১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতায় জরুরি অবস্থাকেও হারিয়ে দিল?

শিক্ষাক্ষেত্রে স্বাধীনতায় সিরিয়া, পাকিস্তান, সুদানের থেকেও নিচে ভারত! ছবি - Google

অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতায় জরুরি অবস্থাকেও হারিয়ে দিল?

ভারতের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মতপ্রকাশ ও অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা এখন ইতিহাসের তলানিতে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘ভি-ডেম’ (Varieties of Democracy) অ্যাকাডেমিক ফ্রিডম ইনডেক্স ২০২৬-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতের অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার সূচক ১৯০০ সালের পর থেকে সবচেয়ে নিচে নেমে গেছে। এমনকি ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৭ সালের সেই কুখ্যাত ‘জরুরি অবস্থা’র (Emergency) দিনগুলোর চেয়েও বর্তমান পরিস্থিতি আরও বেশি সংকটজনক বলে উঠে এসেছে এই আন্তর্জাতিক সমীক্ষায়।

সুইডেনের ভি-ডেম ইনস্টিটিউট, জার্মানির ফ্রিডরিশ-অ্যালেকজান্ডার ইউনিভার্সিটি, স্কলার্স অ্যাট রিস্ক নেটওয়ার্ক এবং গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউটের যৌথ উদ্যোগে এই গবেষণাটি পরিচালিত হয়। ১৯০০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ১৭৯টি দেশ ও অঞ্চলের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি এই সূচকে আন্তর্জাতিক তালিকায় তলানির ১০ থেকে ২০ শতাংশ দেশের সারিতে জায়গা পেয়েছে ভারত।

পরিসংখ্যান কী বলছে?

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ০ থেকে ১-এর স্কেলে ২০২৫ সালে ভারতের সামগ্রিক স্কোর নেমে এসেছে মাত্র ০.১৪-তে। ২০১৫ সালে এই স্কোর ছিল ০.৪০৯, অর্থাৎ গত এক দশকে ভারতের পয়েন্ট কমেছে প্রায় ০.২৬৯। যে পাঁচটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি হয়, তার প্রতিটিতেই ভারতের অবস্থা শোচনীয়:

১. গবেষণা ও শিক্ষাদানের স্বাধীনতা: ১.২৯ (স্কেল ০-৪)

২. অ্যাকাডেমিক বিনিময় ও প্রচারের স্বাধীনতা: ১.১১

৩. প্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন (Institutional Autonomy): ১.১২

৪. ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ: ১.০০

৫. অ্যাকাডেমিক ও সাংস্কৃতিক মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা: ১.০১

আরও পড়ুন
মুখ্যমন্ত্রীর নামেও মামলা! শীর্ষে কে?
ককরোচ থেকে ‘চে’! ক্যাফের নামেই প্রতিবাদের ইতিহাস
স্বপ্নের শহরে চাকরি আছে, কিন্তু মাথা গোঁজার ঠাঁই?

প্রতিবেদনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০১৩-১৪ সালের পর থেকেই ভারতের বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে এই সূচকগুলোর ধারাবাহিক পতন ঘটেছে। গবেষণা ও শিক্ষাদানের স্বাধীনতা ১৯০০ থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সর্বনিম্ন হলেও, বাকি চার ক্ষেত্রেই ২০২৫ সালে ভারত তার ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্কোরে পৌঁছেছে।

সিরিয়া, পাকিস্তান বা সুদানের থেকেও নিচে ভারত?

এই আন্তর্জাতিক সূচকে চেক প্রজাতন্ত্র শীর্ষস্থান দখল করেছে। এরপরই রয়েছে এস্তোনিয়া, বেলজিয়াম, জামাইকা ও স্লোভেনিয়া। কিন্তু সবচেয়ে অস্বস্তিকর বিষয় হল, অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার দিক থেকে ভারতের অবস্থান এখন গৃহযুদ্ধ ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত পাকিস্তান, ইরাক, সুদান, সিরিয়া এবং ইয়েমেনের মতো দেশগুলোর থেকেও নিচে।

২০১৫ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতার অবনতি ঘটেছে। চীন, উত্তর কোরিয়া, আফগানিস্তান এবং মায়ানমারের মতো দেশগুলো ভারতের নিচে থাকলেও বিশেষজ্ঞদের মতে, গবেষণার গুণগত ও বৈজ্ঞানিক উৎপাদনের দিক থেকে চীন ভারতকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে।

শিক্ষাবিদদের উদ্বেগ

ভারতের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বিজ্ঞানীরা এই রিপোর্ট নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। পুণের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ ট্রপিক্যাল মেটেরোলজির (IITM) প্রবীণ জলবায়ু বিজ্ঞানী রক্সি ম্যাথিউ কোল বলেন, "একজন বিজ্ঞানী ও মেন্টর হিসেবে এই তথ্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। প্রশ্ন তোলা, স্বাধীন গবেষণা এবং ভিন্নমত পোষণের স্বাধীনতাই হলো বিজ্ঞান ও একটি দেশের অগ্রগতির মূল ভিত্তি।"

অন্যদিকে, দিল্লির জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) বায়োটেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক বিনয় পণ্ডা সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন যে, চীনে অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা কম থাকা সত্ত্বেও তারা গবেষণার উৎপাদনে ভারতের চেয়ে অনেক এগিয়ে। তাঁর প্রশ্ন, "বিজ্ঞানে বিপুল সরকারি বরাদ্দের বিনিময়ে আমরা কি অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা বিসর্জন দিতে প্রস্তুত?"

পদ্ধতি নিয়ে বিতর্ক

বিশ্বের ২,৩৫৭ জনেরও বেশি বিশেষজ্ঞের মতামতের ওপর ভিত্তি করে এই সূচক তৈরি হলেও ভারতের এই নিম্নমানের মূল্যায়ন নিয়ে একদল সমালোচক প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের দাবি, এই মূল্যায়নে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কোনো ভারতীয় গবেষক বা বিজ্ঞানীকে মূল আঞ্চলিক দলে রাখা হয়নি। তা ছাড়া, দেশের সার্বভৌমত্ব বা সরকারি নীতি নিয়ে দৈনন্দিন বিতর্ক ও বাকস্বাধীনতার যে রূপ ভারতে দেখা যায়, তাকে যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়া বা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সঙ্গে তুলনা করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা নিয়েও শিক্ষা মহলে চর্চা শুরু হয়েছে।

তবে বিতর্কের ঊর্ধ্বে উঠে এই প্রতিবেদন একটি কঠিন সত্যকে সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে—ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মুক্ত চিন্তা, স্বাধীন গবেষণা এবং প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসনের জায়গাটি দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে।

Click here to add The Fourth Axis as a trusted and preferred source on Google.

google Source Icon
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক
দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক

অভিজ্ঞ, সংবেদনশীল, অনুসন্ধিৎসু এবং সমকালীন ও আগামী সম্পর্কে ওয়াকিবহাল কর্মঠ কিছু তরুণ-তরুণী নিয়ে দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক। ভারতীয় বাঙালি সংস্কৃতির পথ ধরে গ্লোবাল লেন্স দিয়ে দুনিয়াকে দেখে সকলের সামনে পরিবেশন করাই তাঁদের লক্ষ্য। মিলেনিয়াল-জেনX-এর অভিজ্ঞতা ও জেনZ-র উৎসাহর যথাযথ রসায়নে গঠিত 'দ্য ফোর্থ অ্যাক্সিস ডেস্ক'।

আরও পড়ুন

sidebar-ad

অন্যান্য