১২ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬

info@thefourthaxis.in
header-ad
এক মহাকাব্যিক পথচলা (পর্ব ১)

৭ মাসে ১৪টি আটহাজারী শৃঙ্গ জয়ের অবিশ্বাস্য স্বপ্নকে বাস্তব করেছিলেন পুরজা। ছবি - Google.

এক মহাকাব্যিক পথচলা (পর্ব ১)

calender icon 2 ৫ই আগস্ট, ২০২৬

অন্যান্য চ্যাপ্টার

পৃথিবীর উচ্চতম শৃঙ্গগুলোর বরফাবৃত চূড়ায় যেখানে মানুষের শ্বাস নেওয়া কষ্টকর, যেখানে অক্সিজেনের অভাবে কোষগুলো একটু একটু করে মরতে শুরু করে—সেখানে তিনি লিখেছিলেন এক অবিশ্বাস্য জয়ের গল্প। নাম তাঁর নির্মল পুরজা, যাকে বিশ্ব চেনে 'নিম্স' বা 'নিম্সদাই' নামে। নেপালের এক দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে বিশ্ব পর্বতারোহণের ইতিহাস নতুন করে লিখেছিলেন এই প্রাক্তন গুর্খা সেনা। কিন্তু ২০২৬ সালের ৩০ জুলাই, পাকিস্তানের কারাকোরাম পর্বতমালার ব্রড পিকের বরফধসে চিরতরে স্তব্ধ হয়ে যায় এই পর্বতারোহীর হৃদস্পন্দন। নিম্সদাইয়ের এই নাটকীয়, বীরত্বপূর্ণ ও একই সাথে ট্র্যাজিক জীবনকাহিনি যেন মানুষের অদম্য ইচ্ছাশক্তির এক অনন্য দলিল।

দারিদ্র্য থেকে ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্সে: এক যোদ্ধার জন্ম

১৯৮৩ সালের ২৫ জুলাই নেপালের মিয়াগদি জেলার দানা নামের এক দুর্গম গ্রামে জন্ম নেন নির্মল পুরজা। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৬০০ মিটার উঁচুতে বেড়ে ওঠা নিম্সের শৈশব মোটেও সহজ ছিল না। অন্য জাতের মেয়েকে বিয়ে করার অপরাধে তাঁর মা-বাবাকে পরিবার থেকে সামাজিকভাবে বয়কট করা হয়েছিল। চরম অর্থকষ্টের মধ্যে বড় হওয়া নিম্স এক সাক্ষাৎকারে স্মৃতিচারণ করে বলেছিলেন, "আমাদের পরিবার ছিল মারাত্মক দরিদ্র। ছোটবেলায় আমার পায়ে দেওয়ার মতো একজোড়া চপ্পলও ছিল না।"

কিন্তু অভাব তাঁকে দমাতে পারেনি। তাঁর তিন বড় ভাই গুর্খা রেজিমেন্টে যোগ দেন এবং তাঁদের সহায়তায় নিম্স ইংরেজি মাধ্যম বোর্ডিং স্কুলে পড়ার সুযোগ পান। ২০০৩ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে নিজের ভাইদের পদচিহ্ন অনুসরণ করে তিনি সেনাবাহিনীর 'ব্রিগেড অফ গুর্খা'-য় যোগ দেন। ২০০৯ সালে তিনি ইতিহাস গড়েন—প্রথম গুর্খা সেনা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন রয়্যাল নেভির অতি-অভিজাত বিশেষ বাহিনী 'স্পেশাল বোট সার্ভিস' (SBS)-এ। সেখানে শীতকালীন যুদ্ধের বিশেষজ্ঞ হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধক্ষেত্রে বীরত্বের সাথে লড়াই করেন তিনি। যুদ্ধের ময়দানে একবার স্নাইপারের গুলি তাঁর রাইফেলের পেছনের অংশে লাগে; অলৌকিকভাবে বেঁচে যান নিম্স, কিন্তু সামরিক জীবনের এই কঠোর প্রশিক্ষণই পরবর্তীতে তাঁর এভারেস্ট ও কে২ জয়ের মানসিক শক্তিতে পরিণত হয়।

‘প্রজেক্ট পসিবল’: ৭ মাসে ১৪টি আটহাজারী শৃঙ্গ জয়ের অবিশ্বাস্য স্বপ্ন

২০১৮ সালে জীবনের অন্যতম কঠিন সিদ্ধান্ত নেন নিম্স। সেনাবাহিনীর নিরাপদ চাকরি এবং নিশ্চিত পেনশন ছেড়ে পুরো সময় পর্বতারোহণে সঁপে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। স্বজনদের কাছে এটা ছিল এক চরম আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত, কিন্তু নিম্সের চোখে তখন অন্য এক স্বপ্নের আগুন।

২০১৯ সালে তিনি ঘোষণা করেন তাঁর ঐতিহাসিক অভিযান—'প্রজেক্ট পসিবল ১৪/৭'। লক্ষ্য ছিল বিশ্বের ৮,০০০ মিটারের উঁচু ১৪টি পর্বতশৃঙ্গ মাত্র সাত মাসের মধ্যে জয় করা। এর আগের রেকর্ডটি ছিল ইতালীয় পর্বতারোহী রেইনহোল্ড মেসনারের—যা করতে তাঁর সময় লেগেছিল প্রায় আট বছর! বহু মানুষ নিম্সের এই পরিকল্পনাকে পাগলামি বলে হেসেছিলেন। স্পনসর না পেয়ে নিজের বাড়ি বিক্রি ও বন্ধক রেখে অর্থ জোগাড় করেন তিনি।

২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল অন্নপূর্ণা জয়ের মাধ্যমে শুরু হয় এই অভিযান। একের পর এক পর্বত—ধৌলাগিরি, কাঞ্চনজঙ্ঘা, এভারেস্ট, লোটসে এবং মাকালু—মাত্র ১২ দিনের ব্যবধানে জয় করেন তিনি। এভারেস্টে ওঠার সময় পর্বতারোহীদের দীর্ঘ লাইনের যে বিখ্যাত ছবি বিশ্বজুড়ে ভাইরাল হয়েছিল এবং 'দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস'-এর প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছিল, সেটিও তুলেছিলেন নিম্স নিজেই। চীন সরকার তাদের সীমান্ত বন্ধ রাখলেও নেপাল সরকারের বিশেষ অনুরোধে তিনি শি শাপংমা জয়ের অনুমতি পান। অবশেষে ২৯ অক্টোবর ২০১৯—মাত্র ৬ মাস ৬ দিনে ১৪টি আটহাজারী শৃঙ্গ জয় করে বিশ্বকে স্তম্ভিত করে দেন নিম্সদাই। এই অসাধ্য সাধনের গল্প নিয়েই পরবর্তীতে তৈরি হয় আলোড়ন সৃষ্টিকারী নেটফ্লিক্স ডকুমেন্ট্রি '১৪ পিকস: নাথিং ইজ ইমপসিবল'।

(চলবে)

The Fourth Axis is now on WhatsApp. Follow our channel for sharp analysis and opinions on the latest developments.

সৌরভ গোস্বামী
সৌরভ গোস্বামী

কলকাতার বেহালায় জন্ম। দক্ষিণ কলকাতার এন্ড্রিউজ হাইস্কুল থেকে প্রাথমিক স্কুলিং। এরপরে আশুতোষ কলেজ রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক, রবীন্দ্রভারতী থেকে স্নাতকোত্তর, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএড, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমফিল করে আপাতত সাংবাদিকতার সাথে কিছু বছর যুক্ত। ভবিষ্যতে একাডেমিকসে/শিক্ষকতায় যাওয়ার ইচ্ছা। লেখালিখিতে হাতেখড়ি কলেজে পড়াকালীন সময়েই। অবসর সময়ে ভ্রমণ, ফুটবল, গিটার, পড়াশোনা, রান্না করতে ভালবাসেন।

অন্যান্য