

গুন্ডাদমন আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলছে। প্রতীকী ছবি - The Fourth Axis.
৮ই আগস্ট, ২০২৬
অন্যান্য চ্যাপ্টার
অপরাধ যখন ক্রমশ সংগঠিত, প্রযুক্তিনির্ভর এবং আন্তঃরাজ্য চরিত্র ধারণ করছে, তখন শুধু ভারতীয় দণ্ডবিধি বা সাধারণ ফৌজদারি আইনের উপর নির্ভর করে অপরাধ দমন করা কঠিন— এমন যুক্তি বহু দিন ধরেই দিয়ে আসছিল পুলিশ প্রশাসনের একাংশ। পশ্চিমবঙ্গ সরকারও সেই যুক্তিকেই সামনে রেখে এনেছে বহুল আলোচিত গুন্ডাদমন আইন। সরকারের দাবি, এই আইন কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নয়; বরং তোলাবাজ, মাফিয়া, অস্ত্র ও মাদক চক্র, জমি দখলকারী, সংঘবদ্ধ অপরাধী এবং পুনরাবৃত্ত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য।
কিন্তু আইন কার্যকর হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। বিরোধীদের অভিযোগ, এই আইনের আওতা এতটাই বিস্তৃত যে তা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধেও ব্যবহার করা যেতে পারে। মানবাধিকার কর্মীদের প্রশ্ন, অপরাধ রোধের নামে কি নাগরিকের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে? অতএব, এই আইনকে ঘিরে মূল প্রশ্ন একটাই— এটি কি আইনশৃঙ্খলার মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারবে, নাকি নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে?
সরকারি সূত্রের দাবি, গত এক দশকে অপরাধের ধরন বদলেছে। এক সময়ের একক অপরাধীর জায়গায় এখন রয়েছে সংগঠিত অপরাধচক্র। তাদের আর্থিক জোগান, রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব, আন্তঃরাজ্য যোগাযোগ এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্ক— সবই আগের তুলনায় অনেক শক্তিশালী।
প্রশাসনের অভিযোগ, একই ব্যক্তি একাধিক গুরুতর মামলায় গ্রেফতার হলেও অনেক ক্ষেত্রে জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের একই ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রচলিত আইনের পাশাপাশি আরও কঠোর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রয়োজন ছিল। সরকারের মতে, নতুন আইনের মূল লক্ষ্য অপরাধ সংঘটিত হওয়ার পর শাস্তি দেওয়া নয়, বরং সংঘবদ্ধ অপরাধের নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া।
পশ্চিমবঙ্গ এই পথে একা নয়। ভারতের একাধিক রাজ্যে ইতিমধ্যেই সংঘবদ্ধ অপরাধ দমনে বিশেষ আইন রয়েছে।
মহারাষ্ট্র — MCOCA (Maharashtra Control of Organised Crime Act), মূলত আন্ডারওয়ার্ল্ড, সুপারি কিলিং ও মাফিয়াদের দমনে।
কর্নাটক — KCOCA, সংগঠিত অপরাধ ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে।
উত্তরপ্রদেশ — Gangsters and Anti-Social Activities (Prevention) Act, গ্যাংভিত্তিক অপরাধ দমনে।
গুজরাত — GUJCTOC, সংঘবদ্ধ অপরাধ ও সন্ত্রাসে অর্থ জোগানের বিরুদ্ধে।
এই আইনগুলির অভিজ্ঞতা বলছে, কিছু ক্ষেত্রে বড় অপরাধচক্র ভাঙা সম্ভব হয়েছে। আবার বহু ক্ষেত্রেই আদালতে অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তাই পশ্চিমবঙ্গের নতুন আইনও একই ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
১. সংঘবদ্ধ অপরাধের বিরুদ্ধে দ্রুত আঘাত
প্রচলিত আইনে পৃথক পৃথক মামলা চললেও, এই ধরনের আইন একটি সম্পূর্ণ অপরাধচক্রকে লক্ষ্য করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ দেয়। এতে তোলাবাজি, অস্ত্র পাচার, মাদক কারবার, জমি দখল, জাল নথি চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত অভিযান সম্ভব হতে পারে।
২. অপরাধের অর্থনৈতিক শিকড়ে আঘাত
শুধু অপরাধীকে গ্রেফতার নয়, অপরাধের মাধ্যমে অর্জিত সম্পত্তি ও আর্থিক নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হলে অপরাধচক্রের পুনর্গঠন কঠিন হতে পারে।
৩. সাক্ষীদের সুরক্ষা
সংগঠিত অপরাধের ক্ষেত্রে সাক্ষীরা প্রায়ই ভয় পান। অপরাধচক্রের প্রভাব কমানো গেলে সাক্ষীদের আদালতে এগিয়ে আসার পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
৪. বিনিয়োগের পরিবেশ
শিল্প ও ব্যবসায়ী মহলের দীর্ঘদিনের অভিযোগ— তোলাবাজি ও দখলদারির সংস্কৃতি বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করে। আইন কার্যকর হলে শিল্পবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হতে পারে বলে মনে করেন অর্থনীতিবিদদের একাংশ।
কিন্তু বিতর্কের জায়গাও কম নয়
যে কোনও কঠোর আইনের মতোই এই আইন নিয়েও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
প্রথম প্রশ্ন: 'সংগঠিত অপরাধ' কী?
আইনের ভাষা যত বিস্তৃত হবে, ব্যাখ্যার সুযোগও তত বাড়বে। আইনজীবীদের একাংশের মতে, এই সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে অপব্যবহারের ঝুঁকি থাকে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: পুলিশের ক্ষমতা কতটা বাড়ছে?
বিরোধীদের অভিযোগ, আইনটি পুলিশের হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা দিচ্ছে। সরকারের বক্তব্য, আদালতের অনুমোদন এবং বিচারব্যবস্থা থাকায় স্বেচ্ছাচারের সুযোগ নেই।
তৃতীয় প্রশ্ন: রাজনৈতিক অপব্যবহার হবে না তো?
এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বেশি আলোচিত। বিরোধী দলগুলির আশঙ্কা, নির্বাচন, আন্দোলন বা রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনায় আইনটি ব্যবহার করা হতে পারে। শাসকদলের দাবি, আইন কোনও দলের বিরুদ্ধে নয়, শুধুমাত্র অপরাধীদের বিরুদ্ধে।
চতুর্থ প্রশ্ন: আদালতের ভূমিকা
আইন প্রয়োগের পর শেষ কথা বলবে আদালত। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, কঠোর আইনের বহু ধারাই বিচারবিভাগীয় পর্যবেক্ষণের মুখে সংশোধিত হয়েছে।
NCRB-র সাম্প্রতিক তথ্য দেখাচ্ছে, অপরাধের চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। আগে যেখানে ছিনতাই বা ডাকাতি ছিল বড় চ্যালেঞ্জ, এখন তার জায়গা নিয়েছে—সাইবার প্রতারণা, ডিজিটাল আর্থিক জালিয়াতি, পরিচয় চুরি, আন্তর্জাতিক কল সেন্টার প্রতারণা, মাদক পাচার, মানবপাচার, সীমান্ত ব্যবহার করে সংগঠিত অপরাধ। অর্থাৎ অপরাধ এখন আর কেবল রাস্তায় ঘটে না; মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কও অপরাধের বড় ক্ষেত্র।
অপরাধবিজ্ঞানীদের মতে, না। কঠোর আইন একটি হাতিয়ার মাত্র। কার্যকর ফল পেতে প্রয়োজন—আধুনিক ফরেনসিক পরিকাঠামো,
দ্রুত তদন্ত, নিরপেক্ষ চার্জশিট,সময়মতো বিচার, সাক্ষী সুরক্ষা, সাইবার পুলিশিং, সীমান্ত নজরদারি এবং সর্বোপরি পুলিশের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা। যেখানে অভিযোগ নথিভুক্ত করতেই মানুষ ভয় পান, সেখানে কঠোর আইনও কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারে না।
গুন্ডাদমন আইন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক চলবেই। কিন্তু কোনও আইন সফল কি না, তা নির্ধারণ করে তার প্রয়োগ।
যদি এই আইন সত্যিই—সংঘবদ্ধ অপরাধ কমায়, তোলাবাজি রোধ করে, মাদক ও অস্ত্র চক্র ভাঙে, এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বাড়ায়,
তবে তা প্রশাসনের বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হবে।
কিন্তু যদি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ব্যবহার, নির্বিচারে গ্রেফতার বা দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়ার অভিযোগ বাড়ে, তবে এই আইনও অন্যান্য বিতর্কিত আইনের মতো আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্নের মুখে পড়বে।
বাংলার অপরাধচিত্রকে শুধু একটি পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। একদিকে কলকাতা দেশের নিরাপদতম মহানগরগুলির অন্যতম— এটি যেমন সত্য, তেমনই সাইবার অপরাধ, সীমান্ত-সংক্রান্ত অপরাধ, নারী নির্যাতন এবং সংঘবদ্ধ অপরাধের নতুন চ্যালেঞ্জও বাস্তব।
গুন্ডাদমন আইন সেই বাস্তবতার প্রেক্ষিতে সরকারের একটি বড় পদক্ষেপ। কিন্তু গণতন্ত্রে কোনও আইনের শক্তি তার কঠোরতায় নয়, তার ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা এবং নিরপেক্ষ প্রয়োগে।
আগামী কয়েক বছরই বলে দেবে— পশ্চিমবঙ্গের এই নতুন আইন কি সত্যিই অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে কার্যকর অস্ত্র হয়ে উঠবে, নাকি তা রাজনৈতিক বিতর্কের আরও একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের সূচনা করবে।
(শেষ)
The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.
2016 সালে আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক। 2020 থেকে লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। বর্তমানে The Fourth Axis বাংলায় কর্মরত। শখ বলতে সময় পেলে সমুদ্রের কাছে যাওয়া।
