সাহিত্য আন্দোলন, শিল্পচর্চা এবং রাজনৈতিক দর্শনের।
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল যুগে একটি নামই অনেক সময় কোটি টাকার বিজ্ঞাপনের সমান কার্যকর হতে পারে। কেউ ইতিহাসকে সামনে আনেন, কেউ বিপ্লবকে, কেউ সমাজ সংস্কারকে, আবার কেউ ইচ্ছে করেই এমন একটি নাম বেছে নেন, যা শুনলেই মানুষ থমকে দাঁড়ান।
এই কৌশলই আজকের ভাষায় ‘Curiosity Marketing’। বিহারের নালন্দার ‘ককরোচ ক্যাফে’ সেই প্রবণতারই সাম্প্রতিক উদাহরণ। একটি আপাত অস্বস্তিকর শব্দকে ব্র্যান্ডে পরিণত করে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, আজকের দিনে শুধু খাবার বিক্রি হয় না, বিক্রি হয় গল্পও। আর সেই গল্প যদি বিতর্ক তৈরি করে, প্রশ্ন তোলে কিংবা মানুষকে ভাবতে বাধ্য করে, তবে সেই নামই হয়ে ওঠে প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে শক্তিশালী পরিচয়।
Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.
অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।
